Ajker Patrika

ইরানের এবারের বিক্ষোভ কেন অতীতের চেয়ে আলাদা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১০: ০৮
ইরানের হামেদান শহরের রাস্তায় বিজয় চিহ্ন দেখাচ্ছেন এক বিক্ষোভকারী। ছবি: সিএনএন
ইরানের হামেদান শহরের রাস্তায় বিজয় চিহ্ন দেখাচ্ছেন এক বিক্ষোভকারী। ছবি: সিএনএন

ইরানে চলমান নতুন দফার বিক্ষোভ দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রার মান দ্রুত কমে যাওয়া দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। সরকারি দমনপীড়নের মুখে অনেক জায়গায় বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) এই বিষয়ে এক প্রতিবেদনে সিএনএন জানিয়েছে, গত মাসে তেহরানের বাজার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সংগঠিত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল, সেটাই এখন ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নেতৃত্বহীন ও সমন্বয়হীন এই আন্দোলন অর্থনৈতিক দাবির সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষোভ মিশে যাওয়ায় আরও বিস্ফোরক হয়ে উঠেছে।

বিক্ষোভের বর্ণনা দিয়ে তেহরানের এক বাসিন্দা বলেছেন, ‘এবারের আন্দোলন আলাদা। কারণ, এটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে। মানুষ সত্যিই কিছু কিনতে পারছে না। দাম ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।’

জানা গেছে, গত মাসে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা সরকারের ব্যর্থ অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়, যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানিকারকদের জন্য স্বল্পমূল্যে ডলার পাওয়ার একটি কর্মসূচি বাতিল করে। এর ফলে রান্নার তেল, মুরগির মতো নিত্যপণ্যের দাম রাতারাতি বেড়ে যায় এবং কিছু পণ্য বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়। এই অবস্থায় ঐতিহাসিকভাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সমর্থক হিসেবে পরিচিত বাজারিরা দোকান বন্ধ করে আন্দোলনে নেমে গেলে সরকার প্রবল চাপের মুখে পড়ে যায়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার সামান্য নগদ সহায়তা (প্রতি মাসে প্রায় ৭ ডলার) দেওয়ার ঘোষণা দেয়। তবে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বীকার করেন, সরকার একা এই সংকট সমাধান করতে পারবে না। এরই মধ্যে বিক্ষোভ বিভিন্ন প্রদেশের শহরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। বর্তমানে দেশটির ইলম ও লোরেস্তানের মতো পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলো বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সেখানে খামেনির পতন ও মৃত্যু কামনা করে স্লোগানও শোনা যাচ্ছে। এই স্লোগান দীর্ঘ বছর ধরে শক্ত হাতে ক্ষমতা ধরে রাখা ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে।

রাজধানী তেহরানের শত বছরের পুরোনো এই বাজারের দোকানিরা দোকান বন্ধ রেখে আন্দোলনে নেমেছে। ছবি: সিএনএন
রাজধানী তেহরানের শত বছরের পুরোনো এই বাজারের দোকানিরা দোকান বন্ধ রেখে আন্দোলনে নেমেছে। ছবি: সিএনএন

মানবাধিকার সংস্থাগুলো দাবি করেছে, ১১ দিনের বিক্ষোভে অন্তত ৩৮ জন নিহত এবং ২ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো নিহত ও গ্রেপ্তারের পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বরং পশ্চিমাঞ্চলে হওয়া সংঘর্ষে শতাধিক পুলিশ ও বাসিজ সদস্য আহত হওয়ার খবর দিয়েছে।

ইরানে এবারের বিক্ষোভকে ২০২২ সালে মাশা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হওয়া আন্দোলনের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এবারের বিশেষত্ব হলো বাজারিরা, যাঁরা ঐতিহাসিকভাবে দেশটির রাজনৈতিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এবার তাঁরাই আন্দোলনের সূচনা করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, মুদ্রার অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক ধস তাঁদের এই অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিকল্প রাজনৈতিক কাঠামো না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে ইরানের শাসনব্যবস্থা বদলের সম্ভাবনা কম। তবে ব্যাপক এই অস্থিরতা ইরান সরকারের গভীর সংকট, জনগণের আস্থাহীনতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত