Ajker Patrika

ফাতিমার মাইক্রোফোন ছিল ‘অন্যের’ ভয়ের কারণ

ফিচার ডেস্ক
ফাতিমার মাইক্রোফোন ছিল ‘অন্যের’ ভয়ের কারণ
ফাতিমা ফাতুনি। ছবি: সংগৃহীত

বাবার কাঁধে দুই সন্তানের লাশ। একজনের বয়স ৩০, অন্যজনের ২৮। এটি সম্ভবত পৃথিবীর করুণতম দৃশ্যগুলোর একটি। দুই সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে সেই পিতা বলেছেন, ‘চোখ সিক্ত এবং হৃদয় দগ্ধ। কিন্তু আমাদের মিশন চলবে। আমরা পরাজিত হব না আর ভেঙেও পড়ব না।’

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন সাংবাদিক ফাতিমা ফাতুনি এবং তাঁর ভাই আলোকচিত্রী মোহাম্মদ ফাতুনি। সন্তানদের হারানোর পর ফাতিমা ও মোহাম্মদের বাবা সংবাদমাধ্যমের সামনে কথা বলেন অত্যন্ত ধৈর্য ও গর্ব নিয়ে। তিনি ফাতিমাকে ফ্রন্টলাইনের শহীদ এবং মোহাম্মদকে তাঁর একনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করেন।

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সংবাদ সংগ্রহের কাজে যাওয়ার সময় জেজিন এলাকায় গত ২৮ মার্চ ইসরায়েলি বাহিনীর লক্ষ্যভেদী হামলার শিকার হয়ে নিহত হন তিনজন সাংবাদিক। তাঁরা হলেন আল মায়াদিন টিভির সাংবাদিক ফাতিমা ফাতুনি, তাঁর ভাই ফ্রিল্যান্স ফটোসাংবাদিক মোহাম্মদ ফাতুনি এবং আল মানার টিভির সাংবাদিক আলী শুয়েইব। আল আরাবি টিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আল মায়াদিন ও আল মানারের এই দল একটি অ্যাসাইনমেন্টে যাওয়ার পথে হামলার শিকার হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটি গাড়িতে আঘাত হানার পর ফাতিমা ফাতুনি অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন। তিনি প্রাণ বাঁচাতে গাড়ি থেকে নেমে কয়েক মিটার দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে দ্বিতীয়বার ড্রোন হামলা চালিয়ে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

ফাতিমা ফাতুনি যুদ্ধের শুরু থেকে ফ্রন্টলাইনে থেকে সংবাদ সংগ্রহ করছিলেন। এর আগে এক হামলায় অল্পের জন্য বেঁচে ফেরার পর তিনি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘হয়তো আমাদের মাইক্রোফোনই তাদের ভয়ের কারণ।’ ৩০ বছর বয়সী ফাতিমা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, শেষনিশ্বাস থাকা পর্যন্ত তাঁরা সত্য প্রকাশ করে যাবেন। দুর্ভাগ্যবশত, সেই সত্য প্রচার করতে গিয়েই তিনি ও তাঁর ভাই ২৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ ফাতুনি প্রাণ হারান। সংবাদকর্মীদের ওপর প্রথম হামলার পর উদ্ধারকারীদের ওপর দ্বিতীয়বার হামলা চালানো হয়। এই ‘ডাবল ট্যাপ’ কৌশলের শিকারে পরিণত হয়ে প্যারামেডিক আহমদ আনিসি এবং মোহাম্মদ দাহের নিহত হন। এটি আন্তর্জাতিকভাবে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে; কারণ, এখানে সরাসরি ত্রাণ ও চিকিৎসাকর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।

আল মায়াদিনে ফাতিমার একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে তিনি বলছিলেন, ‘দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী আমাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করতে পারে, আমাদের শরীরকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে। কিন্তু আমাদের আদর্শ আর আমাদের কণ্ঠ তারা স্তব্ধ করতে পারবে না। আমরা লড়াই চালিয়ে যাব। কলম দিয়ে, ক্যামেরা দিয়ে এবং আমাদের শেষনিশ্বাস দিয়ে।’ ফাতিমা ফাতুনি তাঁর বার্তায় মূলত প্রতিরোধ, শহীদ নেতাদের আদর্শ আর লেবাননের মাটির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন সব সময়। তিনি মাথা উঁচু করে বলেছিলেন, ‘আমরা ভয় পাই না। কারণ, আমরা জানি, সত্য আমাদের সঙ্গে আছে।’ ফাতিমার কণ্ঠে ছিল এক অটল বিশ্বাস। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সত্যের জয় হবেই এবং যারা অন্যায়ভাবে ভূমি দখল করে আছে, তাদের বিদায় নিতে হবে।

গত মাসে ফাতিমা তাঁর পরিবারের সাতজন সদস্য হারিয়েছিলেন। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে থাকা তাঁর সেই আত্মীয়দের ছবি এক সপ্তাহ আগে ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করে তিনি লিখেছিলেন, ‘দ্য ফেস অব আ ট্রাভেলার ডে, আ স্মাইলিং স্মাইল, আ গুড টাইডিংস’। যুদ্ধক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ওপর এ ধরনের লক্ষ্যভেদী হামলা শুধু ব্যক্তির ক্ষতি নয়, এটি তথ্যের অবাধ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা। ফাতিমা ফাতুনি এবং তাঁর সহকর্মীদের এই আত্মত্যাগ সাংবাদিকতার ইতিহাসে সত্যের সপক্ষে সাহসী অধ্যায় হয়ে থাকবে।

ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) এই হামলার দায় স্বীকার করে নিয়েছে। তাদের আরবি মুখপাত্র আভিচাই আদ্রায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দাবি করেছেন, আলী শুয়েইব হিজবুল্লাহর রাদওয়ান ফোর্সের সদস্য ছিলেন এবং সাংবাদিকতার আড়ালে তিনি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। তবে এই অভিযোগের সপক্ষে তথ্য-প্রমাণ চাওয়া হলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে পারেনি।

সূত্র: কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস এবং ফাতিমা ফাতুনির ইনস্টাগ্রাম পোস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত