উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের জমিতে মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সিইওর বিরুদ্ধে ক্ষোভ

কিশোরগঞ্জের ভৈরব বাজার উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের জমিতে মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জেলা পরিষদের প্রশাসক ভিপি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোছা. মোস্তারি কাদেরীর বিরুদ্ধে। এ খবরে ক্ষোভ প্রকাশ করে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের জমি রক্ষা এবং প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিক হাসপাতালে রূপান্তরের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকেরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতার আগে ভৈরব বাজার এলাকায় মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কেন্দ্রটিতে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাসেবা চালু রয়েছে। তবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে হাসপাতালের জমি নিয়ে বিভিন্ন মহলের তৎপরতা শুরু হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সর্বশেষ আজ মঙ্গলবার সকালে জেলা পরিষদের প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মী উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পরিদর্শনে যান। এ সময় হাসপাতালের পেছনের একটি পুরোনো ভবন ভাঙার চেষ্টা করা হলে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, সচল উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটিকে পরিত্যক্ত দেখিয়ে জমিটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভুল বোঝানো হয়েছে।
জানা গেছে, প্রায় তিন মাস আগে জেলা পরিষদের সিইওর নেতৃত্বে একটি দল উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের জমির বিষয়ে খোঁজ নিতে উপজেলা ভূমি অফিসে যায়। প্রায় এক সপ্তাহ আগে জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সিইও জায়গাটি পরিদর্শন করেন। আজ আবার তাঁরা কেন্দ্রটিতে এসেছেন খবর পেয়ে সাংবাদিকেরা ঘটনাস্থলে গেলে তাঁদের পাওয়া যায়নি। পরে হাসপাতালের সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে দুই ভাগে রাখা বিপুল পরিমাণ নতুন ইট দেখতে পান সাংবাদিকেরা। এ ছাড়া পেছনের পুরোনো ভবনটির কিছু অংশ ভাঙা অবস্থায় দেখা যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, মার্কেট নির্মাণের জন্য এসব ইট আনা হয়েছে। এমনকি মার্কেট নির্মাণের আগেই প্রতি দোকানের (এক শাটার) দাম ৩৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন মানুষের কাছে শুনেছেন তিনি।
উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা জারকা বেগম বলেন, সকালে এসে হাসপাতালের ভেতরে শ্রমিকদের ইট আনতে দেখি। পরে জেলা পরিষদের প্রশাসক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও কয়েকজন নেতা-কর্মী সেখানে উপস্থিত হন। এ সময় পেছনের পুরোনো ভবনটি ভাঙার চেষ্টা করা হয়। তাঁর দাবি, প্রতিদিন শতাধিক রোগী ও গর্ভবতী নারী এ কেন্দ্র থেকে চিকিৎসাসেবা নেন। হাসপাতালটি আরও উন্নত করে আধুনিক চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ভৈরব উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের নামে থাকা বিএস খতিয়ান নম্বর ৪-এর ৯০১৭ দাগে প্রায় ৪৬ শতাংশ জমি স্বাস্থ্য বিভাগের নামে রেকর্ড রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিত এ জমির ভূমি উন্নয়ন করও পরিশোধ করছে। তবে সিএস খতিয়ানে জমিটি জেলা পরিষদের নামে রেকর্ড রয়েছে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এএইচএম আজিমুল হক বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছ থেকে যতটুকু জেনেছি, ২০১৯ সালে আন্তমন্ত্রণালয়ের এক সভার কার্যবিবরণীতে পরিত্যক্ত উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো জেলা পরিষদের অধীনে নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সে অনুযায়ী সচল হাসপাতালটি রেখে অবশিষ্ট জায়গা জেলা পরিষদের অধীনে নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় ছিল। তবে সেখানে মার্কেট নির্মাণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে আমাকে কিছু জানানো হয়নি।’
ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কিশোর কুমার ধর বলেন, এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত আবেদন করেছি। এ উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রতিদিন শতাধিক রোগী বহির্বিভাগের চিকিৎসাসেবা নেন। এখানে একজন মেডিকেল অফিসার, একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, একজন মিডওয়াইফ, একজন ফার্মাসিস্ট ও একজন অফিস সহায়ক কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া ভৈরব পৌরসভা এখানে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরও বলেন, হাসপাতালের অব্যবহৃত পুরোনো ভবন ভেঙে নতুন স্থাপনা নির্মাণের উদ্দেশে কিছু ইট রাখা হয়েছে বলে জেনেছি। স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্যসুরক্ষার কথা বিবেচনা করে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটিকে আধুনিক চিকিৎসাসেবার উপযোগী করে গড়ে তোলা জরুরি। পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এখানে ২০ শয্যার একটি ডায়াবেটিক হাসপাতাল স্থাপনের জন্য চেষ্টা করছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশীদ বলেন, ‘জেলা পরিষদের কর্মকর্তারা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসেছিলেন বলে শুনেছি। উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সচল রয়েছে। এ বিষয়ে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে আমাকে কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখানো হয়নি।’
কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বিষয়টি তাঁকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জেলা পরিষদের সিইও মোছা. মোস্তারি কাদেরী বলেন, ‘উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি সচল আছে। তবে অবশিষ্ট জায়গাটি আমরা নিজেরা মার্কেট করব। এখনো কাউকে লিজ দেওয়া হয়নি। কাজের জন্য ইট আনা হয়েছে। জায়গাটি স্বাস্থ্য বিভাগের নামে রেকর্ড আছে। তবে জায়গাটি দখলের অভিযোগ সত্য নয়।’
এ বিষয়ে জানতে জেলা প্রশাসক ভিপি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেলের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।









