Ajker Patrika

ভাষা আর ভাষার কবিতা

জাহীদ রেজা নূর
আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০: ০৬
ভাষা আর ভাষার কবিতা

সে এক সময় এসেছিল আমাদের দেশে, যখন পাকিস্তানি জোশে আক্রান্ত হয়ে একদল কবি-সাহিত্যিক বাংলা ভাষাটাকে হাস্যকর করে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, ভাষার মধ্যে জোর করে আরবি-ফারসি-উর্দু ঢুকিয়ে দিলেই ভাষাটি হয়ে যাবে মুসলমানের ভাষা। এর যে কোনো জাতপাত নেই, ধর্ম-অধর্ম নেই, সে কথাটা তাঁরা বিশ্বাস করতেন না।

সবাই জানেন, ভাষা হলো নদীর স্রোতের মতো। শুধু কুলকুল করে এগিয়ে যায়। কারও জন্য থেমে থাকে না। যে শব্দগুলো আচরিত হতে থাকে ঘরে-বাইরে-আলাপচারিতায়, সে শব্দগুলোই অনায়াসে ঢুকে যায় ভাষার মধ্যে। জোর করে ঢোকাতে চাইলে কি তা মানুষের মুখের ভাষা হয়ে ওঠে? ওঠে না।

বাংলার প্রতি উদাসীন সে রকমই কিছু অদ্ভুত উদাহরণ দেওয়া যাক। আজকের তরুণকে যদি বলা হয়, আচ্ছা, এই যে কয়েকটি বাক্য লিখছি, তা কি বাংলা বলে মনে হয়? তাহলে তাঁরা কী উত্তর দেবেন, সে কথা জানার আগ্রহ রয়েছে আমার।

সে সময় সাহিত্য নিয়ে যাঁরা কারবার করতেন, তাঁদের অনেকে যে ভাষায় কথা বলতেন, তার ইঙ্গিত দিচ্ছি। হুমায়ুন আজাদের গবেষণালব্ধ একটি বই থেকে তা নেওয়া হচ্ছে। ‘হাজেরানে বন্ধুগণ’, ‘হাজেরানে মজলিশ’, ‘আমাকে সরফরাজ করেছেন’, ‘নিয়ত মকছেদ সম্পর্কে শুরুতেই আরজ’, ‘দুহরাতে চাই না’। এগুলো বলে তাঁরা বলতেন, ‘আমরা পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের চিন্তারাজ্যে বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন আনতে চাই।’

বিপ্লবের এই নমুনা দেখে বাংলা ভাষার তখন নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। কবিতার রাজ্যে যখন এই পাকিস্তানি জোশ এসে পড়ল, তখন অনেকে তাতে উদ্বেলিত হয়ে উঠলেন। বাংলা ভাষার মধ্যে ইচ্ছেমতো আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দ বসিয়ে কবিতার শরীর গড়ে তুললেন। তাঁরা উপমা-রূপক-চিত্রকল্পের জন্য বাংলাকে আলিঙ্গন করলেন না। এই প্রবণতা নিয়ে কবি ফররুখ আহমদ লিখেছিলেন এক ব্যঙ্গ কবিতা।

‘দুইশো পঁচিশ মুদ্রা যে অবধি হয়েছে বেতন

বাংলাকে তালাক দিয়া উর্দূকেই করিয়াছি নিকা।’

সেই কবিই কিছুদিন পর যে কবিতাগুলো লিখেছেন, তার ভাষা দেখুন,

‘সায়ফুল্লার কুওৎ আবার নামছে কলবে দুর্নীবার

খালেদী বাজুর তলোয়ার নাচে মুমিনের হাতে খর-দু-ধার।’

কবিতার নাম ‘জশনে আজাদী’।

তাঁর কবিতাগুলোর নামও তত দিনে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। ‘নিশান’ নামের কবিতায় তিনি লিখলেন,

‘জুলফিকারের, খালেদী বাজুর তুমি সওয়ার

উমরের পথে বিশ্বের দ্বারে হে অম্লান

পার হয়ে গেছ বিয়াবান আর খাড়া পাহাড়

সবল হাতের কবজায় যবে ছিলে সওয়ার।’

মুফাখখারুল ইসলাম চল্লিশের দশক থেকেই এ ধারায় কবিতা লিখেছেন। তাঁর লেখায় বাংলা ভাষা দাঁড়িয়েছে এমন,

‘খিজরের ছোঁওয়া-জিন্দিগী ফের চাহিছে করুণ চোখে

তিন সওয়ালের জওয়াব মিলিবে সেই সে বাতিন লোকে।’

কবিতার নাম ‘বে-নেকাব’।

‘পাগলা ঘণ্টা’ নামের কবিতায় তিনি লিখেছেন,

‘ইসমাইলের বদলী-দুম্বা-চামের তাম হতে...

য়ুসুফের জামা আনিছে আমাকে য়াকুব-মনের ব্যথা।’

সৈয়দ আলী আহসানের কবিতার নাম ‘বেদনাবিহীন স্বপ্নের দিন’ বটে, কিন্তু তার মধ্যেও পাওয়া যাবে মরুভূমির আস্বাদ,

‘জরির জোব্বা, শেরোয়ানী আর আমামার সজ্জায়

আতরের পানি, মেশকের রেণু খোসবু বিলায়ে যায়।’

উদাহরণ দিয়ে লেখাটা আর ভারী করা ঠিক হবে না। তবে সেই সময় আরও দুটি ধারা পাশাপাশি বেড়ে উঠছিল। ভাষা আন্দোলনের অনিবার্য পরিণতিতে বাংলা কবিতা হয়ে উঠছিল সুঠাম, মেদহীন। একদল কবি তখন বাংলা ভাষার কবিতাকে ঋদ্ধ করে চলেছেন তাঁদের স্বকীয়তা দিয়ে। ১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত এবং মোহাম্মদ সুলতান কর্তৃক প্রকাশিত একুশের প্রথম সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’র কবিতাগুলোর দিকে তাকালেই তার প্রমাণ আমরা পেয়ে যাব।

সেখানে আলাউদ্দিন আল আজাদ লিখছেন,

‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার, ভয় কি বন্ধু?

আমরা এখনো চার কোটি

পরিবার খাড়া রয়েছি তো। যে-ভিৎ কখনো কোনো রাজন্য

পারেনি ভাঙতে

হীরার মুকুট নীল পরোয়ানা খোলা তলোয়ার

খুরের ঝটিকা ধূলায় চূর্ণ যে-পদপ্রান্তে।’

কিংবা ফজলে লোহানী লিখেছেন,

‘শীতল পৃথিবী, অবশ নগর

অসার আকাশ, বাতাস নিথর,

ফুটপাতে শুধু ছড়িয়ে আছে জীবনের নব রেণু কণা যত।’

কবিতার পরতে পরতে থাকা রহস্যের খোঁজে এরপর শামিল হলো পাঠক। পাঠকের রুচি প্রসারিত হলো বাংলার রূপ-রস-প্রকৃতির দিকে। তাতে থাকল ভাষা আন্দোলনের ঘ্রাণ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত