যুগোস্লাভিয়া থেকে ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তান—সর্বত্রই যুদ্ধের ন্যায্যতা প্রমাণে নারীর অধিকারের এমন ব্যবহার হয়েছে। যত দিন না এটি বন্ধ হবে, তত দিন নারী মুক্তির স্লোগান দিয়ে পশ্চিমারা শুধু যুদ্ধই করে যাবে। আর নারীই হবে সেই যুদ্ধের প্রথম এবং শেষ শিকার।

যুক্তরাষ্ট্র যখন কোনো দেশে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন শুরু করে, তার আগে পশ্চিমা মিডিয়ায় সে দেশটির বিরুদ্ধে নানা কথা শোনা যায়। এর মাধ্যমে তারা মূলত দেশটিতে হামলা বা অভিযানের যৌক্তিকতা তৈরি করে।
সম্প্রতি ভেনেজুয়েলা ও ইরানের ওপর মার্কিন আগ্রাসন তার প্রমাণ। পশ্চিমা মিডিয়ায় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে দেখানো হলো ‘ড্রাগ ডিলার’ হিসেবে। এরপর এক দিনের অভিযানে সস্ত্রীক তাঁকে তুলে নিয়ে যায় ট্রাম্প প্রশাসন। ঠিক একইভাবে ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা দেশগুলো যুদ্ধের যৌক্তিকতা তৈরি করতে ব্যবহার করে নারীর অধিকার ও সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের বাণী।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বাধানোর এই টুলগুলোর বড় ভুক্তভোগী হলো নারী। কারণ, যুদ্ধের যৌক্তিকতা তৈরিতে ‘নারী অধিকার’ বিষয়টির এই অপব্যবহার শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যাই নয়, এটি বিশ্বজুড়ে নারীদের অস্তিত্বকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
২০২৫ সালে ‘ওমেন্স রাইটস ইন রিভিউ: থার্টি ইয়ারস আফটার বেইজিং’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাতিসংঘ। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯৫ সাল থেকে বিভিন্ন দেশ লৈঙ্গিক সমতা এগিয়ে নিতে ১ হাজার ৫৩১টি আইনি সংস্কার করেছে। গত তিন দশকে মাতৃমৃত্যুর হার এক-তৃতীয়াংশ কমেছে এবং সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। তবে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী বা কিশোরী নিজের পরিবারের সদস্য কিংবা সঙ্গীর হাতে নিহত হচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে, যখন বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার সংকটে, তখন কেন যুদ্ধের সময় হঠাৎ ‘নারী মুক্তি’ বা নারীর অধিকার এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে?
‘নারীর অধিকারের অস্ত্রায়ণ’ বা ‘লৈঙ্গিক বৈষম্যের অস্ত্রায়ণ’ শব্দগুলোর এই ‘অস্ত্রায়ণ’-এর অর্থ আসলে কী? এটি মূলত নারীকে রক্ষা, লৈঙ্গিক সমতা কিংবা নারীকে বাঁচানোর ভাষাকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। এর মাধ্যমে নারীর জীবনকে প্রকৃত অর্থে পরিবর্তন করার পরিবর্তে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ববাদী শাসন শক্তিশালী করার মতো অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হয়।
যদিও পিতৃতান্ত্রিক ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো নারীর অধিকারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। তবে ২০০১ সালে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ চলাকালে এই কৌশলের কার্যকর ব্যবহার দেখা গেছে।
২০০১ সালের ১৭ নভেম্বর সে সময়কার ফার্স্ট লেডি লরা বুশ রেডিও ভাষণে ঘোষণা করেছিলেন, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ একই সঙ্গে ‘নারীর অধিকার ও মর্যাদার লড়াই’। তিনি আফগানিস্তানে আগ্রাসনকে তালেবান শাসন থেকে আফগান নারীদের মুক্তির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আল কায়েদা সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক এবং আফগানিস্তানে তাদের সমর্থনকারী তালেবান শাসনব্যবস্থা নারী ও শিশুদের ওপর যে বর্বরতা চালাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হচ্ছে।’
হিলারি ক্লিনটন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাডেলিন অলব্রাইটের মতো মানুষেরাও বারবার বিশ্ব নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে নারীর অবদমনের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের দাবি ছিল, লৈঙ্গিক সমতাপূর্ণ সমাজে সন্ত্রাসবাদের জন্ম হওয়ার আশঙ্কা কম।
বরেণ্য ইতিহাসবিদ ও নৃবিজ্ঞানী লিলা আবু-লুগদ তাঁর একটি বইয়ে বলেছেন, ‘তারা (যুক্তরাষ্ট্র) আফগান নারীদের ‘মুসলিম সংস্কৃতি’ দ্বারা ব্যাপকভাবে নিপীড়িত হিসেবে চিত্রিত করে আফগানিস্তানে আগ্রাসনকে বৈধতা দিয়েছিল। এর মাধ্যমে তারা ‘উদার পশ্চিম’ এবং ‘অনগ্রসর ইসলাম’—এই ঔপনিবেশিক এবং প্রাচ্যবাদী বিভাজনকে পুনরুৎপাদন করে।’
এই কৌশলের সর্বশেষ উদাহরণ ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আগ্রাসন। সেই সংঘাতের আগে ২০২৫ সালের ১৪ জুন ইসরায়েল যখন ইরানে বিমান হামলা চালায়, তার পরের দিন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানি জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি আপনাদের (ইরানি নারীদের) স্বাধীনতার পথও পরিষ্কার করছি...এখন আপনাদের আওয়াজ তোলার সময়।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও দাবি করেছিলেন, ইরানে হামলা শাসন পরিবর্তন এবং ইরানি নারীদের মুক্তির দিকে ধাবিত করবে। কিন্তু এমনটা হয়েছে কি?
পশ্চিমে বসবাসকারী অনেক ইরানি নারীও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই হামলায় খুশি হয়েছিলেন এবং ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়েছিলেন। তবে কুর্দি নারীসহ ইরানি নারীবাদীরা যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দ্বারা নারী মুক্তির এই পশ্চিমা অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে তেহরানের এভিন কারাগারে বন্দী চারজন নারী অধিকারকর্মীর কথাই ভাবুন। তাঁরা ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়ে কারাগার থেকে একটি চিঠি লিখেছিলেন।
গোলরখ ইব্রাহিমি ইরাই, ভেরিশেহ মোরাদি, সাকিনেহ পারভানেহ এবং রেহানেহ আনসারিনেজাদের যৌথভাবে লেখা চিঠিটি তেহরানের এভিন কারাগার থেকে কুর্দিপন্থী ফিরাত নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত হয়েছিল।
চিঠিতে তাঁরা লিখেছিলেন, ‘ইসরায়েলের লক্ষ্য নারীদের মুক্তি দেওয়া নয়, বরং পশ্চিম এশিয়ায় একটি “দুর্বল এবং অনুগত” অঞ্চল তৈরি করা। দেশের শাসনব্যবস্থায় স্বৈরাচার থেকে আমাদের মুক্তি শুধু জনগণের সংগ্রামের মাধ্যমে এবং সামাজিক শক্তির ওপর ভরসা করেই সম্ভব।’
চিঠিতে আরও বলা হয়েছিল, যেসব শক্তি বৃহত্তর লাভের আশায় যুদ্ধ উসকে দিয়ে মানুষ হত্যা করে এবং শোষণ ও উপনিবেশের মাধ্যমে এই অঞ্চলের দেশগুলোর ধ্বংস ডেকে এনেছে, তারা নতুন করে ধ্বংস এবং শোষণ ছাড়া আমাদের জন্য আর কোনো পথ খোলা রাখবে না।
নারীর অধিকারের এই অস্ত্রায়ণ নিয়ন্ত্রণ আর নজরদারি বাড়ায়, সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা তীব্র করে এবং পিতৃতন্ত্র থেকে মুক্তি পেতে পুরুষ, নারী ও শিশুদের প্রকৃত নারীবাদী আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেয়। সর্বোপরি, এটি বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মধ্যে সংহতি খণ্ডিত করে।
অর্থাৎ অস্ত্রায়ণ নারীর অধিকারকে মুক্তির প্রকল্প থেকে সরিয়ে অন্যান্য ক্ষমতাকেন্দ্রিক অ্যাজেন্ডাকে বৈধ করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে অধিকাংশ নারী আরও বেশি নিয়ন্ত্রিত, অনিরাপদ এবং রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন।
যুগোস্লাভিয়া থেকে শুরু করে ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তান—সর্বত্রই যুদ্ধের ন্যায্যতা প্রমাণে নারীর অধিকারের এমন ব্যবহার হয়েছে। যত দিন না এটি বন্ধ হবে, তত দিন নারী মুক্তির স্লোগান দিয়ে পশ্চিমারা শুধু যুদ্ধই করে যাবে। আর নারীই হবে সেই যুদ্ধের প্রথম এবং শেষ শিকার।
‘দ্য ওয়্যার’-এ প্রকাশিত মানবাধিকারকর্মী নন্দিত হাকসারের মতামত সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা।

আমি একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছে প্রায় তিন বছর। সম্প্রতি একটি মোবাইল ফোন নম্বর থেকে আমাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। কখনো ছবি আবার কখনো মেসেজের স্ক্রিনশট ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ইতিমধ্যে আমার কাছ থেকে টাকাপয়সাও হাতিয়ে নিয়েছে নম্বরটির ব্যবহারকারী।
১ ঘণ্টা আগে
যা ছাড়া এখন জীবন কল্পনা করা যায় না, সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। প্রজন্ম যেটাই হোক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্ল্যাটফর্মগুলোতে তাদের সরব উপস্থিতি। এখানে কেউ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা জানান, কেউ নিজের ছবির সঙ্গে জুড়ে দেন মানানসই কবিতা কিংবা গানের লাইন। আবার অনেকে এই মাধ্যমকে ব্যবহার করেন নিজের মতামত...
২ ঘণ্টা আগে
আজ মৌমাছি দিবস। পৃথিবীর খাদ্যশৃঙ্খল ও কৃষিব্যবস্থার এক-তৃতীয়াংশ পরাগায়ন নির্ভর করে তাদের ওপর। কিন্তু ক্ষতিকর পরজীবী ভ্যারোয়া মাইট, ভাইরাস এবং কীটনাশকের প্রভাবে তারা হারিয়ে যাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। মৌমাছিদের এই গণমৃত্যু ও বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে এক যুগান্তকারী প্রাকৃতিক সমাধান নিয়ে এসেছিলেন...
২ ঘণ্টা আগে
২৩ মে, শনিবার বিশ্ব কচ্ছপ দিবস। এ উপলক্ষে রইল দুই নারীর লড়াইয়ের গল্প। তখনো পুরোপুরি সকাল হয়নি। ভারত মহাসাগরের নীল পানি ধীরে ধীরে রোদে চকচক করতে শুরু করেছে। দূর থেকে ভেসে আসছে ঢেউয়ের গর্জন। কেনিয়ার দক্ষিণ উপকূলের ছোট্ট একটি ডাইভ সেন্টারে তখন চলছে দিনের প্রস্তুতি।
৩ ঘণ্টা আগে