ঘড়িতে তখন ভোর ৫টা। চারপাশ যখন নিস্তব্ধ, তখন একজন গৃহবধূর দিন শুরু হয়। পরিবারের সবাই যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তিনি তখন রান্নাঘরে চুলার ছাই পরিষ্কার করছেন। পানি তোলা, নাশতা বানানো, সন্তানকে স্কুলের জন্য তৈরি করা থেকে শুরু করে গবাদিপশুর তদারকি—সবই তাঁর ভোরের রুটিন। বাংলাদেশের কোটি কোটি নারীর প্রতিদিনের গল্পের শুরুটা ঠিক এভাবেই।
শহর অঞ্চলে আবার দেখা যায়, সকালে উঠে সব কাজ শেষ করে অফিসের ব্যাগ আর টিফিন বক্স হাতে বাসা থেকে বের হন অসংখ্য নারী। এরপর কেউ বাসে, কেউ অফিসের গাড়িতে, কেউ রিকশায়, কেউ সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়ে ছোটেন অফিসের উদ্দেশে। সেই কাজ শেষে আবার ফেরেন বাসায়, পরিবারের কাছে। সেখানে দিনের শেষের দায়িত্বগুলো পালন করতে থাকেন একটার পর একটা।
গৃহিণী কিংবা কর্মজীবী—সব নারীই দিন শেষে পরিবারের প্রতি তাঁদের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু পরিবার তাঁদের ওপর দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে কতটা সচেতন? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর আসলে কারও কাছে নেই।
একটি পরিবারে নারীর কাজ শুধু রান্না কিংবা ঘর গোছানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকেরা একে বলেন ‘অদৃশ্য শ্রম’। একজন গৃহিণী সারা দিন বাসার কাজ করে ক্লান্ত হয়ে যান এবং শুয়ে পড়েন। মাস গেলে তাঁর অ্যাকাউন্টে এক পয়সাও থাকে না।
হঠাৎ কোনো বিপদে তাঁরা দিশেহারা অবস্থায় পড়েন। তখন তাঁর আশপাশের মানুষই বলতে থাকেন, ‘আরে, বোকা মেয়ে, আগে থেকে কিছু জিনিস গুছিয়ে রাখতে পারলে না?’ কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, কোনো নারী যখন গোছানোর কথা বলেছেন, তখন তাঁকেই কটাক্ষ করা হয়েছে। আবার কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রে হয়তো মাস গেলে টাকাটা ব্যাংকে ঢুকছে। তবে বাসার কোনো কিছু ফুরিয়ে গেলে সেটা আনার কথা কেন মনে নেই, সে কথাও শুনতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের পরিবারগুলোতে নারীর ভূমিকা বহুমুখী। কৃষিপ্রধান গ্রামগুলোতে নারীরা শুধু ঘরের কাজই করেন না, বরং বীজ সংরক্ষণ করা থেকে শুরু করে ফসল তোলা-পরবর্তী প্রক্রিয়ায় তাঁদের বিশাল অবদান রয়েছে। ২০২৪ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর লেবার ফোর্স সার্ভে অনুযায়ী, গ্রামীণ নারীদের কৃষিকাজে অংশগ্রহণের হার প্রায় ৫৬ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) লেবার ফোর্স সার্ভে (২০২৩) অনুযায়ী, ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী নারীদের মোট কর্মসংস্থানের ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ এখন কৃষি খাতে নিয়োজিত। এর বিপরীতে কৃষি খাতে পুরুষের অংশগ্রহণের হার ১৮ দশমিক ৮২ শতাংশ (বাংলাদেশ স্ট্যাটিসটিক্যাল ইয়ারবুক, ২০২৪)। অর্থাৎ মাঠপর্যায়ের কৃষিতে এখন পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যাধিক্য স্পষ্ট। কিন্তু এই বিপুলসংখ্যক নারী তাঁদের পরিবারের কাছে কতটা সম্মান পাচ্ছেন? ২০২৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশ নারী জীবনে একবার হলেও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গ্রামে এই হার ৭৬ শতাংশ এবং শহরে ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হওয়ার সঙ্গে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টি এখনো সমাধানের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
বাংলাদেশের পরিবারে নারীকে ‘লক্ষ্মী’ বা ‘সংসারের লক্ষ্মী’ বলা হলেও কাজের স্বীকৃতি এবং সম্মানের জায়গাটি এখন পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। গ্রামীণ ও শহরতলি অঞ্চলে আজও নারীদের ঘরোয়া কাজকে ‘কাজই নয়’ বলার প্রবণতা দেখা যায়। তবে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে সম্মান ও সহযোগিতার হার কিছুটা বাড়ছে। কিন্তু সমানভাবে কাজ করলেও কৃষি কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় অর্ধেক মজুরি পান, যা তাঁদের পারিবারিক অবস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ৮০ শতাংশের বেশি নারী অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেখানে শ্রম আইন, পেনশন অথবা স্বাস্থ্য বিমার কোনো সুরক্ষা নেই। পরিবারে নারীর গুরুত্ব শুধু সেবার খাতিরে নয়, বরং তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতার ওপরে হওয়া উচিত। বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের জরিপে ঘরোয়া কাজ অন্তর্ভুক্ত করার পর দেখা গেছে, নারীদের মোট কাজের সময় পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। নারীদের এই ‘অতিরিক্ত শ্রম’ একটি বৈশ্বিক এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতা।
পরিবারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের প্রাধান্য নিয়ে সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে কিছু তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৫-এ প্রকাশিত সিএফপি বোর্ডের রিপোর্ট অনুযায়ী, বৈশ্বিকভাবে প্রায় ৬৯ শতাংশ নারী এখন পরিবারের আর্থিক বিনিয়োগের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। বিবাহিত নারীদের ৬০ শতাংশ এখন সরাসরি বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের সিদ্ধান্ত নেন।
এ বছরের ইউনিসেফ ও ইউএন উইমেনের এক যৌথ গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের নারীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠছেন। বিশেষ করে যাঁরা ক্ষুদ্র ঋণের সঙ্গে যুক্ত কিংবা ছোট ব্যবসা করছেন, তাঁরা সন্তানদের শিক্ষা এবং দৈনন্দিন খরচের ক্ষেত্রে প্রায় ৮০ শতাংশ সিদ্ধান্ত এককভাবে নিচ্ছেন। তবে জমি কেনা কিংবা বড় ধরনের সম্পদ বিক্রির ক্ষেত্রে আজও পুরুষদের প্রাধান্য বেশি; যা প্রায় ৯২ শতাংশ।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৫ ও ২০২৬ অনুসারে বৈশ্বিক ইনডেক্স অনুযায়ী লৈঙ্গিক সমতায় শীর্ষে রয়েছে আইসল্যান্ড। দেশটি টানা ১৬ বছর ধরে লৈঙ্গিক সমতায় শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। সেখানে পরিবার ও রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অধিকার ৯২ দশমিক ৬ শতাংশ নিশ্চিত। এরপর রয়েছে ফিনল্যান্ড ও নরওয়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক আয়ের বৈষম্যে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। পরিবার ও সমাজে নারীর অবস্থানের দিক দিয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে আফগানিস্তান ও চাদ। দেশ দুটিতে নারীদের শিক্ষা ও স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।
সূত্র: ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, ইউনিসেফ, এশিয়া নিউজ নেটওয়ার্ক, সিএফপি

২০২১ সালের আগস্ট মাসের আগেও আফগানিস্তানের গণমাধ্যম ছিল প্রাণবন্ত। টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে উঠত সংবাদ পাঠিকাদের মুখ, রেডিওতে ভেসে আসত নারীদের কণ্ঠস্বর। শুধু তা-ই নয়, মাঠপর্যায়ে থাকা নারী সাংবাদিকেরা তুলে ধরতেন সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প। কিন্তু সময় বদলে গেছে।
৩ ঘণ্টা আগে
আমি চাকরি সূত্রে গাজীপুরে অফিস কোয়ার্টারে থাকি। আমার পরিবারের সবাই খুলনায় থাকে। এখানে রাত ৮টা বাজার আগেই গভীর রাতের নীরবতা নেমে আসে। অনেকটা সময় বিদ্যুৎ থাকে না। দোকানপাটও খুব একটা নেই। একমাত্র ছুটিতেই বাড়ি যেতে পারি।
৪ ঘণ্টা আগে
শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের একসঙ্গে বসে খাওয়ার অধিকার আদায় করার একটি সফল ক্যাম্পেইন ‘লাঞ্চ কাউন্টার সিট-ইন’। ডায়ান ন্যাশ সেই ঐতিহাসিক সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। প্রথমবারের মতো সার্থকভাবে এটি লাঞ্চ কাউন্টারগুলোতে বর্ণবৈষম্যের প্রাচীর ভেঙে দিয়েছিল। আমেরিকার নাগরিক অধিকার আন্দোলনের ইতিহাস...
৬ ঘণ্টা আগে
প্রযুক্তি দুনিয়ায় প্রচলিত শব্দ ‘টেক ব্রো’। সিলিকন ভ্যালির হর্তাকর্তা ‘পুরুষ’ প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের বেলায় এই ‘টেক ব্রো’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়, যাদের হাত ধরে এসেছে অ্যাপল, গুগল (অ্যালফাবেট), ফেসবুক (মেটা), ইন্টেল, এনভিডিয়া, এইচপি ও টেসলার মতো মার্কিন টেক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।
১ দিন আগে