Ajker Patrika

ফুড ডেলিভারির ফাঁকে লিখতেন কবিতা, জিতলেন চীনের শীর্ষ সাহিত্য পুরস্কার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ফুড ডেলিভারির ফাঁকে লিখতেন কবিতা, জিতলেন চীনের শীর্ষ সাহিত্য পুরস্কার
জিবিংয়ের কবিতার সংকলন ‘লো ফ্লাইট’ পেয়েছে চীনের বিখ্যাত ‘লু শুও সাহিত্য পুরস্কার’। ছবি: সিনহুয়া।

৫৬ বছর বয়সী ওয়াং জিবিং চীনের জিয়াংসু প্রদেশের বাসিন্দা। জীবিকা নির্বাহ করেন ফুড ডেলিভারি রাইডার হিসেবে। আর এরই মাঝে নিজের প্রতিভাকে ধরে রেখে এবার সম্মানিত হলেন দেশের কাছে। খাবার সরবরাহের ফাঁকে ফাঁকে ছোট্ট ছোট্ট কাগজে লেখা কবিতা তাঁকে এনে দিয়েছে চীনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য সম্মাননা।

ডেলিভারি রাইডারদের দৈনন্দিন সংগ্রাম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা জিবিংয়ের কবিতার সংকলন ‘লো ফ্লাইট’ পেয়েছে চীনের বিখ্যাত ‘লু শুও সাহিত্য পুরস্কার’। আধুনিক চীনা সাহিত্যের জনক হিসেবে পরিচিত লেখক লু শুওয়ের নামানুসারে এই পুরস্কারের নামকরণ করা হয়েছে।

ওয়াং জিবিং ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে তাঁর লেখা কবিতা ও নিবন্ধ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

ওয়াং চীনের সেই ক্রমবর্ধমান নীলরঙা পোশাকের শ্রমিকদের একজন, যাঁদের নিয়ে লেখা সাহিত্যকর্ম সম্প্রতি ব্যাপক প্রশংসা কুড়াচ্ছে। এসব লেখায় চীনের বিশাল গিগ অর্থনীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার এক বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে।

এই মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ার পথটি ওয়াংয়ের জন্য সহজ ছিল না। এর পেছনে রয়েছে টানা কয়েক দশকের দীর্ঘ সংগ্রাম।

গত ১৫ জুলাই এই পুরস্কার প্রাপ্তির খবর পান জিবিং। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওয়াং বলেন, ‘আমি যেন দম আটকে ছিলাম। ভীষণ নার্ভাস লাগছিল... ফল ঘোষণার পর সবকিছু যেন স্থির হয়ে গেল।’

প্রচারমাধ্যমের বিপুল মনোযোগও বেশ মানসিক চাপ তৈরি করেছিল বলে জানান তিনি।

লু শুও সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ীদের পুরস্কারের অর্থমূল্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয় না। তবে ২০১৪ সালের তথ্য অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ ছিল ১ লাখ চীনা ইউয়ান (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ লাখ ১৭ হাজার টাকা)।

পারিবারিক আর্থিক অনটনের কারণে কৈশোরেই লেখাপড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হন ওয়াং। ফুড ডেলিভারির কাজ শুরুর আগে তিনি নির্মাণশ্রমিক, বর্জ্য কুড়ানো থেকে শুরু করে ফুটপাতে ফেরিওয়ালার কাজসহ নানা ধরনের পেশায় যুক্ত ছিলেন।

তবে পড়াশোনার প্রতি তাঁর ভালোবাসা কখনো কমেনি। গত এক দশক ধরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের লেখা কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশ করে আসছেন।

২০২২ সালে তাঁর লেখা ‘ম্যান ইন অ্যা হারি’ (ব্যস্ত মানুষ) শিরোনামের একটি কবিতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। কবিতাটি ২০১৯ সালের একটি বাস্তব ঘটনার অনুপ্রেরণায় লেখা। সে সময় একজন ক্রেতা ভুল ঠিকানা দেওয়ায় একটি খাবার পৌঁছে দিতে তাঁকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল।

পরবর্তীতে ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতা সংকলন ‘ম্যান ইন অ্যা হারি: পোয়েমস অব আ ফুড ডেলিভারি রাইডার’।

পুরস্কার জয়ের পরও চাকরি ছাড়ার কোনো ইচ্ছা নেই বলে গ্লোবাল টাইমস–কে জানান ওয়াং। তিনি বলেন, ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত এ কাজ চালিয়ে যেতে চান।

তিনি বলেন, ‘এখন আর জীবিকা নির্বাহের জন্য এই কাজের ওপর আমার নির্ভর করতে হয় না। কিন্তু এই কাজের পরিবেশ আমার ভালো লাগে। এটি আমাকে শারীরিকভাবে সুস্থ রাখে। আমি মাটির কাছাকাছি একটি জীবন চাই। এই পুরস্কার কখনোই আমাকে বদলে দেবে না।’

২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘লো ফ্লাইট’ গ্রন্থটি মূলত ২০০ জনেরও বেশি ডেলিভারি রাইডারের সাক্ষাৎকার ও তাঁদের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে লেখা কবিতার সংকলন।

তাঁর একটি কবিতায় লেখা হয়েছে, ‘ডানা মেলে ওড়া মানেই কি উঁচুতে ওড়া? নিচ দিয়ে ওড়াও তো এক ধরনের ওড়া।’

চীনে গত কয়েক বছরে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সাহিত্যজগতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নেওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, ওয়াংয়ের এই জয় তারই একটি উদাহরণ।

২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘লো ফ্লাইট’ গ্রন্থটি প্রায় ২০০ জন ডেলিভারি রাইডারের সাক্ষাৎকার ও তাঁদের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে লেখা কবিতার সংকলন।

ওয়াংয়ের এই সাফল্য এমন এক সময়ে এলো, যখন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের ক্রমবর্ধমান সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ সাহিত্যজগতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন।

সাবেক কুরিয়ার কর্মী হু অ্যানইয়ানের লেখা স্মৃতিচারণমূলক বই ‘আই ডেলিভার পার্সেলস ইন বেইজিং’ (আমি বেইজিংয়ে পার্সেল পৌঁছে দিই) ২০২৩ সালে চীনে সেরা বিক্রেতার তালিকার শীর্ষে জায়গা করে নেয় এবং দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও নজর কাড়ে। গত বছর বইটির ইংরেজি অনুবাদও প্রকাশিত হয়।

এর আগে ২০১৭ সালে এক প্রবাসী শ্রমিকের জীবনের গল্প নিয়ে লেখা আত্মজৈবনিক নিবন্ধ ‘আই অ্যাম ফ্যান ইউসু’ চীনের সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। লেখাটি নিয়ে প্রতিক্রিয়া এতই তীব্র ছিল যে, প্রচারমাধ্যমের ক্রমাগত চাপ এড়াতে ফ্যানকে সাময়িকভাবে ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে পর্যন্ত যেতে হয়েছিল।

যে বিখ্যাত সাহিত্যিকের নামে এই পুরস্কারের নামকরণ করা হয়েছে, সেই লু শুওকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চীনা লেখক হিসেবে গণ্য করা হয়। ব্যাঙ্গাত্মক উপন্যাসের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী চীনা সমাজের কঠোর সমালোচনা করার জন্য তিনি বিশেষভাবে সমাদৃত।

দীর্ঘদিন ধরে চীনা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত লু শুওর সাহিত্যকর্ম আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছেও নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কয়েক বছর আগে তাঁর এক উপন্যাসের চরিত্র ‘কং ইজি’ ইন্টারনেটে একটি জনপ্রিয় ‘মিম’-এ পরিণত হয়েছিল, যা কর্মসংস্থানের সংকটে ভোগা চীনা তরুণদের চরম হতাশার প্রতীক হয়ে ওঠে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত