Ajker Patrika

প্রতিদিনের লড়াই ও পরিবারে নারীর অবস্থান

কাশফিয়া আলম ঝিলিক, ঢাকা 
আপডেট : ১৩ মে ২০২৬, ১৪: ২৩
প্রতিদিনের লড়াই ও পরিবারে নারীর অবস্থান

ঘড়িতে তখন ভোর ৫টা। চারপাশ যখন নিস্তব্ধ, তখন একজন গৃহবধূর দিন শুরু হয়। পরিবারের সবাই যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তিনি তখন রান্নাঘরে চুলার ছাই পরিষ্কার করছেন। পানি তোলা, নাশতা বানানো, সন্তানকে স্কুলের জন্য তৈরি করা থেকে শুরু করে গবাদিপশুর তদারকি—সবই তাঁর ভোরের রুটিন। বাংলাদেশের কোটি কোটি নারীর প্রতিদিনের গল্পের শুরুটা ঠিক এভাবেই।

শহর অঞ্চলে আবার দেখা যায়, সকালে উঠে সব কাজ শেষ করে অফিসের ব্যাগ আর টিফিন বক্স হাতে বাসা থেকে বের হন অসংখ্য নারী। এরপর কেউ বাসে, কেউ অফিসের গাড়িতে, কেউ রিকশায়, কেউ সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়ে ছোটেন অফিসের উদ্দেশে। সেই কাজ শেষে আবার ফেরেন বাসায়, পরিবারের কাছে। সেখানে দিনের শেষের দায়িত্বগুলো পালন করতে থাকেন একটার পর একটা।

গৃহিণী কিংবা কর্মজীবী—সব নারীই দিন শেষে পরিবারের প্রতি তাঁদের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু পরিবার তাঁদের ওপর দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে কতটা সচেতন? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর আসলে কারও কাছে নেই।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: শ্রম বনাম সম্মান

একটি পরিবারে নারীর কাজ শুধু রান্না কিংবা ঘর গোছানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকেরা একে বলেন ‘অদৃশ্য শ্রম’। একজন গৃহিণী সারা দিন বাসার কাজ করে ক্লান্ত হয়ে যান এবং শুয়ে পড়েন। মাস গেলে তাঁর অ্যাকাউন্টে এক পয়সাও থাকে না।

হঠাৎ কোনো বিপদে তাঁরা দিশেহারা অবস্থায় পড়েন। তখন তাঁর আশপাশের মানুষই বলতে থাকেন, ‘আরে, বোকা মেয়ে, আগে থেকে কিছু জিনিস গুছিয়ে রাখতে পারলে না?’ কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, কোনো নারী যখন গোছানোর কথা বলেছেন, তখন তাঁকেই কটাক্ষ করা হয়েছে। আবার কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রে হয়তো মাস গেলে টাকাটা ব্যাংকে ঢুকছে। তবে বাসার কোনো কিছু ফুরিয়ে গেলে সেটা আনার কথা কেন মনে নেই, সে কথাও শুনতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের পরিবারগুলোতে নারীর ভূমিকা বহুমুখী। কৃষিপ্রধান গ্রামগুলোতে নারীরা শুধু ঘরের কাজই করেন না, বরং বীজ সংরক্ষণ করা থেকে শুরু করে ফসল তোলা-পরবর্তী প্রক্রিয়ায় তাঁদের বিশাল অবদান রয়েছে। ২০২৪ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর লেবার ফোর্স সার্ভে অনুযায়ী, গ্রামীণ নারীদের কৃষিকাজে অংশগ্রহণের হার প্রায় ৫৬ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) লেবার ফোর্স সার্ভে (২০২৩) অনুযায়ী, ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী নারীদের মোট কর্মসংস্থানের ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ এখন কৃষি খাতে নিয়োজিত। এর বিপরীতে কৃষি খাতে পুরুষের অংশগ্রহণের হার ১৮ দশমিক ৮২ শতাংশ (বাংলাদেশ স্ট্যাটিসটিক্যাল ইয়ারবুক, ২০২৪)। অর্থাৎ মাঠপর্যায়ের কৃষিতে এখন পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যাধিক্য স্পষ্ট। কিন্তু এই বিপুলসংখ্যক নারী তাঁদের পরিবারের কাছে কতটা সম্মান পাচ্ছেন? ২০২৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশ নারী জীবনে একবার হলেও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গ্রামে এই হার ৭৬ শতাংশ এবং শহরে ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হওয়ার সঙ্গে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টি এখনো সমাধানের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

কাজের ধরন ও সম্মান

বাংলাদেশের পরিবারে নারীকে ‘লক্ষ্মী’ বা ‘সংসারের লক্ষ্মী’ বলা হলেও কাজের স্বীকৃতি এবং সম্মানের জায়গাটি এখন পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। গ্রামীণ ও শহরতলি অঞ্চলে আজও নারীদের ঘরোয়া কাজকে ‘কাজই নয়’ বলার প্রবণতা দেখা যায়। তবে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে সম্মান ও সহযোগিতার হার কিছুটা বাড়ছে। কিন্তু সমানভাবে কাজ করলেও কৃষি কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় অর্ধেক মজুরি পান, যা তাঁদের পারিবারিক অবস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ৮০ শতাংশের বেশি নারী অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেখানে শ্রম আইন, পেনশন অথবা স্বাস্থ্য বিমার কোনো সুরক্ষা নেই। পরিবারে নারীর গুরুত্ব শুধু সেবার খাতিরে নয়, বরং তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতার ওপরে হওয়া উচিত। বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের জরিপে ঘরোয়া কাজ অন্তর্ভুক্ত করার পর দেখা গেছে, নারীদের মোট কাজের সময় পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। নারীদের এই ‘অতিরিক্ত শ্রম’ একটি বৈশ্বিক এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতা।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা

পরিবারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের প্রাধান্য নিয়ে সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে কিছু তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৫-এ প্রকাশিত সিএফপি বোর্ডের রিপোর্ট অনুযায়ী, বৈশ্বিকভাবে প্রায় ৬৯ শতাংশ নারী এখন পরিবারের আর্থিক বিনিয়োগের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। বিবাহিত নারীদের ৬০ শতাংশ এখন সরাসরি বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের সিদ্ধান্ত নেন।

এ বছরের ইউনিসেফ ও ইউএন উইমেনের এক যৌথ গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের নারীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠছেন। বিশেষ করে যাঁরা ক্ষুদ্র ঋণের সঙ্গে যুক্ত কিংবা ছোট ব্যবসা করছেন, তাঁরা সন্তানদের শিক্ষা এবং দৈনন্দিন খরচের ক্ষেত্রে প্রায় ৮০ শতাংশ সিদ্ধান্ত এককভাবে নিচ্ছেন। তবে জমি কেনা কিংবা বড় ধরনের সম্পদ বিক্রির ক্ষেত্রে আজও পুরুষদের প্রাধান্য বেশি; যা প্রায় ৯২ শতাংশ।

বৈশ্বিক চিত্র: কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৫ ও ২০২৬ অনুসারে বৈশ্বিক ইনডেক্স অনুযায়ী লৈঙ্গিক সমতায় শীর্ষে রয়েছে আইসল্যান্ড। দেশটি টানা ১৬ বছর ধরে লৈঙ্গিক সমতায় শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। সেখানে পরিবার ও রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অধিকার ৯২ দশমিক ৬ শতাংশ নিশ্চিত। এরপর রয়েছে ফিনল্যান্ড ও নরওয়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক আয়ের বৈষম্যে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। পরিবার ও সমাজে নারীর অবস্থানের দিক দিয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে আফগানিস্তান ও চাদ। দেশ দুটিতে নারীদের শিক্ষা ও স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।

সূত্র: ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, ইউনিসেফ, এশিয়া নিউজ নেটওয়ার্ক, সিএফপি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

শেষ বিদায়ে সহকর্মীদের ব্যতিক্রমী শ্রদ্ধা: অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনে থমকে গেল জনপদ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৬ থেকে ২৩ দিনের টানা ছুটি আসছে

বিনা দোষে মারধর ও হাতকড়া: মবের রাজত্বে অসহায় শ্যামলরা

চট্টগ্রাম নগরীর ফ্লাইওভারে ঝুলছিল ছাত্রলীগ নেতার মরদেহ

জাবিতে এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা, সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেল

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত