Ajker Patrika

রহস্যময় ইউস্কারা ভাষার টিকে থাকার লড়াই

মইনুল হাসান, ফ্রান্স  
আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০: ০৭
রহস্যময় ইউস্কারা ভাষার টিকে থাকার লড়াই
বিলবাও, স্পেনের উত্তরে বাস্ক নগরী। বাস্কদের সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। ছবি: লেখক

ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমে একদম স্পেনের সীমান্ত ঘেঁষে পিরিনিজ পর্বতমালা। এই পর্বতমালার দুই পাশে স্পেন ও ফ্রান্স। এই দুই দেশ মিলিয়ে ছবির মতো ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার বা ৮ হাজার বর্গমাইল ক্ষেত্রফলের এক বিশাল অঞ্চলে পাহাড়ি উপত্যকায় প্রাচীনকাল থেকে বাস করে আসছে বাস্ক জাতির মানুষ। একদিকে আকাশছোঁয়া পিরিনিজ পর্বতমালা। অন্যদিকে অতল আটলান্টিক মহাসাগরের বিশাল জলরাশি মিলে অপার্থিব নৈসর্গিক সৌন্দর্যের সবটুকু যেন এখানেই ঘনীভূত হয়েছে। অদম্য প্রাণশক্তিতে ভরপুর এই অঞ্চলের মানুষদের রয়েছে নিজস্ব ঐশ্বর্যময় সংস্কৃতি, ভাষা আর ঐতিহ্য। ইউরোপের অন্য সব জাতিগোষ্ঠী থেকে একেবারে আলাদা, এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রয়েছে স্বাতন্ত্র্য, আত্মপরিচয়ে টিকিয়ে রাখার দীর্ঘ সংগ্রামের রক্তভেজা ইতিহাস। বহুবার আঘাত এসেছে তাঁদের ভাষার ওপর, বহুভাবে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে তাঁদের মায়ের মুখের বুলি ‘ইউস্কারা’। অথচ কোনো আগ্রাসন, অত্যাচার, ফন্দি তাঁদের দমাতে পারেনি। বহু নিপীড়ন-নির্যাতনে মাথা নত করেনি এই জাতি। ইতিহাসে ভর করে যতটুকু পেছনে ফিরে যাওয়া যায়, তা থেকে জানা যায়, এই বাস্ক সম্প্রদায় সেই ৭ হাজার বছর আগে থেকে ইউরোপে নিজেদের আবাস গড়েছিল। নিজস্ব ভাষা, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক মাত্র ৩০ লাখ জনসংখ্যার মানুষ নিজেদের বাস্ক হিসেবে পরিচয় দেন বুক ফুলিয়ে।

১৯৩৬ সালে জেনারেল ফ্রাঙ্কো গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে স্পেনের ক্ষমতা দখল করেন। বাস্ক সংস্কৃতি এবং ভাষার ওপর সব থেকে বড় আঘাত আসে তাঁর শাসনামলে। সে সময়ে জাতীয় সংহতির অজুহাত তুলে বাস্কদের ভাষা ইউস্কারা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এই ভাষায় প্রচারিত সংবাদপত্র, রেডিও অনুষ্ঠান এবং প্রচার-প্রচারণা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। হাট-বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতে ইউস্কারায় কথা বলা বা সে ভাষা চর্চা করা ছিল অমার্জনীয় অপরাধ। এ কারণে অসংখ্য মানুষকে ফ্রাঙ্কোর গুপ্ত পুলিশ এবং দোসরদের হাতে চরমভাবে নিগৃহীত ও নির্যাতিত হতে হয়েছিল। সে সময়কার ফরাসি সরকার এবং প্রশাসনও বাস্কদের ভাষা, সংস্কৃতির, স্বাতন্ত্র্যের দাবি অগ্রাহ্য করতে খড়্গহস্ত হয়। দুই আধুনিক রাষ্ট্র স্পেন ও ফ্রান্সের দমননিপীড়নের বহু করুণ কাহিনির সাক্ষী এই জনপদ।

নিজেদের ভাষা টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে যাঁরা পথ দেখিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে পুরোধা ছিলেন পুরোহিত, সাংবাদিক এবং বাস্ক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনের পুরোধাব্যক্তি হোসে আস্তিমুনিও লাসো (১৮৯৬-১৯৩৬)। আজ থেকে ৯০ বছর আগে ১৯৩৬ সালে গ্রেপ্তার করার পর তাঁর ওপর চালানো হয় অকথ্য নির্যাতন। বশ্যতা মানাতে ব্যর্থ হয়ে ফ্রাঙ্কোর সেনারা তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। হোসে আস্তিমুনিও বাস্কদের আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন। ‘ইউস্কারা’ ছিল তাঁর মায়ের মুখের বুলি। এই ভাষায় প্রথম তিনি মাকে ডেকেছিলেন, ‘আমা’ অর্থাৎ ‘মা’। মা, মাটি ও মায়ের ভাষাকে আলাদা করে ভাবতে পারতেন না।

জনপ্রিয় বাস্ক কবি ও সাংবাদিক এস্তেবান উরকিয়াবাকে (১৯০৫-৩৭)। ‘লাউয়াশেতা’ ছদ্মনামে তিনি ছিলেন ব্যাপক জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। মাত্র ৩২ বছর বয়সের এই তরুণকে ফ্রাঙ্কোর আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯৩৭ সালের ২৫ জুন বাস্ক অঞ্চলের আলভা প্রদেশের রাজধানী ভিটোরিয়াতে ফ্রাঙ্কোর বাহিনী তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। এস্তেবান তাঁর বিখ্যাত ‘দাবি’ কবিতার মাধ্যমে দাবি তুলেছিলেন, ‘আমার ভবিষ্যৎ আমাকে ফিরিয়ে দাও। আমি স্বাধীনতাকে ভালোবাসি।’ ভাষা এবং স্বাধীনতাকে ভালোবাসাই ছিল তাঁর একমাত্র অপরাধ।

বাস্ক অঞ্চলের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে বহু নামের সঙ্গে উজ্জ্বল হয়ে আছে আরও দুটি বিশেষ নাম, কলডো মিথেলেনা (১৯১৫-৮৭) এবং রিকার্ডো আড়াইয়ে (১৯৪২-৬৯)। তবে বাস্কদের ভাষা আন্দোলন কখনোই ব্যক্তিনির্ভর ছিল না। তাঁদের এই সংগ্রাম ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক, সব সময় সমষ্টিগত। বাস্ক অঞ্চলের খুব সুন্দর নগরী বিলবাও। সেখানে সেই ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাস্কদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাস্ক একাডেমি।

স্বাধীনতাকে ভালোবাসা, ভাষা রক্ষার আন্দোলন ছিল জেনারেল ফ্রাঙ্কো এবং তাঁদের দোসরদের চোখে অমার্জনীয় অপরাধ। অথচ ভাষা হচ্ছে মানুষের আত্মপরিচয়পত্রের প্রথম পাতা। সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রধান অবলম্বন। ফ্রাঙ্কো তাই চেয়েছিলেন বন্দুকের মুখে বাস্কদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে, ভুলিয়ে দিতে। তিনি কি তা পেরেছিলেন? উত্তর হচ্ছে, না। সমস্ত শক্তি দিয়েও ভাষার দাবি ভুলিয়ে দিতে পারেননি। বাস্ক জাতি এবং তাঁদের ভাষা ইউস্কারা আজও সদর্পে টিকে আছে। বহু অকুতোভয় মানুষের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া হলেও, তাঁরা যে আলোর শিখা জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন, তা আজও অনির্বাণ, আজও উজ্জ্বল। নিজেদের আলাদা জাতিসত্তা, স্বাতন্ত্র্য এবং ভাষার ‘অস্তিত্ব’ টিকিয়ে রাখতে বাস্কদের নিজেদের মধ্যে সংগঠিত হতে হয়েছে, কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়েছে। এমনকি অস্ত্রও হাতে তুলে নিতে হয়েছে। ইতিহাসের সুদীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে সে এক গৌরবময় ইতিহাস, জয়ের ইতিহাস।

চমৎকার সামাজিক সম্প্রীতি আর বন্ধনে সুসংগঠিত বাস্করা সে সময়ে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে মাটির নিচে বেশ কিছু গোপন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতি গোপনে নিজেদের মাতৃভাষা ইউস্কারা চর্চা অব্যাহত রাখে। এ ব্যাপারে বাস্ক নারীরা বেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা তাঁদের সন্তানদের ইউস্কারা চর্চায় সর্বতোভাবে সাহায্য করেন। ভাষার জন্য বুদ্ধিজীবীসহ সাধারণ বাস্কদের ভূমিকা ছিল অনন্য।

ফলে ১৯৭৫ সালে ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুর পর, প্রায় চার দশকের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটলে, আবার ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসতে থাকে ইউস্কারা। অবশেষে ১৯৭৯ সালে স্পেনে বাস্ক অঞ্চলের তিনটি প্রদেশ স্বায়ত্তশাসন অর্জন করে এবং সেই সঙ্গে ইউস্কারা সরকারি ভাষার মর্যাদা লাভ করে। ফরাসিরাও বাস্কদের প্রতি নমনীয় হয়। ধীরে ধীরে তাঁদের ভাষার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়।

বাস্কদের ভাষা ইউস্কারা ইউরোপের প্রাচীনতম ভাষা। শুধু প্রাচীনই নয়, এই ভাষা পৃথিবীর একটি রহস্যময় ভাষা। সব ভাষা থেকে একদম আলাদা। তবে এখানেই শেষ নয়, সারা পৃথিবীর তাবৎ ভাষাবিজ্ঞানীর কাছে এ এক মহাবিস্ময়। কারণ, এই ভাষার আদি উৎপত্তি খুঁজতে গিয়ে, তাঁরা নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছেন না। ইউরোপের ভাষা বলে প্রথমেই এর উৎস খুঁজতে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী ঘেঁটে সেখানে কোনো ভাষার সঙ্গে দূরতম সম্পর্কের মিল বের করতে পারলেন না। তারপরও মোটেই হাল ছাড়লেন না গবেষকেরা। এক এক করে অস্ট্রো-এশীয়, আফ্রো-এশীয়, চীনা-তিব্বতি, মালয়-পলিনেশীয়, নাইজার-কঙ্গো, দ্রাবিড়ীয় ইত্যাদি ভাষাগোষ্ঠীর দ্বারস্থ হলেন অথচ কোনো কূল করতে পারলেন না। এতে তাঁরা যতটা না হতাশ হলেন, তার চেয়ে বেশি হলেন বিস্মিত। এ যেন এক মহা গোলকধাঁধা।

প্রত্নতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক, ভাষাবিজ্ঞানীদের উদ্ধার করতে এগিয়ে এলেন জিন তত্ত্ববিদেরা। মানুষের বংশগতির ধারক ডিএনএ ঘেঁটে বহু প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর দিতে তাঁদের জুড়ি নেই। সেখানেও দেখা গেল এক চরম বিস্ময়। কোনোভাবেই এই জাতির আদি উৎপত্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নিজেরাই নিজেদের প্রশ্ন করলেন, কীভাবে একটি জনগোষ্ঠীর ডিএনএ এমন অপরিবর্তিত থাকতে পারে? অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কখনোই কি মিশ্রণ ঘটেনি এই বাস্কদের? সেই সুদূর অতীত থেকে এমন অস্বাভাবিক এবং ব্যতিক্রমী স্বাতন্ত্র্য কীভাবে বজায় রেখেছে এই জাতি? আজও এসব প্রশ্নের সদুত্তর মেলেনি। এ এক মহারহস্য। তবে সব থেকে গৌরবের গাঁথা হলো, তাঁদের রহস্যময় ভাষার টিকে থাকার লড়াই।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত