নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফল অনেক নারী দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ইতিহাসের নানা সময়ে জন্মেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস হয়তো তাঁদের মনে রাখেনি। এমন কয়েকজন নারী আছেন এই অঞ্চলে, যাঁরা শুধু সাফল্য অর্জন করেই থেমে যাননি; বদলে দিয়েছেন সমাজ, রাষ্ট্র এবং হাজারো মানুষের জীবন। কেউ উগ্রপন্থী রাজনৈতিক শক্তির মুখোমুখি হয়ে নারী অধিকারের জন্য লড়াই করেছেন, কেউ মেয়েদের শিক্ষার পথ খুলে দিয়েছেন, আবার কেউ মানব পাচারের শিকার হাজারো নারীকে নতুন জীবনে ফিরিয়ে এনেছেন। তবে এই গল্প একরৈখিক নয়, বহুরৈখিক।
আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল—এই ছয় দেশের ছয় নারীর জীবনসংগ্রাম নিয়ে আজকের আয়োজন। লিখেছেন জগৎপতি বর্মা

দক্ষিণ এশিয়ার নারী জাগরণের অন্যতম অগ্রদূত বেগম রোকেয়া। ১৮৮০ সালে রংপুরের পায়রাবন্দে জন্ম নেওয়া রোকেয়া সে সময়কার সামাজিক ও পারিবারিক বাধার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি। তাঁর ভাইদের কাছে গোপনে বাংলা ও ইংরেজি শেখেন। ১৯০৫ সালে তিনি লেখেন ‘সুলতানার স্বপ্ন’। এই বই বিশ্বের প্রথম দিকের নারীবাদী কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য হিসেবে স্বীকৃত। স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯০৯ সালের ১ অক্টোবর বর্তমান ভারতের বিহারের ভাগলপুরে প্রতিষ্ঠা করেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল। মাত্র পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে শুরু হওয়া বিদ্যালয়টি
পরে হাজারো শিক্ষার্থীর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ১৯১৬ সালে তিনি গড়ে তোলেন আনজুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম নামের প্রতিষ্ঠান। এটি নারী শিক্ষা, নারীদের আইনি অধিকার এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করত। মৃত্যুর আগের রাতেও তিনি নারীর অধিকার নিয়ে লিখেছিলেন। আজও বাংলাদেশে ৯ ডিসেম্বর দিনটি ‘রোকেয়া দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।

কন্যাসন্তান হওয়ার অপরাধে জন্মের পরদিনই যাকে রোদে ফেলে রাখা হয়েছিল, সেই ফাওজিয়া কুফিই পরবর্তী সময়ে আফগান রাজনীতিতে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। ফাওজিয়া কুফি আফগানিস্তানের ইতিহাসে প্রথম নারী ডেপুটি স্পিকার।
তালেবান নারীদের শিক্ষা নিষিদ্ধ করলে চিকিৎসাশাস্ত্রের পড়াশোনা ছেড়ে ইউনিসেফে কাজ শুরু করেন ফাওজিয়া। পরে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন এবং ২০১৪ সালে প্রেসিডেন্ট পদেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০২০ সালে তালেবানের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন। একই বছর হত্যাচেষ্টায় আহত হলেও তিনি কাজ চালিয়ে যান। ২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর দেশ ছাড়তে বাধ্য হন ফাওজিয়া। এখন নির্বাসনে থেকে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে আফগান নারীদের অধিকারের পক্ষে কাজ করছেন।

২১ বছর বয়সে এক সড়ক দুর্ঘটনায় কোমরের নিচের অংশ অবশ হয়ে যায় পাকিস্তানের মুনিবা মাজারির। এরপর চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, তিনি আর কখনো হাঁটতে পারবেন না। কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর নতুন জীবনের পথচলা। তিনি পাকিস্তানের প্রথম হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মডেল ও টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে ইতিহাস গড়েন। ২০১৫ সালে মুনিবা মাজারি জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থার (ইউএন উইমেন) পাকিস্তানবিষয়ক প্রথম জাতীয় শুভেচ্ছাদূত নির্বাচিত হন। বিবিসির ‘১০০ অনুপ্রেরণাদায়ী নারী’ এবং ফোর্বসের ‘৩০ আন্ডার ৩০’ তালিকায়ও জায়গা করে নেন মুনিবা মাজারি।

মণিপুরের এক কৃষক পরিবারে জন্মেছিলেন ভারতের কিংবদন্তি বক্সার মেরি কম। পরিবারের অমতে গোপনে তিনি বক্সিং শুরু করেন। পরে ছয়বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতিহাস গড়েন, যা এখন পর্যন্ত কোনো নারী বক্সার অর্জন করতে পারেননি। ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকে ভারতের প্রথম নারী বক্সার হিসেবে পদক জেতেন মেরি কম। এশিয়ান গেমস এবং কমনওয়েলথ গেমসেও তিনি স্বর্ণপদক অর্জন করেন। যমজ সন্তান জন্ম নেওয়ার পর আবার খেলায় ফিরে বিশ্বসেরা হন। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বক্সিং একাডেমিতে সুবিধাবঞ্চিত তরুণ-তরুণীরা বিনা খরচে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ২০২০ সালে তিনি অর্জন করেন ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মবিভূষণ’।

শ্রীলঙ্কার সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ড. আশা দে ভস ভারত মহাসাগরের নীল তিমি নিয়ে গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। প্রচলিত ধারণার বিপরীতে তিনি প্রমাণ করেছেন, উত্তর ভারত মহাসাগরের নীল তিমিগুলো অন্য অঞ্চলের তিমির মতো পরিযায়ী নয়। তারা সারা বছর স্থানীয় পরিবেশেই বসবাস করে।
ড. আশা শ্রীলঙ্কার প্রথম নারী, যিনি সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী নিয়ে অক্সফোর্ড এবং সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। পরে প্রতিষ্ঠা করেন দেশটির প্রথম সামুদ্রিক সংরক্ষণ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ওশানস-ওয়েল। তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক স্বীকৃতি পেয়েছে। এ ছাড়া বিবিসির ‘১০০ নারী’ তালিকায়ও স্থান করে নেন আশা দে ভস।

নেপালের অনুরাধা কৈরালা ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মাইতি নেপাল। নিজে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি এই উদ্যোগ নেন। সংস্থাটি মানব পাচারের শিকার নারী ও শিশুদের উদ্ধার, পুনর্বাসন এবং আইনি সহায়তা দেয়। সীমান্তে নজরদারির মাধ্যমে হাজারো পাচার চেষ্টা প্রতিরোধ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ পর্যন্ত ২৩ হাজারের বেশি নারী ও শিশুকে উদ্ধার এবং পুনর্বাসন দিয়েছে মাইতি নেপাল। এই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১০ সালে তিনি সিএনএনের ‘হিরো অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন। ২০১৭ সালে নেপালের এই মহীয়সী নারী ভারত সরকারের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক নাগরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ পান।
দক্ষিণ এশিয়ার এই ছয়জন নারী শুধু ইতিহাস বদলে দেননি, তাঁরা হয়ে আছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথপ্রদর্শক। শিক্ষা, রাজনীতি, বিজ্ঞান, ক্রীড়া, শিল্প ও মানবাধিকারের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই নারীদের অবদান শুধু নিজ নিজ দেশে নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, ডয়চে ভেলে

আমি একটি ফুড শপ ব্যবসা শুরু করেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ব্যবসার হিসাব এবং পরিস্থিতি ধরে রাখতে পারিনি। বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে নেওয়া প্রতিটি টাকা ব্যবসার পেছনে খরচ করেছি। একপর্যায়ে দৈনিক পরিচালন খরচ চালাতে হিমশিম খেয়ে দোকানটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। দোকানটি বিক্রি করার পর যে সামান্য টাকা পেয়েছিলাম
২ ঘণ্টা আগে
‘শান্তি’ শব্দটির অর্থ ব্যক্তির অনুভূতি আর প্রেক্ষাপটভেদে আলাদা। কেউ কেউ শান্তি বলতে বোঝেন শুধু যুদ্ধবিরতি কিংবা কোনো রাষ্ট্রীয় আর রাজনৈতিক চুক্তিকে। কিন্তু সহিংসতাহীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির বাইরেও একজন মানুষের দৈনন্দিন অস্তিত্বের সঙ্গে শান্তির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে লজ্জা, ভয়,
৩ ঘণ্টা আগে
পুলিৎজারজয়ী মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’ লিখেছিলেন আমেরিকান লেখিকা ও সাংবাদিক মার্গারেট মানেরলিন মিচেল। জীবদ্দশায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত তাঁর এই একটিমাত্র উপন্যাসই প্রকাশিত হয়েছিল। এটি সাহিত্যজগতে সৃষ্টি করে যুগান্তকারী ইতিহাস।
৪ ঘণ্টা আগে
ফিলিস্তিনের গাজার আল-আমাল শরণার্থীশিবিরের তাঁবু থেকে প্রতিদিন সকাল প্রায় ৯টায় বের হন পাঁচ সন্তানের জননী ওলা সালেহ। পাঁচ মিনিট হেঁটে তিনি যান আরেকটি তাঁবুতে। সেখানে ৩৯ বছর বয়সী সালেহ কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও মাতৃত্বের দায়িত্ব, বাস্তুচ্যুতি আরও স্বামীহারা নারীর কঠিন বাস্তবতা থেকে...
১২ দিন আগে