Ajker Patrika

মিডল ইস্ট আই–এর নিবন্ধ /ইরান যুদ্ধ যেসব কারণে আমেরিকা-ইসরায়েলের কৌশলগত বিপর্যয়

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ৩০ জুন ২০২৬, ১৭: ১৩
ইরান যুদ্ধ যেসব কারণে আমেরিকা-ইসরায়েলের কৌশলগত বিপর্যয়
ট্রাম্পের পিছু হটায় নেতানিয়াহুর গ্রেটার ইসরায়েল স্বপ্নে ফাটল ধরেছে। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাত শুরুর আগে বহু দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তহীন যুদ্ধনীতির অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত নব্য রক্ষণশীল লেখক রবার্ট কাগান সতর্ক করেছিলেন, ইরানের সঙ্গে এই মুখোমুখি অবস্থান আধুনিক আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কৌশলগত পরাজয়গুলোর একটিতে পরিণত হতে পারে। তখন অনেকে তাঁর এই মূল্যায়নকে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী ও অতিরঞ্জিত বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

কারণ, পশ্চিমা বিশ্বে প্রচলিত ধারণা ছিল—ইরান ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। দেশটির সামরিক অবকাঠামোতে আঘাত হানা হয়েছে, তাঁদের শীর্ষ নেতৃত্ব, জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার ও বিজ্ঞানীদের হত্যা করা হয়েছে, অর্থনীতি চাপে পড়েছে আর বিভিন্ন ফ্রন্টজুড়ে অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স বা প্রতিরোধ অক্ষও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কেউ কীভাবে ইরানের বিজয়ের কথা বলতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে এমন এক প্রশ্নের ওপর, যা নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যুদ্ধবিশেষজ্ঞ ও সামরিক ইতিহাসবিদেরা বিতর্ক করেছেন—বিজয়কে কীভাবে মাপা হবে? যদি যুদ্ধের ফলাফল বিচার করা হয় কে কতটা ধ্বংস ডেকে এনেছে তার ভিত্তিতে, তাহলে যাদের সামরিক শক্তি তুলনামূলক অনেক বেশি, তাদেরই প্রায় সব সময় বিজয়ী বলে মনে হবে। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ধ্বংস আর বিজয় এক বিষয় নয়।

যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের বিশাল অংশ ধ্বংস করেছিল, কিন্তু নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। একইভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েই সরে যেতে হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রও আফগানিস্তানে দুই দশক ও ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিল। কিন্তু তাদের প্রস্থানের কয়েক দিনের মধ্যেই তারা যে সরকার গড়ে তুলেছিল, সেটি ভেঙে পড়েছে। ইরাকে তারা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করেছে, সামাজিক কাঠামো পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তীব্র প্রতিরোধের মুখে এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর অপমানজনকভাবে সরে যেতে হয়েছে।

প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সামরিক শক্তি ধ্বংস ডেকে আনতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক ফলাফল নিজের ইচ্ছেমতো নির্ধারণ করতে পারে না। সাম্প্রতিক ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অক্ষের সংঘাত বুঝতে এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই যুদ্ধ মূলত কখনোই পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে ছিল না। এটি কেবল ক্ষেপণাস্ত্র, নিষেধাজ্ঞা বা আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি ইরানের সমর্থন নিয়েও ছিল না।

এর কেন্দ্রে ছিল পশ্চিম এশিয়ার ভবিষ্যৎ ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে লড়াই। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব এমন একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা সুসংহত করতে চেয়েছিল, যা ইসরায়েলি প্রাধান্য ও মার্কিন আধিপত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে। একই সঙ্গে তারা ইরানকে এমন নীতি ও জোট ত্যাগে বাধ্য করতে চেয়েছিল, যেগুলো ওই প্রকল্পের প্রধান বাধা হিসেবে ইরানকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। সে মানদণ্ডে বিচার করলে যুদ্ধের সমাপ্তি ইরানের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে হয়নি; বরং আমেরিকান-জায়নবাদী প্রকল্পের গভীর ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে হয়েছে।

নতুন এক আঞ্চলিক ব্যবস্থা

ইরানের বিজয় বোঝার জন্য প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপেরও আগে ফিরে যেতে হবে। ২০২৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দাঁড়িয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর কল্পিত ‘নিউ মিডল ইস্ট’ বা নয়া মধ্যপ্রাচ্যের রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি যে মানচিত্র প্রদর্শন করেছিলেন, সেখানে ফিলিস্তিনকে মুছে ফেলা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে অঞ্চলের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল যেন সেটি ইতিমধ্যে সমাধান হয়ে গেছে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে তথাকথিত আব্রাহাম অ্যাকর্ডস, অর্থনৈতিক করিডর, প্রযুক্তিগত একীভবন এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের ওপর, যা ইসরায়েলকে পারস্য উপসাগর বা আরব উপসাগর এবং তার বাইরের অঞ্চলগুলোর সঙ্গে যুক্ত করবে।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডস ছিল কেবল শুরু।

ইসরায়েলের যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড কাঠামোয় অন্তর্ভুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তার এবং প্রস্তাবিত ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডর (আইএমইসি) ইঙ্গিত দিচ্ছিল এমন এক আঞ্চলিক ব্যবস্থার দিকে, যেখানে ইসরায়েল সামরিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে প্রধান শক্তিতে পরিণত হবে।

এই দৃষ্টিভঙ্গিতে জায়নবাদী রাষ্ট্র অঞ্চলের বাকি সবাইকে নিরাপত্তা দেবে, ইরানকে বিচ্ছিন্ন করা হবে, ফিলিস্তিনকে আলোচনা থেকে নাই করে দেওয়া হবে এবং প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোকে দুর্বল অথবা নির্মূল করা হবে। পুরো অঞ্চলকে পুনর্গঠন করা হবে মার্কিন শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় ইসরায়েলি প্রাধান্যের চারপাশে।

কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনাগুলো সেই কল্পনাকে ভেঙে দেয়।

এরপর যা ঘটেছে, তা শুধু গাজাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ ছিল না। এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে একটি আঞ্চলিক সংঘাত। গাজা, লেবানন, ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক এবং পরবর্তী সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানের পাশাপাশি পশ্চিম তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলের প্রচেষ্টাও এই বৃহত্তর লক্ষ্যটির সঙ্গে যুক্ত ছিল। যে ফলাফল নেতানিয়াহু ও তাঁর জায়নবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী মিত্ররা ঠেকাতে চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেটিই যুদ্ধের সবচেয়ে নির্ধারক পরিণতিতে পরিণত হয়। ফিলিস্তিন আবার বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরে আসে, আর ইরান সেই আঘাতের মধ্যেও টিকে থাকে, যার উদ্দেশ্য ছিল দেশটিকে ভেঙে ফেলা।

মার্কিন ও ইসরায়েলি কৌশলের বড় একটি অংশ এমন ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল যে, দীর্ঘস্থায়ী সামরিক চাপ, অর্থনৈতিক যুদ্ধ, বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা, সাইবার অভিযান, লক্ষ্যভিত্তিক হত্যা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পতন ঘটাতে পারে অথবা কৌশলগত আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করতে পারে। বহু বছর ধরে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবে বিভিন্ন ধরনের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন বা পতনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কখনো সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে, কখনো অভ্যন্তরীণ ভাঙন, ক্ষমতাকেন্দ্রিক বিভাজন, অর্থনৈতিক ক্লান্তি কিংবা সামাজিক অস্থিরতার মাধ্যমে।

এর কোনোটিই সফল হয়নি। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছিল, বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কাঠামো অটুট ছিল। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ চালিয়ে গেছে, কমান্ড কাঠামো কার্যকর ছিল, নেতৃত্বের উত্তরাধিকারপ্রক্রিয়াও কোনো কাঠামোগত অস্থিরতা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে এবং সরকারি মন্ত্রণালয়গুলো তাদের কাজ অব্যাহত রেখেছে। বহু বছর ধরে পশ্চিমা প্রচারযন্ত্র এবং ইসরায়েলি ‘হাসবারা’র (হলো একটি হিব্রু পরিভাষা, যার আক্ষরিক অর্থ বর্ণনা করা বা বোঝানো। এটি মূলত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জনসংযোগ, গণকূটনীতি এবং ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার একটি সুসংগঠিত সরকারি প্রচারণা কৌশল।) মাধ্যমে ইরানকে একটি অযৌক্তিক ধর্মতান্ত্রিক ‘শাসনব্যবস্থা’ হিসেবে তুলে ধরার যে ধারণা ও স্টেরিওটাইপ গড়ে তোলা হয়েছিল, তা শুধু অতিরঞ্জিতই নয়, কৌশলগতভাবেও ব্যয়বহুল প্রমাণিত হয়েছে।

ইরান তার সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখেছে। এ ধরনের যুদ্ধ মূলত ভূখণ্ড দখলের জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ আদায়ের জন্য পরিচালিত হয়। তবু সংঘাতের তীব্রতা সত্ত্বেও কোনো আত্মসমর্পণ হয়নি, বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো সমঝোতা হয়নি, ইসরায়েলি আধিপত্য মেনে নেওয়া হয়নি এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও পরিত্যাগ করা হয়নি।

পরাজয়ের সূচক

যে লক্ষ্য সামনে রেখে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল এবং যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা যে রূপ নিয়েছে, এই দুইয়ের বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট হওয়া সম্ভব নয়। যুদ্ধ শুরু হয়েছিল এমন সব দাবির মাধ্যমে, যা কার্যত কৌশলগত আত্মসমর্পণের সমতুল্য ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা গিয়ে দাঁড়ায় এমন আলোচনায়, যেখানে সংকটের শুরু থেকেই ইরান যে অবস্থান ধরে রেখেছিল, বাস্তবে তার অনেকটা মেনে নেওয়া হয়।

পুরো সংঘাতজুড়ে তেহরান একটি উল্লেখযোগ্যভাবে স্থিতিশীল অবস্থান বজায় রেখেছে—আগ্রাসন বন্ধ না হলে কূটনীতি এগোতে পারে না। জবরদস্তিমূলক কূটনীতির যুক্তি বলে, সামরিক চাপ আলোচনায় সুবিধা এনে দেয়। কিন্তু ইরান কার্যত সেই সমীকরণ উল্টে দেয় এবং জানিয়ে দেয়, অর্থবহ আলোচনা শুরু হওয়ার আগে চাপ প্রয়োগই বন্ধ করতে হবে। সংঘাত যত এগিয়েছে, ওয়াশিংটন ততই শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার বদলে কূটনৈতিক বেরিয়ে আসার পথ খুঁজেছে।

এই অবস্থান পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং আলোচনার টেবিলে দেখা যায়।

ইসলামাবাদে পৌঁছানো সমঝোতা স্মারক যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক সর্বোচ্চ চাপভিত্তিক অবস্থান থেকে কতটা সরে এসেছে, তা প্রকাশ করে। কোনো পরাজিত রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া শর্তের মতো না হয়ে, এই নথিতে ইরানকে এমন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যার সহযোগিতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমঝোতা স্মারকের প্রধান অগ্রগতির অংশ হলো যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্রদের সব ফ্রন্টে, লেবাননসহ, সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি। এটি সরাসরি রাজনৈতিকভাবে যুদ্ধের আঞ্চলিক চরিত্রকে স্বীকৃতি দেয় এবং পরোক্ষভাবে ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’কে কৌশলগত সমীকরণের অংশ হিসেবে মেনে নেয়। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব দীর্ঘদিন ধরে প্রতিটি ফ্রন্টকে আলাদা করে দেখার চেষ্টা করেছে। গাজাকে লেবানন থেকে, লেবাননকে ইরান থেকে এবং ইরানকে বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিরোধ নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্নভাবে উপস্থাপন করেছে। ইরান বিপরীত অবস্থান নেয়: যুদ্ধ শেষ করতে হলে সব ফ্রন্টেই তা শেষ হতে হবে, শুধু ইরানের বিরুদ্ধে নয়।

যদি এই ধারা কার্যকর থাকে, তাহলে এটি ইরানের জন্য বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ, এটি লেবাননের নিরাপত্তা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক ফ্রন্টকে মার্কিন-জায়নবাদী আগ্রাসনের অবসানের সঙ্গে যুক্ত করছে। এই ব্যবস্থায় গাজা কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইরান বলছে গাজাও এর অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু জায়নবাদী শাসনব্যবস্থা এখনো সেই ব্যাখ্যা মেনে নিতে অনীহা দেখাচ্ছে।

গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই নথিতে উভয় পক্ষ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করেছে।

ইরানে ১৯৫৩ সালে মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পর থেকে, বিশেষ করে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর, ওয়াশিংটন বারবার নিষেধাজ্ঞা, নাশকতা, গোপন অভিযান, রাজনৈতিক চাপ এবং অস্থিতিশীলতামুখী শক্তিকে সমর্থনের মাধ্যমে ইরানের অভ্যন্তরীণ গতিপথ প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। ফলে আন্তঃহস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি, যদি আন্তরিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা কয়েক দশকের ‘রেজিম চেঞ্জ’ নীতি থেকে নাটকীয় পশ্চাদপসরণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

এর অর্থ হলো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেওয়া, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা দুর্বল করা বা রাষ্ট্রীয় পতন ঘটানোর চেষ্টা এই চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। একটি বড় সামুদ্রিক ছাড়ের অংশ হিসেবে, সমঝোতা স্মারকে ওয়াশিংটনকে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া, ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা সরানো এবং ধীরে ধীরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এই কাঠামো ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মাইন অপসারণ, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে ওমান ও অন্যান্য উপকূলীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা নিয়ে আলোচনা।

উল্টে যাওয়া বাস্তবতা

অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্লস বা শর্তগুলো এই পশ্চাদপসরণের পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। ইরানকে আরও বিচ্ছিন্ন করার বদলে, এই চুক্তিতে পুনর্গঠন সহায়তা, অর্থনৈতিক একীভূতকরণ, নিষেধাজ্ঞা শিথিল, পুনরায় তেল রপ্তানি, জব্দ করা সম্পদে প্রবেশাধিকার, ব্যাংকিং ও বীমা খাতে ছাড় এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সমঝোতা স্মারকে ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে ফেলতে বা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করতে বলা হয়নি।

ইরান দীর্ঘদিনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র চায় না। তবে সমৃদ্ধকরণ এবং পারমাণবিক উপাদানসংক্রান্ত প্রশ্নগুলো আত্মসমর্পণমূলক শর্ত নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। ইরানকে লিবীয় মডেল গ্রহণে, অবকাঠামো ধ্বংসে বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ত্যাগে বাধ্য করা হয়নি।

এই চুক্তিতে আলোচনার সময় নতুন নিষেধাজ্ঞা ও অতিরিক্ত সামরিক মোতায়েনও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে আলোচনা চলাকালে ওয়াশিংটনের উত্তেজনা বাড়ানোর সক্ষমতা সীমিত হয়েছে। জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্তির সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদনের সম্ভাবনা পুরোনো ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকেও সীমিত করতে পারে।

যদি লিখিতভাবে এটি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি ইরানের প্রতি সাম্প্রতিক মার্কিন নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পশ্চাদপসরণগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হবে। অতএব, এই সমঝোতা স্মারক কেবল একটি কূটনৈতিক নথি নয়। এটি মার্কিন-জায়নবাদী কৌশলের পরাজয়ের সূচক।

যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ইরানের আত্মসমর্পণের দাবি দিয়ে। আর শেষ হয়েছে যুদ্ধ বন্ধ করা, সার্বভৌমত্বকে সম্মান করা, অবরোধ তুলে নেওয়া, বাহিনী প্রত্যাহার করা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল নিয়ে আলোচনা, তেল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া, সম্পদ মুক্ত করা এবং রাষ্ট্রকে খণ্ডিত না করে পারমাণবিক প্রশ্নে আলোচনার মার্কিন প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে।

আর ঠিক এ কারণেই জায়নবাদী শাসনব্যবস্থা এবং তাদের সমর্থকেরা এর বিরোধিতা এত তীব্রভাবে করেছে। নেতানিয়াহুর জন্য এই সমঝোতা স্মারক এক কৌশলগত বিপর্যয়। তিনি বারবার সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করতে চেয়েছেন এবং আলোচনাকে ভেস্তে দিতে লেবাননকে কার্যকর উপায় হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই কৌশল গিয়ে ধাক্কা খায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে।

আলোচনা যখন এগোতে থাকে, তখন ইরান দেখিয়ে দেয় যে তারা আলোচনাকে সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তারা ইঙ্গিত দেয়, লেবাননে নতুন করে উত্তেজনা বাড়লে তা আরও বিস্তৃত প্রতিশোধমূলক প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে, বিশেষ করে উত্তর ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। সেই মুহূর্তে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে কঠিন এক সিদ্ধান্ত এসে দাঁড়ায়। তারা হয় নেতানিয়াহুর সংঘাত সম্প্রসারণের প্রচেষ্টাকে সমর্থন অব্যাহত রাখতে পারত, নয়তো কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ধরে রাখতে পারত। শেষ পর্যন্ত তারা দ্বিতীয় পথটি বেছে নেয়। কয়েক দশকের মধ্যে সম্ভবত প্রথমবারের মতো ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের উত্তেজনা বৃদ্ধির নীতি ক্রমশ কৌশলগত সম্পদ নয়, বরং দায় হিসেবে দেখা হতে শুরু করে।

ট্রাম্প মানবিক উদ্বেগ থেকে নেতানিয়াহুকে সংযত করেননি। তিনি তাঁকে থামিয়েছিলেন কারণ নেতানিয়াহুর লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলছিল এবং সেই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও, যার ওপর ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান নির্ভর করছিল।

যখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা ব্যবহারে দ্রুত নিঃশেষিত হচ্ছিল, জ্বালানি বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠছিল, স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অবস্থায় ছিল এবং হরমুজ প্রণালি আঞ্চলিক যুদ্ধকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে রূপ দেওয়ার হুমকি তৈরি করছিল, তখন নেতানিয়াহুর অন্তহীন উত্তেজনা বৃদ্ধির আগ্রহ শুধু ইরান বা লেবাননের জন্য নয়, বরং ওয়াশিংটনের নিজের জন্যও এক বিপদে পরিণত হয়।

তেলের বাইরেও আরও বিস্তৃত স্বার্থ

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আলোচনার বড় অংশই তেল ও গ্যাসকে কেন্দ্র করে হয়েছে, যা বোধগম্য হলেও এটিই পুরো চিত্র নয়। তেল ও গ্যাস এখনো অপরিহার্য এবং বৈশ্বিকভাবে বাণিজ্য হওয়া জ্বালানি পণ্যের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। কিন্তু সংঘাত থেকে যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো জ্বালানি বাজারের বাইরেও আরও গভীর দুর্বলতা রয়েছে।

বিশ্বের মোট হিলিয়াম সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশের বেশি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে রপ্তানি হয়। বিশেষ করে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এই সরবরাহের পথগুলো হরমুজে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। আধুনিক প্রযুক্তির জন্য হিলিয়াম অপরিহার্য। সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, চিকিৎসা ইমেজিং যন্ত্রপাতি, মহাকাশ প্রযুক্তি, ফাইবার-অপটিক উৎপাদন এবং উন্নত বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এটি ব্যবহৃত হয়।

একই বিষয় প্রযোজ্য সার বাজারের ক্ষেত্রেও। উপসাগরীয় উৎপাদকরা বৈশ্বিক অ্যামোনিয়া ও ইউরিয়া বাণিজ্যের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। কিছু হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক অ্যামোনিয়া বাণিজ্যে তাদের অংশ প্রায় ২৩ শতাংশ এবং ইউরিয়া বাণিজ্যে প্রায় ৩৪ শতাংশ। ফলে হরমুজ হয়ে দীর্ঘস্থায়ী কোনো বিঘ্ন ঘটলে তা খাদ্য উৎপাদন, কৃষিপণ্যের দাম এবং একাধিক মহাদেশজুড়ে সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব ফেলবে।

ইরান যা প্রদর্শন করেছে, তা শুধু তেল পরিবহন ব্যাহত করার সক্ষমতা নয়। তারা দেখিয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনীতির বৃহত্তর অবকাঠামোর ওপরও তারা বাড়তি ব্যয় চাপিয়ে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করা তাদের জন্য জরুরি ছিল না। বরং তাদের শুধু এটুকু দেখানোই যথেষ্ট ছিল যে উত্তেজনা বৃদ্ধি এমন অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, যা সহ্যসীমার বাইরে।

এই যুদ্ধ উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে শ্রেষ্ঠত্ব বা ‘এস্কেলেশন ডমিন্যান্সের’ ধারণার মৌলিক দুর্বলতাও সামনে নিয়ে এসেছে। কয়েক দশক ধরে মার্কিন সামরিক মতবাদ এই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল যে বিপুল প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব যুক্তরাষ্ট্রকে সংঘাতের গতি ও ফলাফল নির্ধারণের সুযোগ দেয়। কিন্তু ইরানের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান দেখিয়েছে, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব সবসময় রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ নেয় না।

সংঘাতজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ব্যাপকভাবে উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেছে। এর মধ্যে ছিল থাড, অ্যারো, ডেভিডস স্লিং, এসএম-৩ এবং এসএম-৬ ইন্টারসেপ্টর ব্যবস্থা। অনেক ক্ষেত্রে এসব ব্যবস্থা কার্যকর প্রমাণিত হলেও এর মূল্য ছিল অত্যন্ত বেশি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতের ধারাবাহিক পর্যায়ে শত শত উন্নত ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা হয়েছে।

আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যয়ের এক গভীর বৈষম্য তৈরি হয়। কারণ আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় সেগুলো প্রতিহত করতে ব্যবহৃত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক বেশি ব্যয়বহুল। ফলে কোনো প্রতিপক্ষ শুধু ধারাবাহিক চাপ বজায় রেখেই বিপুল আর্থিক ও সরবরাহগত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

ক্ষয়িষ্ণু দুই মার্কিন স্তম্ভ

এই সংঘাতের প্রভাব শুধু ইরান, ইসরায়েল কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই সংকট উন্মোচন করেছে সেই দুটি স্তম্ভকে, যার ওপর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আমেরিকার বৈশ্বিক শক্তির অবস্থান দাঁড়িয়ে আছে—পেট্রোডলার ব্যবস্থা এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব ধরে রাখার জন্য গড়ে তোলা সামরিক ঘাঁটির নেটওয়ার্ক। ১৯৭০-এর দশকের শুরু থেকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ডলারের বিশেষ অবস্থান শুধু মার্কিন অর্থনীতির আকারের কারণে নয়, বরং ওয়াশিংটনের সেই সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করেছে। যার মাধ্যমে তারা জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে এবং বিশ্বের প্রধান তেল উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রেখেছে।

ইরানের সঙ্গে সংঘাত এই মডেলের ক্রমবর্ধমান ভঙ্গুরতাকেই উন্মোচন করেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে সাময়িক বিঘ্নই দেখিয়ে দিয়েছে, বিপুল রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক মূল্য না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আর জ্বালানি সরবরাহের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারে না।

এটি একই সঙ্গে প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে আগে থেকেই চলমান আলোচনাগুলোকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। এর মধ্যে ছিল বিকল্প অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যিক লেনদেনের কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ। যুদ্ধ ডি-ডলারাইজেশনের জন্ম দেয়নি, তবে এটি সেই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে যে ভূরাজনৈতিক চাপ ও বলপ্রয়োগের সঙ্গে জড়িত একটি আর্থিক ব্যবস্থা ক্রমেই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

দশকের পর দশক ধরে ওয়াশিংটন উপসাগরীয় অঞ্চল ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিস্তৃত সামরিক ঘাঁটির এক বিশাল নেটওয়ার্ক বজায় রেখেছিল। কিন্তু যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, এসব ঘাঁটির অনেকগুলোই যেমন সম্পদ, তেমনি দায়ও হয়ে উঠেছে। যেসব স্থাপনাকে একসময় মার্কিন শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হতো, সেগুলো ক্রমেই ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য অসমন্বিত যুদ্ধপদ্ধতির সামনে উন্মুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেখা দিতে শুরু করেছে। আর যখন প্রতিটি বড় সামরিক স্থাপনাই হামলার ঝুঁকিতে পড়ে এবং প্রতিটি মোতায়েনের সঙ্গে রাজনৈতিক ও আর্থিক ব্যয় বাড়তে থাকে, তখন স্থায়ী সামরিক উপস্থিতির যৌক্তিকতাও বদলে যেতে শুরু করে।

শেষ পর্যন্ত ইরানের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো সে কী ধ্বংস করেছে, তা নয়, বরং সে কী উন্মোচন করেছে, সেটি। আর তা হলো, আমেরিকান আধিপত্যের আর্থিক ও সামরিক ভিত্তি ধরে রাখা ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে এবং সেটিকে রক্ষা করাও ক্রমেই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। একই নীতি প্রতিরোধ অক্ষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এই নেটওয়ার্ক নিঃসন্দেহে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। হামাসকে ভয়াবহ মূল্য দিতে হয়েছে, হিজবুল্লাহ উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে এবং পুরো অঞ্চজুড়ে প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো অভূতপূর্ব চাপের মধ্যে পড়েছে।

তবে লক্ষ্য ছিল শুধু দুর্বল করা নয়, বরং সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা। সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। হামাস টিকে গেছে, হিজবুল্লাহ টিকে থেকেছে, ইয়েমেনের প্রতিরোধ অব্যাহত থেকেছে, ইরাকের প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় থেকেছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুরো নেটওয়ার্কের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে ইরান অটুট থেকেছে।

সম্ভবত পুরো সংঘাতের সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হলো—যে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনকে প্রান্তিক করে দেওয়া, সেটিই শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে এনেছে। ৭ অক্টোবরের আগে স্বাভাবিকীকরণকে মুক্তির বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছিল। আব্রাহাম অ্যাকর্ডস, আইএমইসি এবং বৃহত্তর ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ ধারণা দাঁড়িয়ে ছিল এই অনুমানের ওপর যে ফিলিস্তিনকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

ইরান যুদ্ধ সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। আবারও দেখিয়েছে, দখল, বর্ণবাদী বিভাজননীতি এবং একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে অধিকারচ্যুত করার ভিত্তির ওপর কোনো টেকসই আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় না। ইসরায়েলি শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিতে নির্মিত নতুন মধ্যপ্রাচ্যের ধারণা গভীর ধাক্কা খেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে পরিবর্তন করতে চেয়েছিল। ইরানের লক্ষ্য ছিল শুধু তাদের সেই প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দেওয়া। প্রথম পক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। দ্বিতীয় পক্ষ সফল হয়েছে।

আমেরিকান-জায়নবাদী জোটের হাতে ছিল বিপুল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব। তবুও মাসের পর মাস সংঘাত চলার পর যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত সেই রাষ্ট্রের সঙ্গেই আলোচনায় বসতে হয়েছে, যাকে তারা দুর্বল করতে চেয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে যার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন দিয়েছে, সেই মিত্রকেও সংযত করতে হয়েছে। আর যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য আরও কম অনুকূল একটি আঞ্চলিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত ইরান সরাসরি সামরিক বিজয়ের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্জন করেছে। তারা ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে সেই রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে দেয়নি, যার জন্য এই যুদ্ধ শুরু করা হয়েছিল। আর অসমমিত সংঘাতে এটিই সাফল্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড।

লেখক: সামি আল-আরিয়ান, ইস্তাম্বুল জাইম ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক।

অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত