Ajker Patrika

পারিবারিক সহিংসতা: মেনে নিতে নিতে মরছে নারী

  • গত ৫ বছরে পারিবারিক সহিংসতায় নিহত ১,৫৬৫ জন নারী।
  • ৫ বছরে স্বামীর হাতে খুন ১,০৩৪ নারী। গত চার মাসে ৫৬ জন।
  • ৫ বছরে নিজ পরিবারের হাতে খুন ২৫৮, চলতি বছরে ২১ নারী।
  • মানবাধিকারকর্মীদের মতে, বাস্তবে পারিবারিক সহিংসতা আরও বেশি।
অর্চি হক, ঢাকা 
পারিবারিক সহিংসতা: মেনে নিতে নিতে মরছে নারী
প্রতীকী ছবি

শারমিন আক্তার। স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে, অমানবিক নির্যাতন—সব মেনে নিয়ে সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে স্বামী ফোরকান মোল্লার সঙ্গেই থাকতে চেয়েছিলেন। বাঁচাতে চেয়েছিলেন সংসার। কিন্তু সেই চাওয়ার মূল্য তাঁকে চুকাতে হয়েছে জীবন দিয়ে। গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে ৮ মে দিবাগত গভীর রাতে গৃহবধূ শারমিন খুন হয়েছেন তিন সন্তান, এক ভাইসহ।

শারমিনের মতো অনেক নারীই সংসার বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন স্বামীর হাতে। নারীরা সংসারের মতো নিজ পরিবারকেও নিরাপদ আশ্রয় ভাবেন। অথচ তা-ও আর নিরাপদ নেই। পরিবারের সদস্যদের হাতেও খুন হচ্ছেন নারীরা। একটি মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে স্বামী, স্বামীর পরিবার ও নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে হত্যার শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৫৬৫ জন নারী। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এই সংখ্যা কেবল নথিভুক্ত ঘটনার হিসাব। বাস্তবে পারিবারিক সহিংসতা ও হত্যার সংখ্যা আরও বেশি।

সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, পারিবারিক সহিংসতার কারণে যে নারীরা হত্যার শিকার হচ্ছেন, এগুলো হঠাৎ ঘটা কোনো হত্যাকাণ্ড নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারীকে দীর্ঘদিন ধরে সাংসারিক তিক্ততা এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। নিজের আশ্রয়ের নিশ্চয়তা না থাকায় বাধ্য হয়ে বেশির ভাগ নারী এই নির্যাতন সহ্য করেন। একপর্যায়ে তাঁর জীবন যায়।

কাপাসিয়ায় নিহত শারমিনও ছয়-সাত মাস আগে স্বামীর মারধরের শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর স্বজনেরা। তারপরও স্বজনদের জানিয়েছিলেন, স্বামীর সঙ্গেই থাকতে চান। এই পাঁচ খুনের মামলার প্রধান আসামি ফোরকান মোল্লার মরদেহ ১৬ মে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার পদ্মা নদী থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে পলাতক ফোরকান পদ্মা সেতু থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন।

বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, ২০২১-২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন ১ হাজার ৩৪ জন নারী। এ সময়ে স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে প্রাণ গেছে ২৭৩ জন নারীর। আর নারীদের কাছে সবচেয়ে নিরাপদ যে পরিবার, সেই নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে এই পাঁচ বছরে প্রাণ হারিয়েছেন ২৫৮ জন নারী। সব মিলিয়ে গত পাঁচ বছরে পারিবারিক সহিংসতায় হত্যার শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৫৬৫ নারী। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন ৫৬ নারী। এ সময়ে নিজের পরিবারের সদস্যদের হাতে খুন হন ২১ নারী এবং স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে খুন হন আরও আটজন। অর্থাৎ চলতি বছরের প্রথম চার মাসে পারিবারিক সহিংসতার বলি হয়েছেন ৭৯ নারী।

নারী অধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, স্বামীর হাতে স্ত্রী খুনের ঘটনাগুলোর বেশির ভাগের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে যৌতুক, পারিবারিক কলহ, পরকীয়ার সন্দেহ, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মানসিকতা এবং নারীর স্বাধীন চলাফেরায় বাধা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবারকে নিরাপদ জায়গা হিসেবে ভাবা হলেও বাস্তবে নারীদের জন্য সবচেয়ে বেশি সহিংসতা ঘটে ঘরের ভেতরেই। শিশু থেকে বৃদ্ধা—কেউই পারিবারিক সহিংসতার বাইরে নন। অনেক নারী বছরের পর বছর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন সহ্য করেও কোনো আইনি সহায়তা নেন না। কারণ, অভিযোগ করলে উল্টো সামাজিক চাপ, পরিবার হারানোর ভয় কিংবা সন্তানদের নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়তে হয়।

সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, হত্যার শিকার হওয়ার আগে নারীরা দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের সহ্য করেন। একপর্যায়ে তাঁর জীবন বিপন্ন হয়। তাঁদের মতে, নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যেসব নারী পুরোপুরি পরিবার বা স্বামীর ওপর নির্ভরশীল, তাঁরা নির্যাতনের বিরুদ্ধে সহজে দাঁড়াতে পারেন না।

‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ, ২০২৪’ অনুযায়ী, প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজন নারী তাঁদের জীবনে অন্তত একবার জীবনসঙ্গী বা স্বামীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন; যার মধ্যে রয়েছে শারীরিক, যৌন, মানসিক এবং অর্থনৈতিক সহিংসতা, পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ। তিনজনের মধ্যে দুজন ভুক্তভোগী সহিংসতার কথা কখনোই প্রকাশ করেননি।

আসক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, নারীপক্ষ, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টসহ (ব্লাস্ট) বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি এবং নারীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে। সংগঠনগুলোর মতে, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু আইন থাকলেই হবে না, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি।

নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, সংসার টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু নারীর নয়। সহিংসতা সহ্য করাকে পারিবারিক মূল্যবোধ হিসেবে দেখার প্রবণতা বন্ধ না হলে এই মৃত্যুর মিছিল থামবে না।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, পারিবারিক সহিংসতার অনেক ঘটনা শুরুতেই গুরুত্ব পায় না। স্বামীর মারধর, মানসিক নির্যাতন বা শ্বশুরবাড়ির চাপকে অনেক পরিবারই ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নেয়। নারীও সামাজিক লজ্জা, সন্তানের ভবিষ্যৎ কিংবা আর্থিক নির্ভরতার কারণে অনেক সময় নির্যাতনের কথা প্রকাশ করেন না। ফলে সহিংসতা ধীরে ধীরে চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। নারীর প্রতি নিয়ন্ত্রণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি, পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে যাওয়া এবং বিচারহীনতা এসব হত্যাকাণ্ডের অন্যতম বড় কারণ বলে মনে করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাম্পত্য সম্পর্কে অসততা ও অবিশ্বাস, মাদকাসক্তি এখন বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। এই সংকট অনেক সময় সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনেক মানুষ মানসিক চাপ ও রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব, ঋণের চাপ, পারিবারিক অশান্তি কিংবা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা থেকে তৈরি হওয়া হতাশা অনেক সময় পরিবারের দুর্বল সদস্যদের ওপর গিয়ে পড়ে। সমাজে নারীকেই তুলনামূলক দুর্বল ও সহজ লক্ষ্য হিসেবে দেখা হয়। তাঁদের মতে, বাংলাদেশের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা এখনো খুব কম। কেউ বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আচরণগত সমস্যা বা ব্যক্তিত্বগত সংকটে ভুগলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসা নেন না। বরং বিষয়গুলোকে ‘সংসারের ঝামেলা’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে দীর্ঘদিন জমে থাকা ক্ষোভ বা হতাশা একসময় ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেয়।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ আজকের পত্রিকাকে বলেন, পরিবারে পারস্পরিক যোগাযোগ কমে যাওয়া এসব হত্যাকাণ্ডের একটি কারণ। আগে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে সময় কাটাতেন, সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতেন। এখন ব্যস্ততা ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে সেই যোগাযোগ কমেছে। ফলে ছোট বিরোধও দ্রুত বড় সংঘাতে পরিণত হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

রাতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার তরুণী, গ্রেপ্তার ৩

সফল ব্যক্তিদের জীবনের দশটি অভ্যাস

পাকিস্তানের বিপক্ষে মুশফিক আজ যা করলেন, তা বাংলাদেশের আর কেউ পারেননি

রাজধানীতে পরকীয়ার জেরে লাশ খণ্ডবিখণ্ড, মা-মেয়ে গ্রেপ্তার: র‍্যাব

অফিসকে বাসা বানিয়ে থাকছেন স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত