Ajker Patrika

খামেনির উত্থান ও মৃত্যু, একটি যুগের সমাপ্তি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৬, ১২: ১৯
খামেনির উত্থান ও মৃত্যু, একটি যুগের সমাপ্তি
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ছবি: সংগৃহীত

জর্জ অরওয়েল তাঁর বিখ্যাত ‘১৯৮৪’ উপন্যাসে লিখেছিলেন, ‘গোষ্ঠীতান্ত্রিক শাসনের মূল নির্যাস হলো একটি নির্দিষ্ট বিশ্বদর্শন এবং জীবনযাত্রাকে টিকিয়ে রাখা, যা মৃতরা জীবিতদের ওপর চাপিয়ে দেয়।’ চার দশক ধরে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইরানে ঠিক সেই কাজটিই করে গেছেন। তিনি ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান গড়ে তোলেননি, বরং এর প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির কাছ থেকে এটি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লব যা মার্কিনঘেঁষা রাজতন্ত্র উৎখাত করে এক ধর্মতাত্ত্বিক শাসন কায়েম করেছিল। আর এর তিনটি প্রধান স্তম্ভ ছিল— ‘আমেরিকা নিপাত যাক’, ‘ইসরায়েল নিপাত যাক’ এবং নারীর হিজাব।

খোমেনি বলেছিলেন, হিজাব হলো ‘বিপ্লবের পতাকা’। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর খামেনির জীবনের একমাত্র ব্রত ছিল সেই বিপ্লবকে বাঁচিয়ে রাখা, যদিও ইরানি সমাজ অনেক আগেই সেই আদর্শ থেকে বহুদূরে সরে গিয়েছিল। কিন্তু এরপরও এই কাজে সফল হয়েছিলেন খামেনি। তবে তিনি যে বিশ্বদর্শন চাপিয়ে দিয়েছিলেন, তা কখনোই তাঁর নিজস্ব ছিল না; তিনি ছিলেন এক ‘প্রেতাত্মার’ মুখপাত্র।

৪৭ বছরের বিপ্লবী ইতিহাসে খামেনির মৃত্যু একটি বিশাল মোড়। যে দেশগুলোকে তিনি ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাদের হাতেই তাঁর মৃত্যু হলো। তিনি ছিলেন এই শাসনের প্রথম প্রজন্মের শেষ পুরোধা।

খামেনির উত্থান নিয়তি নয়, বরং রাজনৈতিক চালের ফসল। ১৯৮৯ সালে পার্লামেন্টের তৎকালীন স্পিকার আলী আকবর হাশেমি রাফসানজানি দাবি করেছিলেন, খামেনিকে স্থলাভিষিক্ত করা খোমেনির অন্তিম ইচ্ছা ছিল। রাফসানজানি হয়তো ভেবেছিলেন খামেনি হবেন একজন পুতুল শাসক, যাকে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। কিন্তু মাশহাদের এক দরিদ্র মৌলভির সন্তান খামেনির পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন।

তাঁদের এই রেষারেষি তিন দশক স্থায়ী হয়েছিল। রাফসানজানি আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বিশ্বাসী ছিলেন; অন্যদিকে খামেনি মনে করতেন, আদর্শে আপস করলে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো এই শাসনেরও পতন ঘটবে। মেকিয়াভেলি যেমনটি সতর্ক করেছিলেন, ‘যে অন্যকে শক্তিশালী করার কারণ হয়, সে নিজেই ধ্বংস হয়।’

ধর্মীয় বৈধতার ঘাটতি এবং নিজের নিরাপত্তার জন্য খামেনি ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’কে (আইআরজিসি) তাঁর ব্যক্তিগত বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলেন। তিনি নিজেই কমান্ডারদের বাছাই করতেন এবং তাঁদের নিয়মিত রদবদল করতেন যাতে কেউ তাঁর সমকক্ষ হয়ে উঠতে না পারে। ধীরে ধীরে আইআরজিসি শীর্ষ ধর্মীয় নেতাদের ছাড়িয়ে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। খামেনি নির্বাচিত প্রেসিডেন্টদের নামমাত্র পুতুল হিসেবে ব্যবহার করতেন। রাফসানজানির অর্থনৈতিক বাস্তববাদ, খাতামির উদার আকাঙ্ক্ষা কিংবা রুহানির পারমাণবিক কূটনীতি—সবই খামেনির অনমনীয়তার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে।

তেহরানের এক শিক্ষাবিদ একবার বলেছিলেন, বিপ্লবের শুরুতে এই শাসনে ৮০ শতাংশ ছিল অন্ধ বিশ্বাসী এবং ২০ শতাংশ ছিল সুবিধাবাদী। খামেনির শেষ সময়ে এই অনুপাত উল্টে গিয়েছিল—২০ শতাংশ বিশ্বাসী আর ৮০ শতাংশই ছিল সুযোগ সন্ধানী।

তবে খামেনির আমেরিকা-বিদ্বেষ কেবল আদর্শিক ছিল না, এটি ছিল তাঁর টিকে থাকার কৌশল। প্রভাবশালী আলেম আহমদ জান্নাতি একবার বলেছিলেন, ‘যদি ইরানে আমেরিকা-ঘেঁষা কেউ ক্ষমতায় আসে, তবে আমাদের সবকিছুকে বিদায় জানাতে হবে।’ খামেনি নিজেও বিশ্বাস করতেন, ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সমঝোতা সম্ভব, কিন্তু ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ ও আমেরিকার মধ্যে তা অসম্ভব। এরিক হফার তাঁর ‘দ্য ট্রু বিলিভার’ বইতে লিখেছেন, ‘ঘৃণা সবচেয়ে সহজ ও সর্বগ্রাহী ঐক্যসৃষ্টিকারী উপাদান। ঈশ্বরে বিশ্বাস ছাড়াও গণ-আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে পারে, কিন্তু শয়তান (শত্রু) ছাড়া তা অসম্ভব।’ খামেনির কাছে সেই শয়তান ছিল আমেরিকা।

খামেনিই চেয়েছিলেন ইরানকে বৈশ্বিক পুঁজিবাদ ও নাগরিক সমাজের প্রভাব থেকে দেয়াল তুলে আলাদা রাখতে। তিনি মনে করতেন পশ্চিমা সংস্কৃতি পশ্চিমা বোমার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। কিন্তু এই বিচ্ছিন্নতার চরম মূল্য দিতে হয়েছে ৯ কোটি ইরানি জনগণকে। রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে তিনি সামাজিক চুক্তির বদলে এক জবরদস্তিমূলক ইজারা হিসেবে দেখতেন। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন—কার সঙ্গে প্রেম করবে, কী পান করবে বা মাথায় কী পরবে বা পরবে না—সবই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। একদিকে জনগণের জন্য কৃচ্ছ্রসাধনের উপদেশ, অন্যদিকে রেভল্যুশনারি গার্ডদের করমুক্ত ব্যবসার পাহাড়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যখন ফের বিক্ষোভ শুরু হলো, খামেনি সম্ভবত আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দমনপীড়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

খামেনি এমন এক বিপ্লবকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, যা বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। জর্জ কেনান সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে লিখেছেন, কোনো মসিহবাদী আন্দোলন চিরকাল বাস্তবতাকে অস্বীকার করে টিকে থাকতে পারে না। খামেনিই চার দশক ধরে জোর করে সেই পরিবর্তনকে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন।

শেষ পর্যন্ত খামেনির পতন ঘটল ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো উগ্রবাদীদের হাতে, যাঁদের তিনি চরম ঘৃণা করতেন। সারা জীবন তিনি ‘আমেরিকা ও ইসরায়েলের মৃত্যু’ কামনা করেছেন, শেষ পর্যন্ত সেই আমেরিকা ও ইসরায়েলের আঘাতেই তাঁর জীবনের অবসান ঘটল!

দ্য আটলান্টিকে প্রকাশিত করিম সাজ্জাদপুরের নিবন্ধ অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

নিজ দপ্তরেই মারা যান খামেনি, কখন মৃত্যু হয়—জানাল ইরান

‘অমুসলিম’ শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে রাবি প্রশাসনের ‘গণ-ইফতার’

খামেনিকে হত্যা করে ‘বড় ভুল’ করল যুক্তরাষ্ট্র, পরিণতি কী

ইরানের দ্রুত জবাবে বড় পরীক্ষার মুখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা

খামেনির মরদেহ পাওয়া গেছে, ইসরায়েলের শীর্ষ কর্মকর্তার দাবি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত