Ajker Patrika

আলোচিত বনাম আড়ালে থাকা বিচারের সংস্কৃতি

ফিচার ডেস্ক
আলোচিত বনাম আড়ালে থাকা বিচারের সংস্কৃতি

মাগুরার নিজনান্দুয়ালী গ্রামে বড় বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল আট বছরের এক শিশু। ২০২৫ সালের ৬ মার্চ, সকালবেলা। বোনের শয়নকক্ষেই নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার শিকার হয় শিশুটি। আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল এবং পরে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় তাকে। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ মার্চ শিশুটি মারা যায়। ঘটনাটি গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের লাগাতার সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের মুখে প্রশাসন চরম তৎপরতা দেখায়। মামলা করার পর পুলিশ শিশুটির দুলাভাই, বোনের ভাশুর, শাশুড়ি, মূল অভিযুক্ত বোনের শ্বশুরসহ চারজনকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে। দেশজুড়ে প্রবল জনমত ও আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে অপরাধ সংঘটনের মাত্র ৭৩ দিন এবং বিচার শুরুর মাত্র ২৫ দিনের মাথায় মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।

ঠিক একইভাবে, এ বছর শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা স্তব্ধ করে দিয়েছিল পুরো দেশকে। ফেসবুকের নিউজফিডজুড়ে তখন শুধুই ক্ষোভ আর বিচার দাবির ঝড়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের তীব্রতা এবং বিভিন্ন সংগঠনের জোরালো দাবির মুখে রাষ্ট্র প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয় এবং শুরু হয় বিচারিক প্রক্রিয়া। একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর এবং সামাজিক দাবির মুখে রাষ্ট্রের এই দ্রুত তৎপরতা ও সক্রিয়তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

কিন্তু মাগুরার সেই অবুঝ শিশু কিংবা রামিসা হত্যাকাণ্ডের এই দ্রুত বিচার ও প্রশাসনিক স্বস্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘশ্বাস আর গভীর প্রশ্ন। যদি এই ঘটনাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভাইরাল’ না হতো কিংবা তীব্র প্রতিবাদের জন্ম না দিত, তবে কি রাষ্ট্র একই গতিতে ন্যায়বিচারের চাকা ঘোরাত? আর বিচারপ্রক্রিয়া ঠিক কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করছে এসব ঘটনাকে থামাতে?

মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) তাদের গত মে মাসের জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মনিটরিং প্রতিবেদনে এই প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত বা ভাইরাল হওয়া ঘটনাগুলোতে যদি রাষ্ট্রের এমন বেছে বেছে সক্রিয় হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, তবে প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকা হাজারো সাধারণ ভুক্তভোগী চিরতরে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে। প্রতিটি অপরাধকে সমান গুরুত্ব দিয়ে নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।

শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত বা ভাইরাল হওয়া ঘটনাগুলোতে যদি রাষ্ট্রের এমন বেছে বেছে সক্রিয় হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, তবে প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকা হাজারো সাধারণ ভুক্তভোগী চিরতরে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে।

মাগুরার সেই শিশু কিংবা রামিসা হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং তা দেশে শিশু ও নারীদের ওপর নেমে আসা এক ভয়াবহ ও কাঠামোগত যৌন সহিংসতার খণ্ডচিত্র মাত্র। এমএসএফের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছরের এপ্রিল ও মে মাসের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে নারী ও শিশু সহিংসতার মোট ঘটনা ৩১২টি থেকে বেড়ে ৩২৬টিতে দাঁড়িয়েছে। শিউরে ওঠার মতো তথ্য হলো, এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে ধর্ষণের ঘটনা প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি বেড়েছে। যেখানে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ জন নারী ও শিশু, যা এপ্রিলে ছিল ৫৪ জন। মে মাসে গণধর্ষণ বা সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৬ জন এবং ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন আরও ২৮ জন।

মে মাসে ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৬টি, যা এপ্রিল মাসের তুলনায় তিন গুণ বেশি। এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের অন্যান্য মাসের তুলনায় মে মাসে এই অপরাধের হার সবচেয়ে বেশি এবং এই সহিংসতার শিকার হওয়া প্রত্যেকেই ছিল শিশু। এর মধ্যে মাদকাসক্তের হাতে ধর্ষণের চেষ্টা বা ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে শিশুকে হত্যার মতো রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে।

শারীরিক নির্যাতন এবং সার্বিক হত্যাকাণ্ড গত মাসের তুলনায় কিছুটা কমলেও, যৌন সহিংসতার এই তীব্রতা সমাজের এক অন্ধকার দিক। এই ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট করে দেয়, আমাদের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগ এবং বিচারব্যবস্থার ভেতরে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক দুর্বলতা রয়েছে। মাগুরার শিশু বা রামিসার মতো গুটিকয়েক ঘটনায় সামাজিক আন্দোলনের চাপে রাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক সক্রিয়তা সাময়িক সান্ত্বনা দেয় বটে। কিন্তু প্রতিদিন আড়ালে থেকে যাওয়া অসংখ্য শিশু-নারীর কান্না বিচারহীনতার সংস্কৃতির নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত