রাজনীতির পালাবদল

১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই। কলকাতার রাজপথ সেদিন এক মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল, যা পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দেয়। তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে মহাকরণ বা রাইটার্স বিল্ডিং অভিযানের ডাক দেওয়া হয়েছিল। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে ও ভোট জালিয়াতি রুখতে ‘ভোটার আইডি কার্ড’ বাধ্যতামূলক করার দাবিতে এই আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়।
সেদিন কলকাতার ধর্মতলা, মেয়ো রোড ও স্ট্র্যান্ড রোডসহ বিভিন্ন মোড়ে জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার যুব কংগ্রেস কর্মী-সমর্থক। আন্দোলনকারীরা মহাকরণের দিকে এগোতে চাইলে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাঁদের পথ আটকায়। পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে শুরু হয় দফায় দফায় সংঘর্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ প্রথমে লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বেলা পৌনে ২টা নাগাদ আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায় পুলিশ।
সেদিন পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ১৩ জন তরুণ আন্দোলনকারী। আহত হন শত শত। ওই ঘটনার পরপরই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতার উত্থান। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিনটিকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন।
১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠিত হওয়ার পরও এই ২১ জুলাইয়ের গুরুত্ব বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং প্রতিবছর ধর্মতলার এই দিনের সমাবেশ আরও বিশালাকার রূপ ধারণ করে। বাংলার মানুষের কাছে দিনটি কেবলই একটি রাজনৈতিক সমাবেশের দিন নয়, এটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ আন্দোলনের লড়াই ও আবেগের বড় প্রতীক।
ওই ঘটনার ১৮ বছর পর, সালটা ২০১১। পরিবর্তনের ঝড়ে আবারও উত্তাল পশ্চিমবঙ্গ। বামফ্রন্ট সরকারের পতনের পর কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড ও ধর্মতলায় এক বিশাল সমাবেশের আয়োজন করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। মাঠজুড়ে কানায় কানায় লোক। মঞ্চে উপস্থিত তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ প্রথম সারির সমস্ত নেতা। যুব তৃণমূল কংগ্রেসের তৎকালীন সভাপতি শুভেন্দু অধিকারীও সেদিন মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সেদিন একটা বিষয় সবার নজর কেড়েছিল।
গোটা অনুষ্ঠানের পরিচালনা, ঘোষণা ও নিয়ন্ত্রণ ছিল কুণাল ঘোষের হাতে। ওই সময় মমতার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কুণাল যখন সগর্বে মাইক হাতে জনতাকে উদ্বেলিত করছেন, তখন মেদিনীপুরে ঘাসফুল ফুটিয়ে তৃণমূলকে শক্ত ভিত দেওয়া শুভেন্দু মঞ্চের এক কোণে নিশ্চুপ ও নিষ্ক্রিয় হয়ে বসেছিলেন। সেদিনের সেই উপেক্ষা ভালোভাবেই টের পেয়েছিলেন অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ও আত্মমর্যাদাশীল তরুণ নেতা শুভেন্দু। অনেকে বলেন, ওই দিন ব্রিগেডের মঞ্চে অপাঙ্ক্তেয় করে রাখার সেই অপমান শুভেন্দু কখনো ভোলেননি। আজ এত বছর পর সেই উপেক্ষিত নেতাই যখন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম গেরুয়া মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন, তখন তাঁর সেই দীর্ঘ লড়াই ও অভিমানের বৃত্তটি যেন সম্পূর্ণ হলো।
ব্রিগেডের সেই ঘটনার পর থেকেই মমতার সঙ্গে শুভেন্দুর দূরত্ব বাড়তে শুরু করে। শুভেন্দুর মনে হয়েছিল, দলীয় নেতৃত্বে তাঁকে টপকে কুণাল ঘোষকে সামনে আনা হচ্ছে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই এই অলিখিত সিদ্ধান্তে সায় দিয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতি চিরকালই ছিল তীব্র আবেগ, আনুগত্য এবং কেন্দ্রের একক নিয়ন্ত্রণের ওপর ভিত্তি করে গড়া। সেখানে শুভেন্দুর মতো তরুণ নেতার স্বাধীন উত্থানকে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব খুব একটা সহজভাবে নেয়নি।
এরপর আসে আরও একটি বড় ধাক্কা। রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কে যুব তৃণমূলের সভাপতি করার আভাস দেওয়া হয়েছিল এবং সেই লক্ষ্যে তাঁর অস্ট্রেলিয়া সফরও বাতিল করা হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নাটকীয়ভাবে সৌমিত্র খাঁকে সেই পদে বসানো হয়। আর এর মাধ্যমে যুব সংগঠনের নেতৃত্ব থেকে শুভেন্দুকে প্রকারান্তরে ছেঁটে ফেলা হয়।
মুকুল রায় যুগ ও অভিষেকের উত্থান
তৃণমূলের অন্দরে তখন মুকুল রায়ের দাপট তুঙ্গে। দলের মুখ্যমন্ত্রী মুখ মমতা হলেও মুকুল রায় ছিলেন দলের মূল সাংগঠনিক মেরুদণ্ড। কিন্তু দ্রুতই পট পরিবর্তন শুরু হয়। দৃশ্যপটে আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের যুব সংগঠনে তাঁর দ্রুত পদোন্নতি ইঙ্গিত দিচ্ছিল, মুকুল রায় নাকি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়—ভবিষ্যতে কে হবেন মমতার উত্তরসূরি।
এই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে শুভেন্দু বুঝতে পারেন, তিনি দলে যতই অবদান রাখুন না কেন, এক নম্বর বা দুই নম্বর জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনা তাঁর নেই। পরে মুকুল রায় দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিলে অভিষেকের হাত আরও শক্ত হয়। এই সময় থেকেই বিজেপির পক্ষ থেকে শুভেন্দুর সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু হয়।
শুভেন্দুর বাবা বর্ষীয়ান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শিশির অধিকারী প্রথমে তাঁর ছেলেকে দল ছাড়তে নিষেধ করেছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও শিশির অধিকারীর মাধ্যমে শুভেন্দুর ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। শুভেন্দুর মূল আপত্তি ছিল দলের ওপর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব নিয়ে।
মুকুল রায় ও শুভেন্দুর পার্থক্য
মুকুল রায় যখন বিজেপিতে যোগ দেন, তখন তিনি সারদা কেলেঙ্কারির মতো একাধিক তদন্তের মুখোমুখি এবং দলে তাঁর গুরুত্বও শেষ হয়ে আসছিল। তাঁর দলবদল ছিল একপ্রকার রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। কিন্তু শুভেন্দুর ক্ষেত্রে সমীকরণটি ছিল ভিন্ন। বিজেপি তাঁকে শুধু একজন দলত্যাগী নেতা হিসেবে দেখেনি, বরং মমতাবিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে যোগ্য আঞ্চলিক মুখ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। ঠিক যেভাবে আশির দশকে লালকৃষ্ণ আদভানিরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে বাম-বিরোধী লড়াইয়ের অদম্য সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন, সেভাবেই অমিত শাহরা শুভেন্দুর মধ্যে মমতার বিকল্প খুঁজে পান।
দিঘার সেই অধিবেশন এবং শেষ বিদায়
তৃণমূল ত্যাগের ঠিক আগে পূর্ব মেদিনীপুরের দিঘায় একটি বিশাল রাজ্য সম্মেলনের আয়োজন করে তৃণমূল কংগ্রেস। শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন এর প্রধান সংগঠক। নিজের চেনা মাঠে এই বিশাল আয়োজনের পর তিনি আশা করেছিলেন দল তাঁর অবদানের যথাযোগ্য স্বীকৃতি দেবে। কিন্তু সেই সম্মেলন একটি সাংগঠনিক আলোচনার চেয়ে ব্যক্তিগত স্তুতির অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। এটিই ছিল শুভেন্দুর জন্য শেষ পেরেক।
২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর মেদিনীপুরে অমিত শাহের হাত ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু অধিকারী। এরপর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নিজের ঘরের মাঠ নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে তিনি ইতিহাস গড়েন। সেই ঐতিহাসিক জয় তাঁকে মমতার ছায়া থেকে বের করে এক স্বাধীন জননেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
আরএসএস এবং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মুখ
বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর শুভেন্দু দ্রুত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) মতাদর্শের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেন। আরএসএসের ঐতিহ্যবাহী পোশাক বা ‘গণবেশ’ পরে তাঁর সংঘের সমাবেশে যোগদান রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের উপস্থিতিতে এক বড় সম্মেলনে তাঁর অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, সংঘ পরিবার তাঁকে পূর্ণাঙ্গভাবে গ্রহণ করেছে।
বর্তমানে শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গে কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রধান মুখদের একজন। অনুপ্রবেশ, নাগরিকত্ব ও মেরুকরণের মতো রাজনৈতিক বিষয়গুলোতে তিনি সর্বদা প্রথম সারিতে অবস্থান নিয়ে কথা বলেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও আগামীর পরীক্ষা
ব্যক্তিগত জীবনে শুভেন্দু রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের অনুসারী। তিনি চিরকুমার। রাজনীতির বাইরে তিনি অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ হিসেবে পরিচিত। দিল্লিতে মন্ত্রী থাকার সময়ও কলকাতা থেকে সরাসরি টাটকা ইলিশ-চিংড়ি আনিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করার গল্প ঘনিষ্ঠ মহলে এখনো চর্চিত হয়। দলের অন্যান্য রাজ্য নেতাদের তুলনায় শুভেন্দুর রয়েছে দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা।
২০১১ সালে ব্রিগেডের সেই নীরব ও উপেক্ষিত শ্রোতা থেকে ২০২৬ সালে এসে বাংলার মসনদ দখল—শুভেন্দু অধিকারীর এই যাত্রাপথ অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। তবে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—বাংলার বহুত্ববাদী ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির মধ্যে বিজেপির মতাদর্শকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা। এর উত্তর মিলবে ভবিষ্যতে।
এনডিটিভিতে প্রকাশিত লেখক ও সাংবাদিক জয়ন্ত ঘোষালের নিবন্ধ থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে যখন বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ বাড়তি জীবনযাত্রার খরচে চাপে পড়েছে, তখন কিছু বহুজাতিক কোম্পানি এই সংকট থেকেই বিপুল মুনাফা অর্জন করছে। যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তার কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
১ দিন আগে
ইরান যুদ্ধ বিশ্ব জ্বালানি বাজারে যে ক্ষত তৈরি করেছে, তা কেবল সাময়িক মূল্যবৃদ্ধি নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি এক কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জ্বালানির দাম কমার আশ্বাসের বিপরীতে পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র এক অভূতপূর্ব জ্বালানি মজুত সংকটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
১ দিন আগে
তিস্তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নদীসংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় কাঠামোগুলো অনুসরণের কথা বলেছে ভারত। আজ বৃহস্পতিবার (৭ মে) তিস্তা নদীর পানিবণ্টন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অভিন্ন নদীর সংখ্যা ৫৪টি এবং এসব নদীসংক্রান্ত সব ধরনের...
২ দিন আগে
অর্থনৈতিক অসন্তোষ সাধারণত ক্ষমতাসীন দলকে ক্ষমতাচ্যুত করে। কিন্তু ভারতে এখন সেই অসন্তোষই অন্তত আপাতত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পক্ষে কাজ করছে। আর এই প্রবণতা ভারতকে ক্রমেই মোদির এক দল বিজেপির শাসনের অধীনে নিয়ে যাচ্ছে।
২ দিন আগে