Ajker Patrika

কেউ তাঁকে চাঁদ এনে দেয়নি, নিজেই চাঁদ ধরতে গিয়েছিলেন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ৫৫
কেউ তাঁকে চাঁদ এনে দেয়নি, নিজেই চাঁদ ধরতে গিয়েছিলেন
ক্রিস্টিনা কচ। ছবি: সংগৃহীত

কেউ তাঁকে চাঁদ এনে দেয়নি, বা চাঁদ এনে দেবে বলে প্রোপোজও করেনি! বরং তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল পৃথিবীর সেই নিষ্ঠুর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি—যা অদম্য, ক্ষমাহীন এবং এমন এক শক্তি যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নারীদের স্বপ্নকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। যুগ যুগ ধরে নারীদের শেখানো হয়েছে তাঁদের জায়গা কেবল এই পৃথিবীতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু সেই চিরচেনা গণ্ডি পেরিয়ে মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে নতুন এক মহাকাব্য রচনা করেছেন ক্রিস্টিনা কচ। আর্টেমিস-২ মিশনের মাধ্যমে তিনি যখন ওরিয়ন মহাকাশযানে চেপে চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা করেন, তখন তা কেবল একজন নভোচারীর ভ্রমণ নয়; সেটি শত বছরের সামাজিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা ভেঙে ফেলার এক জীবন্ত দলিল।

নারীর ক্ষমতায়ন আসলে ঠিক কেমন দেখায় যখন তা কোনো মহলের করুণা বা অনুমতির অপেক্ষা করা বন্ধ করে দেয়—ক্রিস্টিনা কচ হলেন সেই অদম্য রূপের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এটি কোনো মহিমান্বিত উপহার নয়, কিংবা ওপর মহল থেকে হাত বাড়িয়ে দেওয়া কোনো রাজকীয় আসন নয়। এটি একজন নারীর এমন এক জেদ যা তাঁকে ছাঁচে আটকা পড়তে দেয় না।

কচ নিজেকে গড়ে তুলেছেন শূন্যে ভাসার জন্য প্রস্তুত এক ইস্পাতসম মানবীতে। মহাকাশের সেই অন্ধকার শূন্যতায় টানা ৩২৮ দিন এবং সব মিলিয়ে ৬৬৫ দিনের দীর্ঘ প্রবাস প্রমাণ করে দিয়েছে—সহ্যক্ষমতা, সাহস এবং মেধার বিচরণক্ষেত্র কখনোই কেবল পুরুষদের একচেটিয়া দখল নয়। মহাকাশে পা রাখা, মহাবিশ্বের বিশালতাকে অনুভব করা এবং ফিরে এসে আরও একবার অজানাকে জয়ের ক্ষুধা নিয়ে স্বপ্ন দেখা—এটাই প্রকৃত ক্ষমতায়ন।

ক্রিস্টিনার প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা

ক্রিস্টিনা হ্যামক কচ ১৯৭৯ সালের ২৯ জানুয়ারি মিশিগানের গ্র্যান্ড র‍্যাপিডসে জন্মগ্রহণ করেন। উত্তর ক্যারোলিনার জ্যাকসনভিলে তাঁর বেড়ে ওঠা। অল্প বয়স থেকেই মহাকাশচারী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।

১৯৯৯ সালে কচ ঘানার লেগনের বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ নেন। সেখানে তিনি জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান পড়েন। ১৯৯৭ সালে ডারহামের নর্থ ক্যারোলাইনা স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড ম্যাথমেটিক্স থেকে স্নাতক হন এবং এরপরে র‍্যালির নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। সেখানে ২০০১ সালে তড়িৎ প্রকৌশল এবং পদার্থবিজ্ঞানে ব্যাচেলর অব সায়েন্স ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ২০০২ সালে তড়িৎ প্রকৌশলে মাস্টার অব সায়েন্স ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০১ সালে তিনি গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে নাসা একাডেমি প্রোগ্রাম সম্পন্ন করেন।

ক্রিস্টিনার শখের শেষ নেই— সার্ফিং, রক অ্যান্ড আইস ক্লাইম্বিং, প্রোগ্রামিং, সমাজসেবা, ট্রায়াথলন, যোগব্যায়াম, ব্যাকপ্যাকিং, কাঠের কাজ, ফটোগ্রাফি এবং ভ্রমণ তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। ফিলাডেলফিয়ার ক্রীড়া দলগুলোরও পাঁড় ভক্ত। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকার সময় ক্রীড়া দল ফিলিস এবং ঈগলসের খেলা দেখার ছবিও পোস্ট করেছিলেন।

মহাকাশযানের জানালা দিয়ে পৃথিবী দেখছেন ক্রিস্টিনা। ছবি: নাসা
মহাকাশযানের জানালা দিয়ে পৃথিবী দেখছেন ক্রিস্টিনা। ছবি: নাসা

ক্রিস্টিনা কচের অনন্য অর্জন:

প্রথম ‘অল-ফিমেল’ স্পেসওয়াক

ক্রিস্টিনা কচের মহাকাশ জয় কেবল একা চলার গল্প নয়। ২০১৯ সালের অক্টোবরে তিনি এবং জেসিকা মেয়ার মিলে মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে প্রথমবার সম্পূর্ণ নারীদলের হয়ে স্পেসওয়াক সম্পন্ন করেন। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (আইএসএস) একটি ত্রুটিপূর্ণ ব্যাটারি পরিবর্তনের জন্য তাঁরা যখন মহাশূন্যে পা রাখেন, তখন সেটি ছিল বিজ্ঞান ও সামাজিক সমতার এক বিশাল জয়।

দীর্ঘতম মহাকাশ যাত্রা ও রেকর্ডবুক

একজন নারী হিসেবে মহাকাশে এককভাবে দীর্ঘতম সময় কাটানোর রেকর্ডটি এখন ক্রিস্টিনা কচের দখলে। ৩২৮ দিনের এই মহাকাব্যিক ভ্রমণে তিনি পৃথিবীর চারপাশে ৫ হাজার ২৪৮ বার প্রদক্ষিণ করেছেন এবং প্রায় ১৩৯ মিলিয়ন মাইল পথ পাড়ি দিয়েছেন—যা পৃথিবী থেকে চাঁদে ২৯১ বার যাতায়াত করার সমান। যদিও ৪৩৭ দিনের বিশ্ব রেকর্ডটি রুশ নভোচারী ভ্যালেরি পলিয়াকভের দখলে, তবে কচের এই রেকর্ড মার্কিন মহাকাশ গবেষণায় নারীর সক্ষমতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণা: মানবদেহের রহস্যভেদ

মহাকাশে থাকাকালীন কচ ২০০টিরও বেশি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অংশ নিয়েছেন। নাসার বিজ্ঞানী ব্রায়ান ড্যানসবেরির মতে, কচের শরীর থেকে সংগৃহীত ডেটা মহাকাশ বিজ্ঞানের জন্য অমূল্য। দীর্ঘ সময় শূন্য মাধ্যাকর্ষণে থাকার ফলে মানুষের হৃদ্‌যন্ত্র, হাড় এবং মানসিক অবস্থায় কী ধরনের প্রভাব পড়ে, সে বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে চাঁদ এবং মঙ্গলে মানুষের বসতি স্থাপনের পথ প্রশস্ত করবে।

প্রস্তুতির নেপথ্যে: অ্যান্টার্কটিকা থেকে রক ক্লাইম্বিং

ক্রিস্টিনা কচের এই সফলতার পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে চলা অবর্ণনীয় পরিশ্রম। তিনি কেবল একজন দক্ষ প্রকৌশলীই নন, বরং একজন অদম্য অভিযাত্রী। কিশোর বয়সেই তিনি অ্যান্টার্কটিকা, গ্রিনল্যান্ড এবং আলাস্কার উত্তরতম প্রান্তের প্রতিকূল পরিবেশে সময় কাটিয়েছেন। তাঁর মতে, হিমশীতল পরিবেশে টিকে থাকার এই ধৈর্য এবং তাঁর শখের রক ক্লাইম্বিং বা পাহাড়ে চড়ার নেশা তাঁকে নাসার নভোচারী ক্লাসে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে সাহায্য করেছে।

দূর মহাশূন্যে প্রথম নারী

আর্টেমিস-২ মিশনের ওরিয়ন মহাকাশযানটি পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল (৪০৬,৭৭১ কিলোমিটার) দূরত্বে পৌঁছেছিল। মানুষের পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে যাওয়ার রেকর্ড এটি। আর্টেমিস-২ মিশনে চার সদস্যের ক্রু (রেইড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কচ এবং জেরেমি হ্যানসেন) ১০ দিনের চন্দ্র ফ্লাইবাই অভিযানের সময় এই মাইলফলক অর্জন করেন। এর আগে ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো-১৩ মিশনের দখলে ছিল এই রেকর্ড। মহাকাশযানটি পৃথিবী থেকে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৬৫৫ মাইল দূরে গিয়েছিল।

আগামী গন্তব্য: মঙ্গলের লাল দিগন্ত

চাঁদ জয় করার পর ক্রিস্টিনা কচের পরবর্তী স্বপ্ন হলো লাল গ্রহ মঙ্গলে যাওয়া। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন নভোচারী হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রতিকূলতায় টিকে থাকা। মঙ্গলের মতো দীর্ঘ মিশনের জন্য তিনি নিজের পরিবার ও প্রিয়জনদের থেকে দূরে থাকার মানসিক প্রস্তুতিও নিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, ১৫ মাস মহাকাশে কাটানোর পর একটি হাতে লেখা চিরকুটই হতে পারে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপহার।

দীর্ঘকাল ধরে মহাকাশ জয়ের গল্পগুলো পুরুষদের বীরত্বগাথা হিসেবেই লেখা হয়েছে। সেইসব ইতিহাসের পাতায় ক্রিস্টিনা কচের নাম কখনো ভাবা হয়নি। কিন্তু আর্টেমিস-২ মিশনে তিনি যখন পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে ওরিয়ন মহাকাশযানে চেপে চাঁদের দূরতম প্রান্তের কাছাকাছি পৌঁছান, তখন তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যান সেই অদৃশ্য ‘গ্লাস সিলিং’ বা কাচের দেয়াল। তিনি সেগুলোকে লুনার হরাইজন বা চন্দ্র-দিগন্তের গায়ে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছেন।

এটি কেবল একটি মহাকাশ যাত্রা নয়, বরং ইতিহাসের সেই ভুল সংশোধন যেখানে বারবার নারীদের বলা হয়েছিল—‘ওটা তোমার জন্য নয়।’ ক্রিস্টিনা কচের প্রতিটি সেকেন্ডের মহাকাশ ভ্রমণ আজ সেই প্রতিটি নীরব কণ্ঠস্বরের হয়ে কথা বলছে, যারা একসময় অবহেলার শিকার হয়েছেন।

ক্রিস্টিনা কচ প্রমাণ করেছেন, নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সীমাবদ্ধতাগুলো আসলে কখনোই বাস্তব ছিল না। তিনি আকাশের আমন্ত্রণের জন্য অপেক্ষা করেননি, বরং নিজেই আকাশকে বাধ্য করেছেন নারীশক্তির জন্য আরও প্রশস্ত হতে।

তিনি চাঁদকে হাতে পাননি, বরং তিনি চাঁদকে ছিনিয়ে নিয়েছেন—নীরবে, কিন্তু প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতার সঙ্গে। একটির পর একটি অসম্ভব কক্ষপথ অতিক্রম করে তিনি আজ প্রতিটি স্বপ্নবাজ মেয়ের হাতে সেই একই ক্ষমা না চাওয়া শক্তি তুলে দিয়েছেন: যা আমাদের জন্মগত অধিকার ছিল।

ক্রিস্টিনা কচ আজ কেবল একজন প্রকৌশলী বা নভোচারী নন; তিনি নারীশক্তির সেই আলোকবর্তিকা, যার আলোকছটায় আগামীর মহাকাশ যাত্রা হবে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক। তাঁর এই ঐতিহাসিক যাত্রা প্রতিটি মেয়েকে এই বার্তাই দেয় যে—আকাশ তোমার জন্য বন্ধ নয়, বরং আকাশ তোমার আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। তাঁর এই জয় আজ আমাদের সবার জয়, আমাদের সবার গর্ব।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত