সিনেমা না হলেও বিষয়টি সিনেমার মতো। রানি নিজে বিমান চালিয়ে গেছেন যুদ্ধের মহড়ায়! রূপকথায় আমাদের রানিরা বিভিন্ন কাজ করে পরিবার বাঁচিয়েছেন, রাজ্য বাঁচিয়েছেন, আর এখনকার রানিরা বাঁচানোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন নিজেদের দেশ।
পৃথিবীতে এখনো সাংবিধানিক রাজতন্ত্র টিকে আছে ২৯টি দেশে। সেই দেশগুলোর অন্যতম থাইল্যান্ড। দেশটির রানি সুথিদা বাজির্যালংকর্ন না আয়ুধ্যা সম্প্রতি বিশ্বের প্রথম রানি হিসেবে সুপারসনিক ফাইটার জেট চালনার কীর্তি গড়েছেন। বিশ্ব ইতিহাসে এর আগে আর কোনো রানি নিজে এককভাবে আধুনিক সুপারসনিক ফাইটার জেট চালনার কীর্তি গড়েছেন বলে জানা যায় না। সেই অভাবনীয় রেকর্ড গড়ে অ্যাভিয়েশন ও রাজকীয় ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সূচনা করেছেন থাইল্যান্ডের রানি।
এর আগে বিমানের ককপিট ‘জয়’ করে ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন সাহসী অনেক নারী। ১৯২৮ সালে আমেলিয়া ইয়ারহার্ট প্রথম নারী হিসেবে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লিলি লিটভ্যাকের মতো নারী ফাইটার পাইলটেরা যুদ্ধক্ষেত্রে অসামান্য বীরত্ব দেখিয়েছেন। ১৯৯৫ সালে ভারতের অবনি চতুর্বেদী কিংবা পদ্মাবতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নারীরা আধুনিক যুদ্ধবিমানের ককপিটে রাজত্ব করেছেন। এমনকি রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে জর্ডানের রাজকুমারী সালমা বিনতে আবদুল্লাহ দেশটির প্রথম নারী সামরিক পাইলট হিসেবে বিমান নিয়ে আকাশে উড়েছেন। এই নারীদের কেউই রানি নন।

থাইল্যান্ডের রানি সুথিদার পুরো ক্যারিয়ার অবশ্য কেটেছে উড়োজাহাজেই। তিনি একজন সাবেক ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট। রাজনীতি ও রাজপরিবারে যুক্ত হওয়ার আগে তিনি ২০০০ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত জাপান এয়ারলাইনসে কাজ করেছেন। এরপর ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত থাই এয়ারওয়েজে কেবিন ক্রু হিসেবে কাজ করেন। ২০১০ সালে থাই রাজার রয়্যাল সিকিউরিটি কমান্ডে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর রাজকীয় জীবন ও অ্যাভিয়েশন প্রশিক্ষণের সূচনা হয়। ২০১৬ সালে তিনি সেনাবাহিনীর জেনারেল পদে উন্নীত হন এবং ২০১৯ সালের ১ মে রাজা মহা বাজির্যালংকর্নের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাইল্যান্ডের রানি হিসেবে রাজকীয় মর্যাদা লাভ করেন।
২০১০ সালে সামরিক প্রশিক্ষণ বিমান সেসনা টি-৪১ডি দিয়ে সুথিদার পাইলট জীবনের সূচনা হয়। এরপরই সুথিদার জীবনে যেন রোমাঞ্চকর গল্পের রূপকথা হয়ে ওঠে। তিনি থাইল্যান্ড ও জার্মানিতে বাণিজ্যিক এবং সামরিক বিমান চালানোর কঠোর প্রশিক্ষণ শেষ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বাণিজ্যিক পাইলটের যোগ্যতা, বোয়িং ৭৩৭ টাইপ রেটিং এবং এয়ারলাইন ট্রান্সপোর্ট পাইলট লাইসেন্স অর্জন করেন। তিনি তাঁর স্বামী রাজা মহা বাজির্যালংকর্নের সঙ্গেও বহু রাজকীয় সফরে সহ-পাইলট হিসেবে বোয়িং ৭৩৭ বিমান পরিচালনা করেছেন।
এ বছরের আগস্টে রানি সুথিদা সুরাত থানি প্রদেশের উইং ৭ এয়ার বেসে জেএএস ৩৯ গ্রিপেন যুদ্ধবিমানের বিশেষ প্রশিক্ষণ শুরু করেন। কঠোর থিওরিটিক্যাল বিষয়, ইমার্জেন্সি প্রসিডিউর, সিমুলেটর সেশন এবং ২-সিটের বিমানে প্রশিক্ষকের সঙ্গে উড্ডয়ন শেষ করে তিনি এক নতুন ইতিহাস গড়েন। এ বছরের ৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে এককভাবে ৪১ মিনিটের জন্য এক সিটের গ্রিপেন যুদ্ধবিমান পরিচালনা করেন তিনি। রাজা মহা বাজির্যালংকর্ন স্বয়ং এই ঐতিহাসিক উড্ডয়ন পর্যবেক্ষণ করেন। উড্ডয়ন শেষে রাজা তাঁকে গ্রিপেন অর্ডারের মেডেল পরিয়ে দেন। এই ঐতিহাসিক অর্জনের ঠিক ছয় দিন পর, ১৪ অক্টোবর রানি সুথিদা আন্তর্জাতিক আইস হকি ফেডারেশনের নারী গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে অফিশিয়াল সফরে অধিনায়ক (ক্যাপ্টেন) হিসেবে নিজেই রাজকীয় বোয়িং ৭৩৭-৮০০ বিমান চালিয়ে ব্যাংকক থেকে জাপানের হোক্কাইডো ভ্রমণ করেন। এই সফর শেষে সফলভাবে তিনি ব্যাংককে ফিরে আসেন।
কেবিন ক্রু থেকে শুরু করে রানি এবং পরে পেশাদার ফাইটার পাইলট হিসেবে বারবার নিজেকে প্রমাণ করেছেন সুথিদা। তিনি ১৯৭৮ সালের ৩ জুন থাইল্যান্ডের সোংকলা প্রদেশের হাত ইয়াইয়ে জন্মগ্রহণ করেন। ২০০০ সালে অ্যাসাম্পশন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি কমিউনিকেশন আর্টসে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
সূত্র: বিবিসি, ই ভিএন এক্সপ্রেস, চায়না ডেইলি









-dd793f-256x144.webp)
-e737cb-256x144.webp)