Ajker Patrika

একমাত্র নয়, তবে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস আছে বাংলা ভাষার

রজত কান্তি রায়, ঢাকা  
আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০: ০৭
একমাত্র নয়, তবে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস আছে বাংলা ভাষার

একমাত্র বলা যাবে না। তবে বাংলা ভাষার সংগ্রামের ইতিহাসটা দীর্ঘ। সেটা এই উপমহাদেশে তো বটে, বিশ্বেও বিরলতম ঘটনা। ইতিহাসের এই তথ্য স্বীকার করতে হবে। বাংলা ভাষা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশে যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হয়েছিল ১৯৫২ সালে, সেটা ছিল ভাষার জন্য বাংলা ভাষাভাষীদের আন্দোলনের যে দীর্ঘ ইতিহাস, তারই ধারাবাহিকতা। এটিও জানিয়ে রাখা ভালো, এই বাংলা ভাষাকে নিয়েই ভারত উপমহাদেশের তিন জায়গায় প্রায় অর্ধ শতক ধরে হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। আর তাতে জয় হয়েছে বাংলা ভাষার।

ভারতীয় উপমহাদেশে বাংলা ভাষা ছাড়াও তামিলনাড়ুতে হয়েছে অ্যান্টি-হিন্দি আন্দোলন, আসামে হয়েছে বাংলা ভাষার আন্দোলন, পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে হয়েছে সিন্ধি ভাষা আন্দোলন। এর বাইরে শ্রীলঙ্কায় হয়েছে তামিল ভাষা আন্দোলন।

বাংলা ভাষার আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯১২ সালে, পূর্ব ভারতের মানভূমে। অন্তত তার আগের কোনো ইতিহাস পাওয়া যায়নি এখন পর্যন্ত। বিভিন্ন ধাপে ও রূপে প্রায় ৪৪ বছর আন্দোলন চলার পর ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর তার সফল সমাপ্তি ঘটে। পুরুলিয়া তথা মানভূমের বাংলা ভাষার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা’র ইতিহাস।

১৭৬৫ সালে বক্সারের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি দিয়ে দেন দ্বিতীয় শাহ আলম। ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চলে ছিল পরিচিত জঙ্গলমহল। কোম্পানি কর সংগ্রহের সুবিধার জন্য জঙ্গলমহলকে ভেঙে ১৮৩৩ সালে মানভূম জেলা তৈরি করে। ভারতের বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বাঁকুড়া ও বর্ধমান জেলা এবং ঝাড়খন্ড রাজ্যের ধানবাদ, ধলভূম ও সেরাইকেলা খার্সোয়ান জেলার অংশ নিয়ে তৈরি হয়েছিল এটি।

পরে বিভিন্ন সময় মানভূম আরও কয়েক ভাগে ভাগ হয়। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে বাংলা ভাষাভাষী পুরো মানভূম ও ধলভূম জেলাকে নতুন তৈরি বিহার-উড়িষ্যা রাজ্যে যুক্ত করা হয়। এই বিভক্তির ফলে মূলত শুরু হয় মানভূমের বাংলা ভাষার আন্দোলন।

অবশেষে প্রায় ৪৪ বছর পর আন্দোলনের সমাপ্তি হয় সাইয়িদ ফজল আলী, হৃদয়নাথ কুঞ্জরু ও কবলম পানিক্কর কমিশনের প্রতিবেদন তৈরির ভিত্তিতে। এতে মানভূমের বাঙালি ও বাংলাভাষী এলাকা এবং পশ্চিমবঙ্গের ১৯টি থানা থানা নিয়ে পুরুলিয়া নামে একটি নতুন জেলা গঠিত হয়। তার ভাষা হয় বাংলা। বাংলাভাষী এই জেলার যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর।

বাংলা ভাষা নিয়ে সর্বশেষ আন্দোলনটি হয় আসামের বরাক উপত্যকায়। ১৯৬০ সালের এপ্রিল মাসে শুরু হয়ে সেই আন্দোলন শেষ হয় ১৯৬১ সালের ১৯ মে। আন্দোলনে শহীদ হন ১১ জন। কিন্তু সে সময় বরাকের বাংলা ভাষা আন্দোলন শেষ হয়নি। ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট সেবা সার্কুলার প্রত্যাহারের দাবিতে একটি আন্দোলন হয় সেখানে। তাতে নিহত হন একজন। আর ১৯৮৬ সালের ২১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে বাংলা ভাষার দাবির আন্দোলনে শহীদ হন করিমগঞ্জের আরও দুজন। এসব ঘটনাও বরাক উপত্যকার বাংলা ভাষার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।

পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল মানভূম ও বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের মধ্যবর্তী সময়ে, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে। সেই আন্দোলনের চূড়ান্ত ফল এসেছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। এর কারণ ছিল সেই একই—ক্ষমতাবানের ইচ্ছা ও স্বার্থ। বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন নিয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনা করার এখন প্রয়োজন নেই। সেই ইতিহাস আমরা জানি। তবে এখানে সেই আন্দোলনের প্রভাব নিয়ে কিছু কথা বলে রাখা যায়।

আমাদের ভাষা আন্দোলন ছিল প্রথমত, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষার স্বীকৃতির দাবি। দ্বিতীয়ত, এটি ছিল সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। তৃতীয়ত, এটি ছিল ভাষার অর্থনীতির প্রশ্ন। এর একটি চতুর্থ স্তম্ভও আছে। তার আগে বলে নিই, এই তিনটি কারণে মূলত মানভূমের মানুষও বাংলা ভাষার আন্দোলন করেছিলেন এবং সেই একই কারণে বরাক উপত্যকাতেও বাংলা ভাষার আন্দোলন হয়েছিল। বাংলা ভাষাকে নিয়ে যে তিনটি আন্দোলন হয়েছে ভারত উপমহাদেশের তিন জায়গায়, তার তিনটিতেই বাংলা ভাষা জয়ী হয়েছিল।

তাহলে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষা আন্দোলনের বিশেষত্ব কোথায়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে চতুর্থ স্তম্ভে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বর্তমান বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করেছিল। মানভূম বিহার থেকে ভেঙে কিন্তু বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল হিসেবে যুক্ত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে। আর বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা পেয়েছিল অন্যতম সরকারি ভাষার তকমা ও সুবিধা। কিন্তু সে সময়কার পূর্ব পাকিস্তানে কী ঘটেছিল?

মাত্র উনিশ বছরের মাথায় পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ নামের একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। আর তার প্রধান ভাষা হয় বাংলা।

এই লেখায় একটি টীকা দিয়ে রাখা জরুরি। লেখাটি পড়লে আপনার মনে হবে, ইতিহাস তো এভাবে আমরা পড়ি না। সত্যি, আমরা ইতিহাস এভাবে পড়ি না। জানিয়ে রাখা ভালো, বাংলা ভাষা শুধু বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভাষা নয়, এটি এক বিশাল ভূখণ্ডে ২৮ থেকে ৩০ কোটি মানুষের প্রতিদিনের ভাষা। তার ব্যাপ্তি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের বরাক উপত্যকা পর্যন্ত।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত