Ajker Patrika

পাহাড়ে বসেই স্বপ্নচূড়া গড়েছেন নেইম্রা

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
পাহাড়ে বসেই স্বপ্নচূড়া গড়েছেন নেইম্রা
নেইম্রা মারমা। ছবি: সংগৃহীত

পাহাড়ের জীবন সহজ নয়। দুর্গম পথ, সীমিত সুযোগ আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সেখানে মানুষ স্বপ্ন দেখে, বাস্তবে রূপও দেয়। তেমনি এক গল্পের চরিত্র খাগড়াছড়ির নেইম্রা মারমা। জীবনের কঠিন সময়ে মা ও ভাইকে হারিয়ে সংসারের ভার এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। তখন হাতে ছিল না পুঁজি, ছিল না ব্যবসার অভিজ্ঞতা। তারপরও মাত্র ১২ হাজার টাকা আর আত্মবিশ্বাসে ভর করে যাত্রা শুরু করেন তিনি।

২০১৭ সাল। নেইম্রা শুরু করলেন নিজের খাবারের দোকান। ভালোবেসে নাম দিলেন স্বপ্নচূড়া। পাহাড়ি জনপদের ছোট সেই দোকান আজ বড় রেস্টুরেন্ট। সেখানে একসঙ্গে বসে খাবার খেতে পারেন ১০০ জনের বেশি ব্যক্তি এবং সেই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন ১৫ জন নারী।

শুরুর গল্প এতটা সহজ ছিল না। ফুচকা, নুডলস আর জনপ্রিয় পাহাড়ি খাবার মুণ্ডি দিয়ে যাত্রা শুরু হয় স্বপ্নচূড়ার। খাবারের ঝুড়ি নিয়ে ছোটাছুটি করতে হতো নেইম্রাকেও। তাঁর এই উদ্যোগ দেখে অনেকে উপহাস করেছেন। নানা প্রতিকূলতায় একসময় ব্যবসা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়; কিন্তু থেমে যাননি তিনি। নতুন করে শুরু করেন।

নিজের পরিশ্রম আর আন্তরিকতার সঙ্গে ধীরে ধীরে যুক্ত হতে থাকে অভিজ্ঞতা। ক্রেতাও বাড়তে থাকে। তবে নেইম্রা বুঝতে পারেন, ব্যবসা বড় করতে শুধু পরিশ্রম যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিকল্পনা, হিসাবরক্ষণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক ব্যবসায়িক জ্ঞান।

1-(1)

এ পর্যায়ে তাঁর পাশে দাঁড়ায় বিশ্বব্যাংক ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) অর্থায়নে এবং আইডিএফের পরিচালিত রেইজ প্রকল্প। ২০২৪ সালে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি পান ৫ লাখ টাকার ঋণ সুবিধা। পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় ১৬ দিনের নিবিড় প্রশিক্ষণ।

প্রশিক্ষণে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি মোকাবিলা, গ্রাহকসেবা, অনলাইন মার্কেটিং এবং আধুনিক হিসাবরক্ষণ শেখেন নেইম্রা। তাঁর ভাষায়, ‘এই প্রশিক্ষণ আমার আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি শিখেছি ব্যবসার সব আয় নিছক মুনাফা নয়; ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের গুরুত্বও অপরিসীম।’

ঋণের অর্থ ও নিজের সঞ্চয় কাজে লাগিয়ে স্বপ্নচূড়ার পরিসর বাড়ান তিনি। আগে যেখানে ১০ থেকে ২০ জন বসতে পারতেন, এখন সেখানে একসঙ্গে ১০০ জনের বেশি অতিথির বসার ব্যবস্থা রয়েছে। দুপুরে খাবার, বিকেলে বিভিন্ন স্ন্যাকসের পাশাপাশি শিশুদের জন্য রয়েছে কিডস জোন। আছে ফিশ অ্যাকুয়ারিয়াম। খাবারের মান, দাম ও পরিবেশের কারণে স্থানীয় লোকজনের কাছেও স্বপ্নচূড়া জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

1-(5)

এই রেস্তোরাঁর নিয়মিত ভোক্তা সজীব মারমা বলেন, ‘এখানকার খাবারের মান ভালো। তাই পরিবার নিয়ে মাঝেমধ্যে খেতে আসি। দামও সাধ্যের মধ্যে। সবচেয়ে ভালো লাগে এখানকার পরিবেশ।’ নেইম্রার সাফল্যের হিসাব শুধু টাকার অঙ্কে নয়। তাঁর উদ্যোগে তৈরি হয়েছে অন্যদের কাজের সুযোগও।

স্বপ্নচূড়ায় বর্তমানে ১৫ জন নারী কাজ করছেন। তাঁদের ১২ জন পূর্ণকালীন এবং তিনজন খণ্ডকালীন। দুর্গম এলাকা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের কাজের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেন নেইম্রা।

একসময় যে উদ্যোগ নিয়ে তাঁকে উপহাস শুনতে হয়েছিল, সেই স্বপ্নচূড়া এখন পরিচিত একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। রেস্টুরেন্ট ঘিরে গড়ে ওঠা এলাকাটি স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে স্বপ্নচূড়া আবাসিক এলাকা নামে পরিচিতি পেয়েছে।

পাহাড়ের ছোট একটি খাবারের দোকান থেকে আজকের স্বপ্নচূড়া—নেইম্রার পথচলায় সাফল্যের পাশাপাশি আছে হারানোর বেদনা, প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই এবং বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।

এখন নেইম্রার স্বপ্ন আরও বড়। খাগড়াছড়ির পাহাড় পেরিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো বড় শহরেও স্বপ্নচূড়ার শাখা ছড়িয়ে দিতে চান তিনি। ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তাদের জন্য নেইম্রার পরামর্শ, ‘স্বপ্ন দেখুন, সাহস রাখুন এবং কখনো হাল ছাড়বেন না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত