Ajker Patrika

২০০০ অন্তর্বাস ও ১২ হাজার টি-ব্যাগ পুঁতলেন গবেষকেরা, যে ফল পেলেন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ৪৭
২০০০ অন্তর্বাস ও ১২ হাজার টি-ব্যাগ পুঁতলেন গবেষকেরা, যে ফল পেলেন
মাটির স্বাস্থ্য বোঝার জন্য গবেষকেরা ২ হাজারের বেশি অন্তর্বাস পুতে গবেষণা করেছেন। ছবি: সংগৃহীত

মাটির স্বাস্থ্য কতটা ভালো, তা বোঝার জন্য অদ্ভুত এক পদ্ধতি বেছে নিয়েছিলেন সুইজারল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা। দেশটির বিভিন্ন বাগান, তৃণভূমি, কৃষিজমি ও লনে দুই হাজারের বেশি জোড়া তুলার অন্তর্বাস পুঁতে রাখা হয়েছিল। দুই মাস পর সেগুলো তুলে পরীক্ষা করে মাটির জীববৈচিত্র্য ও জৈবিক কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হয়।

বিজ্ঞান বিষয়ক সংবাদমাধ্যম সায়েন্সঅ্যালার্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুনতে লুকোচুরি খেলার মতো মনে হলেও এর পেছনে ছিল গুরুতর বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য। গবেষকদের লক্ষ্য ছিল মাটির অবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা। ‘প্রুফ বাই আন্ডারপ্যান্টস’ নামের এই প্রকল্পের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ‘প্ল্যান্টস, পিপল, প্ল্যানেট’ জার্নালে।

গবেষকেরা দেখেছেন, মাটির নিচে দুই মাস থাকার পর কিছু অন্তর্বাস প্রায় পুরোপুরি পচে গিয়ে শুধু সেলাইয়ের অংশটুকু অবশিষ্ট রয়েছে। আবার কিছু অন্তর্বাসে মাত্র এক-দুটি ছিদ্র তৈরি হয়েছে। অন্তর্বাস কতটা পচেছে, তা মাটিতে থাকা কেঁচো, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য জীবের জৈবিক কর্মকাণ্ডের একটি সহজ সূচক হিসেবে ব্যবহার করা যায় বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে তারা ‘আন্ডারপ্যান্টস ইনডেক্স’ বা ‘অন্তর্বাস সূচক’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। গবেষকদের মতে, মাটির নিচে পুঁতে রাখা অন্তর্বাসে খুব কম ছিদ্র হওয়া বা প্রায় অক্ষত থাকা মাটিতে পুষ্টি ও জৈবিক কার্যক্রমের ঘাটতির ইঙ্গিত দিতে পারে। অর্থাৎ অন্তর্বাস যত বেশি পচবে, সাধারণভাবে সেখানে মাটির জীববৈজ্ঞানিক কার্যক্রম তত বেশি থাকার সম্ভাবনা।

গবেষণাপত্রের লেখকেরা বলেন, অন্তর্বাস একটি সহজ ও সহজে বোঝা যায় এমন উপকরণ। এর মাধ্যমে মাটির অবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও মাটির গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব।

গবেষকদের মতে, আমাদের পায়ের নিচের উপরিভাগের মাটি বা টপসয়েল পৃথিবীর মানুষের খাবারের প্রায় ৯৫ শতাংশ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি একই সঙ্গে বিশ্বের জীববৈচিত্র্যের প্রায় ৫৯ শতাংশের আবাসস্থল। সমুদ্রের পর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্বন ভাণ্ডারও এই মাটি।

তাই উর্বর ও স্বাস্থ্যকর মাটি নষ্ট হয়ে গেলে শুধু কৃষি নয়, পুরো মানবসমাজের ভিত্তিই হুমকির মুখে পড়বে। গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, মাটি দ্রুত অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য এবং পৃথিবীর পরিবেশব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়ছে। কিন্তু বৃহত্তর সমাজে এই হুমকি এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। ফলে মাটি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

জমির ব্যবহারেই বড় পার্থক্য

গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তর্বাস কত দ্রুত পচবে, তা নির্ধারণে জমি কীভাবে ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা করা হয়—সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুইজারল্যান্ডের লন, কৃষিজমি ও তৃণভূমিতে জৈবিক কার্যক্রমের সবচেয়ে কম চিহ্ন পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বাড়ি ও ভবনের চারপাশে থাকা একই ধরনের ঘাসের বিস্তীর্ণ জমি বা ঘাসের একক চাষে সবচেয়ে কম উর্বর মাটি পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, ব্যক্তিগত বাগানে মাটির জৈবিক কার্যক্রম ছিল সবচেয়ে বেশি। এসব জায়গায় কেঁচো, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য মাটিতে বসবাসকারী জীব বেশি সক্রিয় ছিল। ব্যক্তিগত বাগানের মাটিতে জৈব কার্বন ও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের পরিমাণও বেশি পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, এর একটি কারণ হতে পারে এসব বাগানের নিয়মিত পরিচর্যা। মালিকেরা সেখানে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগান, সার দেন এবং মাটি আলগা করে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করেন।

দুই মাস মাটির নিচে থাকার পর ব্যক্তিগত বাগানে পুঁতে রাখা তুলার প্রায় ৫৮ শতাংশ পচে যায়। বিপরীতে লনে পচনের হার ছিল সবচেয়ে কম, গড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ। জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিজ্ঞানী ও গবেষণার সহ-প্রধান মার্সেল ভ্যান ডার হেইডেন বলেন, মাটি কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, তা মাটির জীবজগৎ ও গুণমান উভয়ের ওপরই বড় প্রভাব ফেলে। তাঁর মতে, উর্বরতা, পুষ্টির পুনঃচক্রায়ন এবং অন্যান্য পরিবেশগত সেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যকর ও জৈবিকভাবে সক্রিয় মাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু অন্তর্বাস নয়, পুঁতেছিল ১২ হাজার চায়ের ব্যাগও

মাটির স্বাস্থ্য পরিমাপের জন্য এর আগেও চায়ের ব্যাগ ও তুলার স্ট্রিপ ব্যবহার করা হয়েছে। তবে সুইজারল্যান্ডের গবেষকদের মতে, অন্তর্বাস মানুষের কাছে বিষয়টি আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। তাদের ভাষায়, এটি তুলনামূলকভাবে বেশি ‘ক্রীড়ামোদি’ এবং মানুষের কাছে বিজ্ঞানকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি চমৎকার উপকরণ।

এই অন্তর্বাস পরীক্ষা অবশ্য পাঁচ বছর আগেই শুরু হয়েছিল। এতে প্রায় ১ হাজার স্বেচ্ছাসেবী অংশ নেন। তাঁরা দেশের বিভিন্ন ধরনের ভূদৃশ্যে তুলার অন্তর্বাসের পাশাপাশি মোট ১২ হাজার চায়ের ব্যাগ মাটির নিচে পুঁতে দেন। দুই মাস পর সেগুলো তুলে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। অন্তর্বাস ও চায়ের ব্যাগ উভয় পরীক্ষাতেই প্রায় একই ফল পাওয়া যায়। দুটিই সবচেয়ে দ্রুত পচেছে ব্যক্তিগত বাগানে।

হাঙ্গেরিতে সম্প্রতি পরিচালিত আরেকটি নাগরিক বিজ্ঞান গবেষণার ফলাফলের সঙ্গেও এই ফলাফল মিলে গেছে। সেখানেও দেখা যায়, পরিচর্যা করা কিচেন গার্ডেন বা পারিবারিক সবজি-বাগানে অন্তর্বাস তুলনামূলক দ্রুত পচে যায়।

বেশি উর্বর মানেই বেশি স্বাস্থ্যকর নয়

তবে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও রয়েছে। ব্যক্তিগত বাগানের মাটিতে পুষ্টি ও জৈবিক কার্যক্রম বেশি থাকলেও, বেশি উর্বর মাটি সবসময় বেশি স্বাস্থ্যকর হবে এমন নয়। সুইজারল্যান্ডের ব্যক্তিগত বাগানগুলোর মাটিতে ফসফরাস, নাইট্রোজেন ও পটাশিয়ামের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, এর অন্যতম কারণ সার ব্যবহার।

বিশেষ করে ফসফরাসের মাত্রা অনেক ব্যক্তিগত বাগানে মাটি ব্যবস্থাপনা ও ফসল উৎপাদনের জন্য নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি ছিল। অতিরিক্ত ফসফরাস আশপাশের জলপথ ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গবেষণার আরেক সহ-প্রধান এবং জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিজ্ঞানী ফ্রাঞ্জ বেন্ডার বলেন, সব ধরনের বাস্তুতন্ত্রে সর্বোচ্চ মাত্রার পচন কাম্য নয়।

তাঁর ব্যাখ্যা, বনাঞ্চলের মতো প্রায়-প্রাকৃতিক পরিবেশে মাটিতে অতিরিক্ত পুষ্টি পাওয়া গেলে তা প্রাকৃতিক পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে। এমনকি বাগানেও অন্তর্বাস দ্রুত পচে যাওয়া কখনও কখনও অতিরিক্ত পুষ্টি সরবরাহের লক্ষণ হতে পারে।

‘আন্ডারপ্যান্টস ইনডেক্স’ কতটা কার্যকর?

ফলে ‘আন্ডারপ্যান্টস ইনডেক্স’ দিয়ে কোনো মাটি কতটা উর্বর, তার একটি ধারণা পাওয়া গেলেও সেটি দিয়ে কোন মাটি সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। এ জন্য মাটিতে সরাসরি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন হবে।

তবে গবেষকদের মতে, এই নাগরিক বিজ্ঞান প্রকল্প ইতোমধ্যে সুইজারল্যান্ডে মাটির জীবজগৎ সম্পর্কে অন্যতম বিস্তৃত তথ্যভাণ্ডার তৈরি করেছে। ফ্রাঞ্জ বেন্ডার বলেন, এটি তার বৈজ্ঞানিক জীবনের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন, আবার একই সঙ্গে সবচেয়ে পুরস্কৃত অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।

গবেষকদের আশা, এই গবেষণার তথ্য ভবিষ্যতে এমন মাটি শনাক্ত করতে সাহায্য করবে, যেগুলোর আরও বেশি যত্ন ও সহায়তা প্রয়োজন। আর কে জানে, ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও হয়তো মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মাটির নিচে পুঁতে রাখা হবে হাজার হাজার অন্তর্বাস। মানুষের হাতে বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার উপকরণের যে কোনো অভাব নেই, সেটিই বোধহয় এর সবচেয়ে অদ্ভুত প্রমাণ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত