মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪

সেকশন

 

সাক্ষাৎকার: আফসান চৌধুরী

ইতিহাস ক্ষমতাবানদের একটা অস্ত্র

আফসান চৌধুরী সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক। চার দশকের বেশি সময় ধরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছেন। হাসান হাফিজুর রহমানের অধীনে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র’ প্রকল্পের অন্যতম গবেষক ছিলেন তিনি। ‘বাংলাদেশ ১৯৭১’ নামে তাঁর সম্পাদনায় বেরিয়েছে চার খণ্ডের মুক্তিযুদ্ধের অসামান্য দলিল। বর্তমানে কাজ করছেন গ্রামের ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর একাত্তর নিয়ে। সম্প্রতি আজকের পত্রিকার মাসুদ রানার সঙ্গে কথা বলেছেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চার সংকট নিয়ে। 

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৩, ১৩:৫৭

আফসান চৌধুরী আজকের পত্রিকা: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেন কোন দায় থেকে?
আফসান চৌধুরী: এটা তো দায়ের বিষয় নয়। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিষয়ে পড়েছি। আমার জীবনের একটাই লক্ষ্য ছিল—ইতিহাসবিদ হওয়া। আমরা তো একাত্তরের প্রজন্ম। তাই আমাদের কাছে একাত্তরটি অন্য রকম ব্যাপার। আমার কাছে নিজের কথা বলাটাই একাত্তরের বিষয় হয়ে যায়। কিন্তু বিষয়টা সে রকম নয়। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পরীক্ষা দেওয়ার পর তখনো রেজাল্ট বেরোয়নি। সেই সময় আমার একটা চাকরির খুব দরকার ছিল। তখন আমি চাকরি খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পের খবর পাই। সেখানে গিয়ে গবেষকের সহকারী হিসেবে একটা চাকরি হয়ে যায়। আমি প্রত্নতত্ত্ব ও প্রাচীন ভারতের ইতিহাস নিয়ে এমএ পাস করেছিলাম। আমার ওই বিষয়ে শিক্ষক হওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল। তবে আমি শিক্ষক হতে পারিনি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পে যেহেতু গঠন পর্ব থেকে যুক্ত ছিলাম, সেহেতু একটা নির্দিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপিত হলো। আমার পিএইচডি থিসিসের বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশ ধারণার ইতিহাস কত পুরানো’। ১৯৮২ সালে আমি পিএইচডি গবেষণা বন্ধ করে দিই। তখন আমার মনে হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের (তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলছি) অনেকের দোদুল্যমানতা আছে এবং দরজা খোলা-বন্ধের বিষয় আছে। এ কারণে তাঁদের সঙ্গে আমার মনের মিল হতো না। তাঁদের কাছে ইতিহাসচর্চা হলো শুধু শৌখিনতার বিষয়। আর ওপরতলার চোখ দিয়ে এবং পশ্চিমা দৃষ্টি দিয়ে ইতিহাস দেখার বিষয়টি আমার অপছন্দ ছিল। এর মধ্যে ১৯‍৮২-৮৩ সালের দিকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমার কাছে নেশার মতো হয়ে দাঁড়ায়। সেই থেকে আমার যাত্রা শুরু। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গবেষণার সঙ্গে জড়িত হওয়ার কারণে আমার জীবনটা পাল্টে গেছে।

আজকের পত্রিকা: আপনি আপনার বিভিন্ন লেখায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চার সমস্যা ও ঘাটতির কথা বলেছেন। সমস্যাগুলো আসলে কী ধরনের?
আফসান চৌধুরী: আমার কাছে মনে হয়, একটা তথ্যের এবং অন্যটি হলো তত্ত্বের সমস্যা। সত্যি কথা হলো, আমরা সঠিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করিনি। নিরপেক্ষভাবে এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি আমাদের দেশে কারও মধ্যেই ছিল না। সাধারণ মানুষের তথ্য খুবই কম। যেভাবে এসব তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, যেমন সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে তথ্য বের করে আনার বিষয়টি আমাদের দেশে দুর্বল। তথ্যের যে ভিত্তি থাকা দরকার, সেটাই আমাদের দুর্বল হয়ে আছে। এটা একটা বড় সমস্যা। সেই ঘাটতিটা মেটানো কতটা সম্ভব, সেটা আমি জানি না। কারণ, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের যাঁরা প্রত্যক্ষদর্শী, তাঁদের বেশির ভাগ লোক মারা গেছেন। আমার বয়স বর্তমানে ৭১ বছর চলছে। সে হিসাবে গ্রামের মানুষের যে গড় আয়ু, তাতে মুক্তিযুদ্ধের বেশির ভাগ সাক্ষী মারা গেছেন, বিশেষ করে যাঁরা বেঁচে আছেন, যাঁরা অবস্থাপন্ন, রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান ও ক্ষমতায় আছেন, প্রভাবশালী সাক্ষী এবং যাঁরা সেনাবাহিনীতে ছিলেন, তাঁরা তো সত্যি কথা বলেন না।  তথ্যের যে ভান্ডারটা তৈরি করার দরকার ছিল, সেটা আমরা কেউ নজর দিয়ে তৈরি করিনি। তাই যাঁরা নিজের মতো করে যা কিছু লিখছেন, সেটাকে আমরা ইতিহাস বলতে পারি না। নিজের কথাকেই আমরা প্রমাণ করার চেষ্টা করি, এটা একটা বড় ঝামেলা। আপাতত এ থেকে আমরা মুক্তি পাচ্ছি না। তাই আগামী প্রজন্ম কী ধরনের ইতিহাস পাবে, এটা নিয়ে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। এ কারণে নতুন প্রজন্ম এই ইতিহাস নিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

আর তত্ত্বের সমস্যাটি হলো জাতীয়তাবাদ। আগে ছিলাম মুসলমান আর এখন হয়েছি বাঙালি। জাতীয়তাবাদ হলো বাতিল হয়ে যাওয়া এবং পশ্চিমা একটা ধারণা। এটা কী কারণে এ দেশে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হলো, সেটা ভাবা যায় না। ঔপনিবেশিক সমাজে এ ধারণাটা জনপ্রিয় হতে পারে। আমাদের ইতিহাস হলো, দীর্ঘ সময়ের ইতিহাস।আর মুক্তিযুদ্ধকে ‘মহান’ করে দেখাটাও বড় সমস্যা। এটাও আমাদের সঠিকভাবে ইতিহাসচর্চার অন্তরায়। আর এ বিষয়গুলো যত দিন সুশীল ভদ্র লোকের হাতে থাকবে, তার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক যাঁরা জড়িত আছেন, তত দিন পর্যন্ত মোটামুটি বিশ্বাসযোগ্য, নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনা অসম্ভব। তাই সাধারণ মানুষের নিজের ইতিহাসটা লেখা এবং অনুসন্ধান করা উচিত। প্রাতিষ্ঠানিক লোকজন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখার কাজটিকে দখল করে রেখেছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তো অপ্রাতিষ্ঠানিকতার ইতিহাস। আমাদের প্রধান ইতিহাসবিদেরা তো সমাজতত্ত্ব, রাজনৈতিক দর্শন, নৃ-বিজ্ঞানই পড়েননি। তাহলে তাঁরা কীভাবে সাধারণ মানুষের ইতিহাস লিখবেন! 

আজকের পত্রিকা: এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এবং তাদের বুদ্ধিজীবীরা ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কেই প্রতিষ্ঠিত করার কাজে ব্যতিব্যস্ত।
আফসান চৌধুরী: কথাটা তো এ রকম যে একটা জাতীয়তাবাদ থাকতে হবে। তাহলে আমরা পাকিস্তান আমলে কেন মুসলিম লীগ করেছি, আমরা যদি বাঙালি হয়ে থাকি তাহলে তো কংগ্রেস করার কথা ছিল। এসব কথা আমাদের বুদ্ধিজীবী ও ইতিহাসবিদেরা কেউই বলেন না। ১৯৪৭ সালে যখন যৌথ বা অখণ্ড বাংলা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন হলো, তখন বাঙালিত্বই যদি আমাদের প্রধান পরিচয় হতো তাহলে কেন আমরা একটা রাষ্ট্র করতে পারলাম না। সেটা কি তারা জানে? বাংলা ভাগ বাস্তব হলো না কেন? কারণ জওহরলাল নেহরু বললেন, তোমরা এটা করতে পারবে না। তখন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বললেন, একটা স্বাধীন দেশ করা তো যায়। জাতীয়তাবাদের যুক্তিটা হলো যেকোনো উপায়ে রাষ্ট্র গঠন। যে যুক্তিতে রাষ্ট্র গঠন হয়, সেটাই যৌক্তিক। কারণ, ভারত ও পাকিস্তানে রাষ্ট্র গঠনের বিষয়টি একই ইতিহাস থেকে হয়নি। আর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রায় একই কথা বলে। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয়করণ করে ফেলেছে, বিএনপি তো এটাকে সেনাবাহিনীর যুদ্ধ বানিয়ে দিয়েছে। তাই জনগণ চোখ, কান খুলে বসে আছে। তোমরা ইতিহাস নিয়ে ঝগড়া করো।

আজকের পত্রিকা: নতুন প্রজন্মের কাছে একাত্তরের ইতিহাস নিয়ে আগ্রহটা কেমন?
আফসান চৌধুরী: আমি একাত্তরের ইতিহাস নিয়ে অধিকাংশ জনগণের কোনো আগ্রহ বা শ্রদ্ধাবোধ দেখতে পাই না। এর কারণটি হলো, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থের ঝগড়াঝাঁটি। আর এক ধারার বামদের কাজ হলো, শেখ মুজিবুর রহমান খারাপ, এটা প্রমাণ করা। তিনি খারাপ হতে পারেন, তাই তাঁর বিরোধিতা করতে হবে। এটাই হলো তাঁদের কাছে শ্রেষ্ঠ ইতিহাসচর্চার কাজ। তাঁরা বলতেও পারেন না শেখ মুজিব আর মওলানা ভাসানী কোন সময় রাজনৈতিক বিষয়ে একত্র হয়েছিলেন। তাই এখানে ইতিহাসের বিষয়টি দাঁড়িয়ে গেছে রাজনৈতিক ঝগড়া হিসেবে।

আজকের পত্রিকা: তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একাত্তরের ইতিহাসটা কীভাবে লেখা যেতে পারে? আপনার পরামর্শ কী?
আফসান চৌধুরী: আমার মনে হয়, ওই সুশীল ভদ্রলোকেরা যদি সরকারি ইতিহাস লেখেন, সেটা কেউই বিশ্বাস করবে না। আর বিরোধী দলের ইতিহাসও বিশ্বাস করবে না। কারণ, তারা তো ইতিহাস লিখবে না, শুধু বিরোধিতা করবে। এসব তাদের নিজেদের স্বার্থের বিষয়ের ঝগড়াঝাঁটি। তাই এসব নিয়ে আমি আলোচনা করতে চাই না।তবে তথ্য সংগ্রহের দিকে জোর দিতে হবে। আমরা ২০১৮ সালে একটা কাজ করেছি, সেটা এখনো প্রকাশ হয়নি। কাজটা হলো, আমরা একটি জেলার প্রতিটি গ্রামের গণহত্যার ঘটনাগুলো জরিপ করেছি। আমি মনে করি, ওই কাজটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওই কাজটাকে ভিত্তি করে আরও অনেক কাজ করা যেতে পারে। আমরা যে গ্রামগুলোকে নিয়ে প্রায় ৩৫ বছর ধরে গবেষণা করে যাচ্ছি, আমাদের দল প্রায় ১০ হাজার গ্রামে গেছে। ১০ হাজার গ্রামের তথ্য ও ভাবনা আমরা পেয়েছি।

তবে একটা বিষয় লক্ষ করেছি, আগের দিনের গ্রামের লোকেরা মিথ্যা কথা বলতেন না। কিন্তু এখন তাঁরা এ বিষয়ে সচেতন হয়ে গেছেন। কারণ, যে বিষয়টা বললে অসুবিধা হবে, সেটা তাঁরা বলেন না। এখন এই পরিসরটা কীভাবে একটা স্বাধীন দেশে নষ্ট হয়? নষ্ট হয়, এ কারণে তারা জেনে গেছেন, ইতিহাসটা হয়ে গেছে ক্ষমতাবানদের একটা অস্ত্র। পক্ষে বা বিপক্ষের লোক হন না কেন, তাঁরা এ কারণে চুপ করে থাকেন। এটাই হলো আমাদের সমস্যা। তাই ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে, সেটা সহজে যাবে না।

আজকের পত্রিকা: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। 
আফসান চৌধুরী: আজকের পত্রিকাকেও ধন্যবাদ।

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    পঠিতসর্বশেষ

    এলাকার খবর

     

    কৃষিতে সফল নুরুন্নাহার

    ‘স্বেচ্ছামৃত্য়ু’কে উৎসাহিত করে বিশ্ব কোন পথে

    পুতিনের পঞ্চম তারপর...

    আব্রাহাম লিংকন

    স্বস্তির যাত্রা

    ছুটির আকর্ষণ, ছুটির বিড়ম্বনা

    হত্যা মামলায় ট্রান্সকম গ্রুপের দুই কর্মকর্তার জামিন 

    যে কোনো মূল্যে উপজেলা নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হবে: বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার

    ট্রান্সজেন্ডার বিতর্কে ইউটিউব থেকে প্রত্যাহার ‘রূপান্তর’, যা বললেন নির্মাতা ও অভিনেতা

    অপকর্ম আড়াল করতেই জুলুমের মাত্রা বৃদ্ধি করেছে সরকার: মির্জা ফখরুল