Ajker Patrika

সেখানে নারীদের প্রতিদিনের টিকে থাকার লড়াই

  • জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে যুদ্ধে গাজায় প্রায় ১৬ হাজার নারী স্বামী হারিয়েছেন।
  • প্রতি ৭টি পরিবারের একটির প্রধান এখন নারী। নিজেরা আলোচনা করছেন, কষ্ট ভাগাভাগি করছেন।

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৬, ২০: ১৯
সেখানে নারীদের প্রতিদিনের টিকে থাকার লড়াই
গাজা উপত্যকার প্রতি ৭টি পরিবারের একটির প্রধান এখন নারী। ছবি: আল জাজিরা

ফিলিস্তিনের গাজার আল-আমাল শরণার্থীশিবিরের তাঁবু থেকে প্রতিদিন সকাল প্রায় ৯টায় বের হন পাঁচ সন্তানের জননী ওলা সালেহ। পাঁচ মিনিট হেঁটে তিনি যান আরেকটি তাঁবুতে। সেখানে ৩৯ বছর বয়সী সালেহ কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও মাতৃত্বের দায়িত্ব, বাস্তুচ্যুতি আরও স্বামীহারা নারীর কঠিন বাস্তবতা থেকে কিছুটা হলেও দূরে থাকার সুযোগ পান।

গাজায় এটি শুধুমাত্র নারীদের জন্য একটি নিরাপদ জায়গা, যেখানে ‘কালেকটিভ ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টস’ নামক একটি বেসরকারি সংস্থা কিছু কর্মকাণ্ড চালায়। সংস্থাটি নারীদের মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা, দলগত আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকে। এখানে মনোবিদ আছেন। প্রিয়জন হারানো মানুষেরা নানান বিষয় নিয়ে কথা বলেন। সেখানে ওলা সালেহ নারীদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, যারা তাঁর কষ্ট মুখে না বললেও বুঝতে পারেন।

চোখের পানি মুছতে মুছতে ওলা সালেহ বলেন, তাঁর ৪৩ বছর বয়সী স্বামী আব্দুল জলিল সালেহ গত আগস্টে পরিবারের জন্য খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে যাওয়ার পথে নিহত হন। তিনি বলেন, ‘আমি এখনো জানি না তাঁকে স্নাইপার নাকি কোয়াডকপ্টার ড্রোন থেকে গুলি করা হয়েছিল।’

স্বামীর মৃত্যুর পর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারান ওলা সালেহ। তার ভাষায়, সেই মানুষটিকে হারান যিনি ছিলেন তার সবচেয়ে বড় সান্ত্বনার উৎস। ওলা সালেহ এখন বাস্তুচ্যুত হয়ে দেইর আল-বালাহতে শরণার্থীশিবিরে থাকেন। তাঁর পাঁচ সন্তান। পাঁচ থেকে ১৭ বছর বয়সী এসব সন্তানকে একাই বড় করছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি দিন আগের দিনের চেয়ে কঠিন মনে হয়। দায়িত্ব বাড়ছেই, আর তার অভাব আরও বেশি অনুভব করি।’

আল জাজিরা জানায়, জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে গাজায় প্রায় ১৬ হাজার নারী স্বামী হারিয়েছেন। ফলে গাজার প্রতি সাতটি পরিবারের মধ্যে একটির প্রধান এখন একজন নারী।

নারীদের এই নিরাপদ কেন্দ্রের মাঠ সমন্বয়কারী আলা দাউদ বলেন, নারীরা যেন নিরাপদ পরিবেশে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় মানসিক ও ব্যবহারিক সহায়তা পান, সে লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় প্রায় ১৬ হাজার নারী স্বামী হারিয়েছেন। ছবি: আল জাজিরা
যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় প্রায় ১৬ হাজার নারী স্বামী হারিয়েছেন। ছবি: আল জাজিরা

শুধু সান্ত্বনা নয়, সচেতনতারও জায়গা

মধ্য গাজার আল-ফারাহ স্কুলে গত সপ্তাহে এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে। পরে গাজার অন্যান্য আশ্রয়কেন্দ্রেও এই সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। উত্তর গাজাতেও একই ধরনের কার্যক্রম চলছে। এখানে শুধু মানসিক সহায়তাই নয়, যুদ্ধের কারণে বেড়ে যাওয়া পারিবারিক চাপ, অর্থনৈতিক সংকট, মানসিক স্বাস্থ্য এবং বাস্তুচ্যুত অবস্থায় সন্তান লালন-পালনের মতো বিষয়েও আলোচনা হয়। দাউদ জানান, প্রথম দিন প্রায় ৬০ জন নারী অংশ নেন। দ্বিতীয় দিনে তা বেড়ে হয় ৬৫ জন। পরে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৭০ থেকে ৭৫ জনে পৌঁছায়। তিনি বলেন, ‘নারীরা এমন একটি জায়গা চান, যেখানে নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের কথা বলতে পারবেন। এখানে এসে তাঁরা মনের চাপ কমাতে পারেন, ইতিবাচক শক্তি পান এবং সন্তান ও সমাজের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে চলবেন, তা শিখতে পারেন।’

ওলা সালেহের কাছে এই বৈঠকগুলো তার শোক দূর করে না, তবে তা সহ্য করার শক্তি জোগায়। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিদিন এখানে আসার অপেক্ষায় থাকি। অন্য নারীদের অভিজ্ঞতা, আলোচনা এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ আমাকে কিছুটা স্বস্তি দেয়।’

অন্যদের সাহস জোগান সুয়াদ

একই বৈঠকে অংশ নেন ৬৩ বছর বয়সী সুয়াদ আল-ঘারাবালি। তিনি দলের সবচেয়ে প্রবীণ সদস্যদের একজন। নিজের কষ্টের কথা বলার পাশাপাশি তিনি তরুণ মায়েদের কথা শোনেন এবং আট সন্তান লালন-পালনের অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ দেন।

যুদ্ধের আগে সুয়াদ গাজা শহরের শুজাইয়া এলাকায় থাকতেন। বাড়ি ধ্বংস হওয়ার পর এখন তিনি দেইর আল-বালাহে ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে একটি তাঁবুতে থাকেন। যুদ্ধে তিনি আলাদা দুটি বিমান হামলায় ২৪ ও ৩৫ বছর বয়সী দুই ছেলেকে হারিয়েছেন। ছেলেদের কথা বলতে গিয়ে এখনো কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তবু নিজের অভিজ্ঞতাকে অন্য নারীদের উপকারে লাগানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, ‘এই বৈঠকগুলো আমার ভালো লাগে, কারণ এখানে সচেতনতা তৈরি হয়। এই প্রজন্ম অনেক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।’ তার মতে, এই বৈঠকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নারীরা একে অন্যের কাছ থেকে শেখার সুযোগ পান।

সমন্বয়কারী আলা দাউদ বলেন, এসব কেন্দ্র শুধু পরামর্শ দেওয়ার জায়গা নয়, বরং যুদ্ধজুড়ে নারীদের অবদানের স্বীকৃতিও। তার ভাষায়, ‘এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব নারীরাই কাঁধে নিয়েছেন। তাঁরা দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি ও অসহনীয় চাপের মধ্যে থেকেও পরিবার সামলেছেন।’

আল জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন রাফসান জানি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত