
জীবনে বহুবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন জান্নাতি হোসেন। আর অদ্ভুতভাবে প্রায় প্রতিবারই পানির ভেতর। শুরুটা শৈশবে। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় শীতের ছুটিতে শরীয়তপুরের গ্রামের বাড়ি। সাঁতার না জেনেই নেমে পড়েছিলেন কীর্তিনাশা নদীতে। কয়েক মুহূর্তেই গভীর পানির টানে তলিয়ে যেতে থাকেন। ছোট্ট জান্নাতিকে সেদিন মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনেন তাঁর চাচা। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও পানি যেন তাঁকে ছাড়েনি; বরং বারবার টেনে নিয়েছে নিজের দিকে। যে পানি একদিন তাঁর জীবনের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল, আজ সেই পানির গভীরেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন নিজের ঠিকানা।
আজকের জান্নাতি—বাংলাদেশের প্রথম পেশাদার নারী স্কুবা ডাইভারদের একজন। তিনি সাগরতলের অজানা জগতের এক নির্ভীক অনুসন্ধানী। ঢাকায় বেড়ে ওঠা জান্নাতি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন আলাদা। তিন ভাই-বোনের মধ্যে বড়। ছোটবেলা থেকে তাঁর কৌতূহল ছিল সীমাহীন। কৈশোরে সাইকেল নিয়ে নিজের পুরো এলাকা চষে বেড়ানো ছিল নেশা। কিন্তু এক প্রতিবেশী মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার পর পরিবারের কড়াকড়ি—সাইকেল চালানো বন্ধ।
অনেকে হয়তো থেমে যেত, কিন্তু জান্নাতি থামার মানুষ নন। স্কুলে আনা-নেওয়ার দায়িত্বে থাকা চাচার কাছ থেকে শিখে ফেললেন ড্রাইভিং। সেখান থেকেই জন্ম নেয় গতির প্রতি এক অন্য রকম টান। কিন্তু ঢাকার যানজটে সেই গতির আনন্দ হারিয়ে যেতে থাকল। তিনি খুঁজতে থাকেন আরও বড়, আরও মুক্ত এক জগৎ—জ্যামহীন, সীমাহীন, গভীর নীল সমুদ্র।

এ-লেভেলের পর চার বছর ফটোগ্রাফি বিষয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। ১৮ বছর বয়সের মধ্যে আয়ত্ত করেন সাতটি ভাষা; পাশাপাশি চালিয়েছেন ফটোগ্রাফি ও গাড়ি মডিফিকেশনের ব্যবসা, এমনকি এক বছর শিক্ষকতাও করেছেন। পরে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন। জীবনে ব্যর্থতাও এসেছে—ব্যবসায় লোকসান, কোভিড-১৯-এর ধাক্কা। কিন্তু এর কিছুই তাঁকে ভাঙতে পারেনি; বরং নতুন করে পথ দেখিয়েছে—স্কুবা ডাইভিং।
জলের নিচে জান্নাতির যাত্রা শুরু সেন্ট মার্টিন দ্বীপে। প্রথমে মেরিন কনজারভেশন কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া—আন্ডারওয়াটার ক্লিনআপ, কচ্ছপ সংরক্ষণ। ধীরে ধীরে সমুদ্র আর তার গভীরের প্রাণবৈচিত্র্য তাঁকে টানতে শুরু করে অদ্ভুত এক আকর্ষণে। শুধু তা-ই নয়। একটি মেরিন কনজারভেশন অর্গানাইজেশনে প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর ও পাবলিক রিলেশন ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেন তিনি। কাগজ-কলমে দায়িত্বের বাইরে গিয়ে নিজেই নেমে পড়েন মাঠে—পানির নিচে, বাস্তব কাজের ভেতর। এরপর পাড়ি দেন মালয়েশিয়ায়। সেখানে শেষ করেন ওপেন ওয়াটার ও অ্যাডভান্সড ওপেন ওয়াটার স্কুবা কোর্স। রেসকিউ ডাইভিংয়ের আগে অর্জন করেন ইমার্জেন্সি ফার্স্ট রেসপন্স (ইএফআর) সনদ।

কিন্তু আসল বদলটা আসে এক রাতের ডাইভে। চারপাশে নিস্তব্ধ অন্ধকার। হাতে শুধু একটি টর্চ। আলো ফেলতেই অজানা এক জগৎ খুলে যায়—স্কুইড, কাঁকড়া, ইলসহ অদ্ভুত সব নিশাচর প্রাণী। ভয় আর বিস্ময়ের সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে জান্নাতি বুঝে যান—এটাই তাঁর জগৎ। সেই থেকে রাতের ডাইভই তাঁর প্রিয়।
দুই মাসের কঠিন প্রশিক্ষণ, লিখিত পরীক্ষা—সব পেরিয়ে অর্জন করেন ডাইভ মাস্টার সনদ। দেশের প্রথম নারী হিসেবে এই অর্জন জান্নাতিকে এনে দেয় এক অনন্য পরিচয়। তবে এই জগৎ শুধু রোমাঞ্চের নয়, ঝুঁকিও কম নয়। একবার ডাইভ মাস্টার ট্রেনিংয়ের সময় এক প্রবীণ নারী ডাইভারের দুর্ঘটনা তাঁকে নাড়িয়ে দেয় ভেতর থেকে। নির্ধারিত সময়ের বেশি ডাইভ করায় পানির নিচেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। দ্রুত তাঁকে হাইপারবারিক চেম্বারে নিতে হয়। সেদিন জান্নাতি শিখে গিয়েছিলেন, সমুদ্র কখনোই ভুল ক্ষমা করে না। তাই তাঁর কাছে স্কুবা ডাইভিং মানে শুধু অ্যাডভেঞ্চার নয়, বরং শৃঙ্খলা, দায়িত্ব আর নিরাপত্তার এক কঠোর পাঠ।

এখন জান্নাতি স্কুবা ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করছেন, যা ডাইভ মাস্টারের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে। আগে ডাইভ মাস্টার হিসেবে তিনি ডাইভে গাইড করার দায়িত্ব পালন করতেন, আর এখন ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নতুন ডাইভারদের সনদ দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
একসময় গাড়ি নিয়ে ‘টর্ক’ নামে ম্যাগাজিন প্রকাশ করতেন জান্নাতি। এখন সেটি বন্ধ থাকলেও ভবিষ্যতে স্কুবা ডাইভিং নিয়ে একটি বিশেষায়িত ম্যাগাজিন প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ‘উর্বীরুহ’ নামে একটি কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের জন্য কাজ করছেন।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন আরও বড়—নিজস্ব একটি ডাইভ সেন্টার গড়ে তোলা। আর জান্নাতি ডুব দিতে চান অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, রেড সি কিংবা ক্যারিবিয়ানের বোনায়ার দ্বীপের মতো বিশ্বের সেরা কিছু ডাইভ স্পটে। জীবনের এত ঝুঁকির মুখোমুখি হয়ে আজ তিনি নিশ্চিত এক সত্যে—
‘সমুদ্র আমাকে শিখিয়েছে—গভীরে নামলে ভয় নয়, সম্ভাবনাই জেগে ওঠে।’

ধর্ষণ মামলায় আপিল পর্যায়ে আসামির জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী, তাঁর পরিবার ও মামলার সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট। একই সঙ্গে জামিনে মুক্তির পর ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হুমকির অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার...
১ দিন আগে
১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসের এক তপ্ত দুপুর। ৯ বছরের ছোট একটি মেয়ে বাড়ির দোতলার জানালায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। একটু আগেই এয়ার রেইড সাইরেন বেজে উঠেছিল। তাই মার্কিন যুদ্ধবিমান দেখার কৌতূহলে জানালার বাইরে চোখ রাখতেই বাতাসে ভেসে থাকা একটি প্যারাস্যুট আর চোখধাঁধানো...
৩ দিন আগে
র্যাচেল লুইস স্নাইডার তাঁর ‘নো ভিজিবল ব্রিসেস’ বইয়ের সূচনায় লিখেছেন, ‘আমরা একে পারিবারিক সহিংসতা বলি। আমরা একে ব্যক্তিগত সহিংসতা বলি। কখনো কখনো একে ঘনিষ্ঠ সন্ত্রাসও বলি। কিন্তু যা-ই বলি না কেন, আমরা সাধারণত বিশ্বাস করি না এর সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক আছে।’ এই কথাই আমাদের আরামদায়ক...
৩ দিন আগে
দূর থেকে দেখলে মনে হবে ছোট্ট একটি কারখানায় কাঠের কাজ চলছে। একটু কাছে গেলে চোখে পড়ে ভিন্ন দৃশ্য। কোথাও বাবলা কাঠের কাঠামো তৈরি হচ্ছে, কোথাও সেই কাঠামোর সঙ্গে টিস্যু দড়ি বুনে দেওয়া হচ্ছে। কেউ ব্যস্ত খাট তৈরিতে, কেউ টুল আবার কেউ তৈরি করছেন দোলনা, ছোটদের পড়ার টেবিল-চেয়ার কিংবা সোফা।
৩ দিন আগে