Ajker Patrika

নারী জোগায় জ্বালানি, শাসনে পুরুষ: বিপ্লবে লৈঙ্গিক বৈষম্যের লড়াই

‘মানারা’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত কলামিস্ট ফ্রেশতা জালালজাইয়ের প্রকাশিত মতামত থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা।

জগৎপতি বর্মা, ঢাকা
নারী জোগায় জ্বালানি, শাসনে পুরুষ: বিপ্লবে লৈঙ্গিক বৈষম্যের লড়াই

মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশকের বিপ্লব ও আন্দোলনগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ এবং অবদান অনস্বীকার্য। বিক্ষোভ সংগঠিত করা, আন্দোলন টিকিয়ে রাখা এবং নৃশংস দমনপীড়ন সহ্য করার ক্ষেত্রে নারীদের শ্রম ও ভূমিকা ছিল অপরিহার্য। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হিসেবে নারীদের স্বীকৃতি মেলা ভার। বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির এক গভীর সংকটকে উন্মোচন করে, যেখানে ক্ষমতাকে প্রতীকীভাবে ‘পুরুষত্ব’ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। আর এটিই পুরুষদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের একচ্ছত্র অধিকার অক্ষুণ্ন রেখে নারীদের উত্তরাধিকারকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে।

ইরানি-আমেরিকান লেখক ও নারী অধিকারকর্মী মাসিহ আলীনেজাদ কয়েক দশক ধরে ইরানের শাসনব্যবস্থাবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ। তিনি বছরের পর বছর নারীদের সংগঠিত করেছেন এবং উন্মোচন করে দিয়েছেন রাষ্ট্রীয় সহিংসতার স্বরূপ। অথচ যখনই ইরানের আসন্ন ভবিষ্যতের কথা কল্পনা করা হয়, তখন আলীনেজাদের বদলে গুরুত্ব পান এমন একজন পুরুষ ব্যক্তিত্ব, যাঁর বৈধতা সংগ্রামের চেয়ে বরং উত্তরাধিকার কিংবা বংশগতির ওপর নির্ভরশীল। তিনি রাজপুত্র হিসেবে জন্মেছেন, আর আলীনেজাদ জন্মেছেন অতি সাধারণ একটি পরিবারে। এই বৈপরীত্যই প্রকাশ করে, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব এখনো বৈপ্লবিক শ্রমের চেয়ে পুরুষতান্ত্রিক বংশধারার সঙ্গে কতটা গভীরভাবে যুক্ত। সহজ কথায়, নারীরা শুধু বিপ্লবের জ্বালানি জোগাবে, আর পুরুষেরা করবে শাসন।

২০১১ সালে মিসরের গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ছিলেন শেলি (ছদ্মনাম)। তাঁর গল্পটি আমাদের জানিয়েছে, কীভাবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘরের ভেতরের কর্তৃত্বকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করে। শেলি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে শুরু হয় তাঁর দাম্পত্যজীবনে টানাপোড়েন। কারণ, শেলির স্বামী গণ-অভ্যুত্থানে তাঁর অংশগ্রহণকে নাগরিক দায়িত্ব নয়, বরং স্ত্রী ও মা হিসেবে নির্ধারিত লৈঙ্গিক ভিত্তিক শৃঙ্খলার অবমাননা হিসেবে দেখেছিলেন।

পেশায় আইনজীবী শেলি তাঁর জীবনের এই সংকটকে ব্যক্তিগত শত্রুতা নয়, বরং কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর মতে, কর্তৃত্বকে প্রাকৃতিকভাবে পুরুষালি বলে ধরে নেওয়া হয়, যেখানে নারীদের প্রত্যাশা করা হয় পুরুষের পেছনে থাকার জন্য। ফলে নিজের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর প্রকাশ করার মাধ্যমে শুধু সমাজের প্রচলিত নিয়মই নয়, বরং সাংসারিক নিয়মও লঙ্ঘন করেছিলেন শেলি। তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈবাহিক জীবনের অবসান ঘটে। শেলির অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ব্যক্তিগত জীবনের ঝুঁকির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। পরিবার এখানে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবে কাজ করে, যা নারীদের চলাফেরা ও কণ্ঠস্বরকে শাসন করে।

ইরানের বিশিষ্ট বামপন্থী রাজনীতিক মরিয়ম ফিরোজ, যিনি ‘ইরানের রেড প্রিন্সেস’ হিসেবে পরিচিত। এক অভিজাত কাজার রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি ১৯৪০ ও ৫০-এর দশকে কমিউনিস্ট তুদেহ পার্টিতে যোগ দিয়ে নিজের আভিজাত্য এবং রাজপরিবারের সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন একাধিক শাসকের শাসনকালজুড়ে বিস্তৃত ছিল, যেগুলোর প্রতিটিই বিপ্লবের জন্য নারীদের ওপর নির্ভর করলেও শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা পুরুষের হাতে যায়। ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান থেকে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব—প্রতিটি পরিবর্তনের পর মরিয়মের বৈপ্লবিক অবদান তাঁকে রাজনৈতিক ক্ষমতা দিতে ব্যর্থ হয়; বরং প্রতিবারই তিনি গ্রেপ্তার, নির্বাসন এবং নজরদারির শিকার হয়েছেন। ২০০৮ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি প্রান্তিক হয়েই ছিলেন।

তবে মরিয়ম ফিরোজের জীবনযাত্রা প্রমাণ করে, বৈপ্লবিক আন্দোলনগুলো নারীদের শ্রম শুষে নেয়, কিন্তু ক্ষমতা বণ্টনের সময় তাঁদের বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়।

আফগান রাজনীতিক ও অধিকারকর্মী মালালই জোয়া এই সংকটের এক জীবন্ত উদাহরণ। ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি আফগানিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিলেন। ২০০৩ সালে আফগানিস্তানের উপজাতীয় বিভিন্ন গোত্রের নেতাদের সর্বোচ্চ পরিষদ লয়া জিরগায় যুদ্ধবাজ ও যুদ্ধাপরাধীদের সরাসরি সমালোচনা করে তিনি রাতারাতি পরিচিতি পান। তালেবানের দমনপীড়নের পর আফগানিস্তানের সেই উত্তাল সময়ে জয়ার কণ্ঠস্বর ছিল বৈপ্লবিক। কিন্তু তাঁর সাহসই রাজনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ২০০৭ সালে তাঁকে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তিনি জনজীবন থেকে আড়ালে চলে যেতে বাধ্য হন।

শেলি, মালালই জোয়া, মরিয়ম ফিরোজ—এই তিন নারী মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি; যাঁদের কোনো বিশাল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ছিল না। শেলি কায়রোর তাহরির স্কয়ারে হোসনি মোবারকের পতনে ভূমিকা রেখেছিলেন। মালালই জোয়া আশির দশকে সোভিয়েত আক্রমণের সময় শরণার্থী হিসেবে বড় হয়েও পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার মূলে আঘাত করেছিলেন। আর মরিয়ম ফিরোজ তাঁর আভিজাত্য ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের কাতারে এসে নারীদের অনুপ্রেরণা হয়েছিলেন।

একইভাবে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের নারীদের অংশগ্রহণের কথা একবার ভাবুন। আর অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সেই নারীদের দেখুন। তাঁরা আজ কোথায়? আর কতজন যেতে পেরেছেন জাতীয় সংসদে?

আমেরিকান দার্শনিক জুডিথ বাটলারের মতে, লৈঙ্গিক ভিত্তিক কর্তৃত্বের নিয়মগুলো রাজনৈতিক বৈধতার কল্পনাকে এমনভাবে গঠন করে, যেখানে ক্ষমতাকে পুরুষালি এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বস্তু হিসেবে দেখা হয়। আর এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, শুধু অংশগ্রহণ বাড়ালেই ক্ষমতার পুনর্বণ্টন নিশ্চিত হয় না।

গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য নারীদের প্রতিরোধের কর্মী হিসেবে শুধু নয়, বরং ক্ষমতার বৈধ অধিকারী হিসেবেও কল্পনা করা জরুরি। তবে নেতৃত্ব এবং উত্তরাধিকারের এই পুরুষতান্ত্রিক কোড অথবা নিয়মগুলো পরিবর্তন না করলে প্রতিটি বিপ্লব শুধু পুরোনো বৈষম্যগুলোকেই নতুন করে টিকিয়ে রাখবে। পরিবর্তন কিন্তু তখনই আসবে, যখন নারীদের সেই ভবিষ্যতের অংশীদার করা হবে, যা তাঁরা নিজেরা তৈরি করতে সাহায্য করেছেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত