Ajker Patrika

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬

লৈঙ্গিক সমতা অর্জনের এক অনন্য বৈশ্বিক সুযোগ

জগৎপতি বর্মা, ঢাকা
আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৬, ১১: ১২
লৈঙ্গিক সমতা অর্জনের এক অনন্য বৈশ্বিক সুযোগ
প্রতীকী ছবি

১১ জুন থেকে শুরু হয়েছে বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬। বলা হচ্ছে, এটিই বিশ্বজুড়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি শহরে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দলের এই মহাযজ্ঞে ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। স্টেডিয়ামে প্রায় ৫০ লাখ দর্শক এবং সম্প্রচার মাধ্যমে প্রায় ৬০০ কোটি মানুষ এই আসর উপভোগ করছেন। ফিফা একা এই বিশ্বকাপ থেকে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয়ের আশা করছে।

তবে জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা ইউনাইটেড নেশন উইমেনের (ইউএন উইমেন) তথ্যমতে, কোটি কোটি মানুষকে একই সুতোয় বাঁধার এই অবিশ্বাস্য ক্ষমতার আড়ালে ফুটবল এখনো তার সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি লৈঙ্গিক সমতা অর্জনে ব্যর্থ।

ইউএন উইমেন বলছে, চলতি পুরুষ বিশ্বকাপ শুধু একটি খেলার আসর নয়; বরং বিশ্বজুড়ে নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠার এবং বৈষম্য দূর করার সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু ফিফা কি তা স্বীকার করে? কিংবা ফিফা কি লৈঙ্গিক সমতা অর্জনে কাজ করবে?

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে নারীদের মধ্যে খেলাধুলার দর্শক ও জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ২০২৩ সালের নারী ফুটবল বিশ্বকাপ প্রায় ২০০ কোটি মানুষ দেখেছে, যা ইতিহাসের যেকোনো একক নারী ক্রীড়া ইভেন্টের জন্য সর্বোচ্চ। ২০৩০ সালের মধ্যে নারী ফুটবলের দর্শকসংখ্যা ৮০ কোটি ছাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা একে বিশ্বের শীর্ষ ৫টি জনপ্রিয় খেলার একটিতে পরিণত করবে।

২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে নারীদের খেলা প্রায় ৩৯ কোটি ৭০ লাখ ঘণ্টা এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৪ হাজার ৬০০ কোটি মিনিট দেখা হয়েছে। কিন্তু এরপরও নারীদের খেলাধুলায় বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য রয়ে গেছে। যেমন বিপুল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও টেলিভিশনের প্রাইম-টাইম বা মূল সময়ে নারীদের খেলা মাত্র ৮ শতাংশ দেখানো হয়। অথচ নারীদের খেলাই মোট প্রাইম-টাইম ভিউয়ারশিপের ১৩ শতাংশ জেনারেট করে। অর্থাৎ দুর্বল অবকাঠামো সত্ত্বেও নারীদের খেলা জনপ্রিয় হচ্ছে। কিন্তু পুরুষদের খেলার একচেটিয়া মিডিয়া কাভারেজ থাকায় নারীরা বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে।

এ বছর শীর্ষ নারী ক্রীড়াবিদদের বৈশ্বিক রাজস্ব আয় ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। হিসাব বলছে, এটি ৪ বছরে রেকর্ড ৩৪০ শতাংশ বৃদ্ধি। অথচ ফোর্বসের ২০২৫ সালের বিশ্বের শীর্ষ ৫০ জন সর্বোচ্চ বেতনভোগী অ্যাথলেটের তালিকায় একজন নারীও জায়গা পাননি। এ ছাড়া ২০২৩ নারী বিশ্বকাপের প্রাইজমানি পুরুষদের কাতার বিশ্বকাপের প্রাইজমানির (৪৪০ মিলিয়ন ডলার) মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ছিল।

মজার বিষয় হলো, ৬০০ কোটি দর্শকের এই মেগা ইভেন্ট কীভাবে হবে, তা নির্ধারিত হচ্ছে এমন সব করপোরেট বোর্ডরুমে, যেখানে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নেই বললেই চলে!

এই বছরের বিশ্বকাপ ফুটবল যেহেতু মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রচারের আলোয় আছে, তাই ফুটবল কর্তৃপক্ষের উচিত, এই মঞ্চকে শুধু পুরুষদের বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার না করে, বিশ্বজুড়ে নারীদের সমান অধিকার, বেতনবৈষম্য দূরীকরণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা।

জাতিসংঘের এ বছরের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর নির্বাহী পদে মাত্র ৩২ শতাংশ নারী। ফিফার তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে নিবন্ধিত ফুটবল কোচদের মধ্যে নারী মাত্র ৫ শতাংশ। ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে নারী কোচের সংখ্যা মাত্র ১৩ শতাংশ। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক আসরের সিদ্ধান্তগুলো এমন মানুষেরা নিচ্ছেন, যাঁরা কখনোই নারী হিসেবে ফুটবল খেলেননি কিংবা কোনো নারী দলের কোচের দায়িত্ব পালন করেননি।

বিশ্বকাপের অন্ধকার দিক

ফুটবল যেমন বিশ্বকে একত্র করে, তেমনি তথ্য-উপাত্ত বলছে, এটি কোটি কোটি নারীর জন্য ঘরের ভেতরে বিপদও ডেকে আনে। বড় বড় ক্রীড়া ইভেন্টের সঙ্গে নারীদের ওপর সহিংসতা বৃদ্ধির একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ব্রাজিলিয়ান ফোরাম অন পাবলিক সেফটি এবং ইনস্টিটিউট এভনের চার বছরের তথ্য অনুযায়ী, যেদিন স্থানীয় ফুটবল ক্লাবের ম্যাচ থাকে, সেদিন নারীদের প্রতি হুমকি ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং শারীরিক নির্যাতন ২০ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রিয় দলের অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের পর নারীদের প্রতি সহিংসতা বাড়ে ১০ শতাংশ। ২০১০ সালের বিশ্বকাপ চলাকালে ইংল্যান্ডে এবং ডার্বি ম্যাচের সময় স্কটল্যান্ডে পারিবারিক সহিংসতা ৩৬ শতাংশ বাড়ার প্রমাণ পেয়েছে ইউএন উইমেন।

জেনে অবাক হবেন, একদিকে খেলা চলাকালে নারীদের ওপর সহিংসতা বাড়ছে, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে নারীদের ওপর সহিংসতা বন্ধে কাজ করা প্রতি ৩টি সংস্থার মধ্যে একটি ফান্ড সংকটে তাদের কার্যক্রম বন্ধ কিংবা স্থগিত করতে বাধ্য হচ্ছে। এ ছাড়া নারী রেফারি, কোচ ও সাংবাদিকেরাও মাঠ এবং মাঠের বাইরে নিয়মিত হেনস্তার শিকার হচ্ছেন, যা প্রতিরোধ করার কার্যকর সুরক্ষানীতি এখনো অনুপস্থিত। মজার ব্যাপার, ফিফা আবার এসব ইভেন্ট থেকে বিপুল রাজস্ব আয়ের আশা করছে।

ক্রীড়াঙ্গনে লিঙ্গবৈষম্যের কারণে বিশ্ব প্রতিদিন সম্ভাবনাময় নারী নেতৃত্ব হারাচ্ছে। ১৪ বছরের কম বয়সী কন্যাশিশুরা ছেলেদের তুলনায় দ্বিগুণ হারে খেলাধুলা থেকে ঝরে পড়ে। এর পেছনে প্রতিভা বা আগ্রহের কমতি নয়, বরং দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার, শারীরিক পরিবর্তন এবং যথোপযুক্ত

রোল মডেলের অভাব এর জন্য পুরোপুরি দায়ী। অথচ এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মেয়ে খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত, তারা দীর্ঘদিন পড়াশোনা চালিয়ে যায়, বাল্যবিবাহ কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ এড়াতে পারে এবং ভবিষ্যতে ভালো চাকরি পায়।

২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিক ছিল ইতিহাসের প্রথম সম্পূর্ণ লৈঙ্গিক সমতাপূর্ণ অলিম্পিক। ওই বছর আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) পুরুষ ও নারীদের জন্য সমানসংখ্যক (৫ হাজার ২৫০ জন করে) কোটা বরাদ্দ করে। এর ফলে মোট ১০ হাজার ৫০০ ক্রীড়াবিদ ৫০:৫০ অনুপাতে এই ক্রীড়াযজ্ঞে অংশ নিয়ে থাকেন।

অর্থাৎ এটি প্রমাণিত যে সদিচ্ছা থাকলে পরিবর্তন সম্ভব। চলতি বিশ্বকাপ ফুটবল যেহেতু মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রচারের আলোয় আছে, তাই ফুটবল কর্তৃপক্ষের উচিত, এই মঞ্চকে শুধু পুরুষদের বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার না করে, বিশ্বজুড়ে নারীদের সমান অধিকার, বেতনবৈষম্য দূরীকরণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। মাঠে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার পাশাপাশি মাঠের বাইরে বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যার জন্য সমান অধিকার এবং লৈঙ্গিক সমতা নিশ্চিত করার এই দায়বদ্ধতা ফিফা কোনোভাবে এড়াতে পারে না।

তথ্যসূত্র: ইউএন উইমেন

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত