
এফডিসি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়া শুরু করল। এটি ছিল অন্যতম মাইলফলক। ইন্ডাস্ট্রি, চলচ্চিত্রের ভাষা, বিষয়বস্তু—সবকিছু পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হলো এর মধ্য দিয়ে। তখন পর্যন্ত কলকাতা, বম্বে, মাদ্রাজ বা লাহোরের ছবিতে ব্যবহৃত ভাষাকাঠামো, চিন্তাচেতনা, পরিবেশ ইত্যাদি জায়গা পেত এ দেশের চলচ্চিত্রে। এই প্রথম লোকজ ও গ্রামীণ জীবনের কাহিনি নিয়ে ছবি নির্মাণ শুরু হলো।
‘আসিয়া’র মাধ্যমে এটা শুরু হয়। কেউ যদি চলচ্চিত্রটি দেখে থাকেন তাহলে দেখবেন, এখানে কতগুলো সিম্বল আছে। এর পরিচালক ছিলেন ফতেহ লোহানি। নাজির আহমেদ ছিলেন কাহিনিকার। ছবিটির গানে সুরারোপ করেছেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ এবং সংগীত পরিচালনা করেছেন সমর দাস ও আব্দুল আহাদ। এটা এক বিশাল ব্যাপার। পূর্ববঙ্গের যে লোকজ ঐতিহ্য, সে বিষয়গুলো ফুটে উঠল। গানগুলোও তাই। এই ছবির মাধ্যমে একটা নতুন ধারার সৃষ্টি হলো।
এরপর ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ছবির চরিত্র ‘হিন্দু’ বলে পাকিস্তান সরকার তা নির্মাণের অনুমতি দিল না। মুসলমান চরিত্র তৈরি করা হলো। উর্দু ভাষায় নির্মিত হলো। নাম দেওয়া হলো ‘জাগো হুয়া সাভেরা’। এই ছবি ঢাকার চলচ্চিত্রের জন্য এক ইতিহাস।
১৯৫৯ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিম পাকিস্তান ও ভারতের অসাধারণ সব কলাকুশলীর মিলন ঘটেছিল। ছবিটি নির্মিত হয়েছিল উপমহাদেশের রাজনীতিরও এক ক্রান্তিকালে। বাংলা সাহিত্যের অনন্য লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাস অবলম্বনে ছবির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের বিখ্যাত কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ। পরিচালনা করেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানেরই নামজাদা চলচ্চিত্রকার এ জে কারদার। আর পূর্ব পাকিস্তান থেকে ছবির সহকারী পরিচালক ছিলেন জহির রায়হান। প্রধান চরিত্রে ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অভিনেতা খান আতাউর রহমান, কাজী খালেক ও শেখ লতিফ। আতাউর রহমান ও কাজী খালেকের পাশাপাশি শেখ লতিফের চরিত্রটাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে বিদেশি সাংবাদিকরাও এই চরিত্রের ভূয়সী প্রশংসা করেন। ভদ্রলোক এখন মৃত্যুশয্যায়। এই ছবির কলাকুশলীদের মধ্যে সম্ভবত একমাত্র তিনিই এখনো বেঁচে আছেন। ছবিটিতে ছিলেন কলকাতার গণনাট্য সংস্থার বিখ্যাত অভিনেত্রী তৃপ্তি মিত্র। সংগীত পরিচালনায় ভারতের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ তিমির বরণ। ক্যামেরায় ছিলেন অস্কার বিজয়ী ব্রিটিশ চিত্রগ্রাহক ওয়াল্টার লাসালি। সব মিলিয়ে বলতে হয়, এক মহাযোগই ঘটেছিল এই ছবিতে। ছবিটি মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কার পেয়েছিল, প্রতিযোগিতাও করেছিল অস্কারের জন্য।
এফডিসির প্রাথমিক অবস্থায় বেশ কিছু ভালো ছবি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এফডিসি প্রতিষ্ঠা না করলে বাংলাদেশের মানুষের জীবন, ভাষা, সমাজের এত ব্যাপক প্রকাশ বা এর ভাষ্য প্রতিষ্ঠা পেত না।
ভাষা তো বিষয়বস্তু অনুসারে আসে। মরুভূমিতে নিশ্চয়ই জাল ফেলার দৃশ্য দেখানো হবে না। নিজস্ব চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হলে স্থানীয় কলাকুশলীরা নিজেদের ভাষা বলা শুরু করল। ‘আসিয়া’, ‘জাগো হুয়া সাভেরা’, ‘এ দেশ তোমার আমার’, ‘মাটির পাহাড়’ চলচ্চিত্রগুলো খুবই ভালো চলল। ছবিগুলোয় আমাদের এই বাংলার চিত্রটাই কোনো না কোনোভাবে ফুটে উঠল।
এ সময় জহির রায়হান চলচ্চিত্রে জড়িত হন। জহির রায়হান ‘কখনো আসেনি’ নামে একদম বাস্তববাদী ছবি তৈরি করেন। ‘কখনো আসেনি’ ছবি দিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এক নতুন ধারা নিয়ে আসেন জহির রায়হান। এই চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘দেশের জনগণ বিশ বছর পরে যে ছবি দেখবে বলে আশা করেছিল, বিশ বছর আগেই দেশের তরুণেরা সেই ছবি উপহার দিল।’
ষাটের দশকের আরও একটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ‘নদী ও নারী’। চলচ্চিত্রের এক নতুন ভাষা তৈরি হয় এই ছবির মাধ্যমে। হুমায়ূন কবিরের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে ছবিটি নির্মাণ করেন সাদেক খান। ১৯৬৫ সালের ৩০ জুলাই মুক্তি পায় ছবিটি।
সাদেক খানের পরিচালনায় প্রধান দুই চরিত্রে অভিনয় করেন আবদুল খালেক ও রওশন আরা। আরও ছিলেন সুভাষ দত্ত, মাসুদ খান ও গোলাম মুস্তাফা। প্রধান সহকারী ও শিল্প নির্দেশক হিসেবে ছিলেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর। আবেদ হোসেন খানের সংগীত পরিচালনায় গানে কণ্ঠ দেন আবদুল আলীম ও নীনা হামিদ। চিত্রগ্রহণে ছিলেন উইলিয়াম। ‘নদী ও নারী’র জন্য নির্মাতার শ্রম প্রতিটি দৃশ্যে বোঝা যায়। নতুন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সম্পূর্ণ আউটডোর চিত্রায়ণ নিশ্চয় অনেক ব্যয় ও শ্রমের ছিল।
এত সব চেষ্টা আর শ্রম কিন্তু সফলতা পাচ্ছিল না। বিদেশি, বিশেষ করে উর্দু ছবির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের নতুন ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়াতে পারছিল না। সুচিত্রা সেন, নিলু, মেরিলিন মনরোর সঙ্গে আমাদের নতুন নায়িকা সুমিতা দেবী, শবনম, রওশন আরাদের জনপ্রিয়তায় পাল্লা দিতে হতো। এই অবস্থায় আমাদের ইন্ডাস্ট্রির ছবিগুলো ফ্লপ হওয়া শুরু হলো। তখন নির্মাতারা চিন্তা করলেন, যদি আমরা পশ্চিম পাকিস্তানের বাজারটা ধরতে পারি, তাহলে ইন্ডাস্ট্রিটা টিকে থাকবে।
বাঙালি পরিচালকেরাও উর্দু ভাষায় ছবি নির্মাণ শুরু করলেন। এর মধ্যে এহতেশাম বানালেন ‘চান্দা’, যা সুপারডুপার হিট হলো পুরো পাকিস্তানে। শুরু হলো নাচেগানে ভরা অদ্ভুত একধরনের ছবির জোয়ার। যে আব্দুল জব্বার খান ‘মুখ ও মুখোশ’ বানিয়েছেন, তিনিও উর্দু ভাষায় ছবি নির্মাণ শুরু করলেন। জহির রায়হানের ‘কখনো আসেনি’, ‘কাচের দেয়াল’-এর মতো ছবি ফ্লপ হলো। জহির রায়হানও তখন উর্দু ভাষায় ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করলেন। এটি কিন্তু পাকিস্তানের প্রথম রঙিন ছবি। অবাক কাণ্ড! আমাদের এখানে কোনো সুযোগ-সুবিধা ছিল না, তার পরও তাঁরা নানা রকমের কসরত করে ছবিটা তৈরি করলেন। উর্দু ভাষায় ছবি তৈরির জোয়ার এল।
অনুপম হায়াৎ: চলচ্চিত্র গবেষক ও বিশ্লেষক। চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের সাবেক সদস্য।
(অনুলিখন: মীর রাকিব হাসান)

সে এক সময় এসেছিল আমাদের দেশে, যখন পাকিস্তানি জোশে আক্রান্ত হয়ে একদল কবি-সাহিত্যিক বাংলা ভাষাটাকে হাস্যকর করে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, ভাষার মধ্যে জোর করে আরবি-ফারসি-উর্দু ঢুকিয়ে দিলেই ভাষাটি হয়ে যাবে মুসলমানের ভাষা। এর যে কোনো জাতপাত নেই, ধর্ম-অধর্ম নেই, সে কথাটা তাঁরা বিশ্বাস করতেন না।
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমে একদম স্পেনের সীমান্ত ঘেঁষে পিরিনিজ পর্বতমালা। এই পর্বতমালার দুই পাশে স্পেন ও ফ্রান্স। এই দুই দেশ মিলিয়ে ছবির মতো ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার বা ৮ হাজার বর্গমাইল ক্ষেত্রফলের এক বিশাল অঞ্চলে পাহাড়ি উপত্যকায় প্রাচীনকাল থেকে বাস করে আসছে বাস্ক জাতির মানুষ।
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
একমাত্র বলা যাবে না। তবে বাংলা ভাষার সংগ্রামের ইতিহাসটা দীর্ঘ। সেটা এই উপমহাদেশে তো বটে, বিশ্বেও বিরলতম ঘটনা। ইতিহাসের এই তথ্য স্বীকার করতে হবে। বাংলা ভাষা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশে যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হয়েছিল ১৯৫২ সালে, সেটা ছিল ভাষার জন্য বাংলা ভাষাভাষীদের আন্দোলনের...
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও মানুষ ধীরে ধীরে ক্যাশলেস লেনদেনের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে, যা অর্থনীতির আধুনিকায়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ একটি অগ্রগতি। এটি শুধু সময় সাশ্রয় করে না, বরং নিরাপদ, স্বচ্ছ ও কার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০ মার্চ ২০২৫