Ajker Patrika

তথ্য ব্যবহারে মিথ্যাচার, মেটাকে ২৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
তথ্য ব্যবহারে মিথ্যাচার, মেটাকে ২৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা
ফাইল ছবি

এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় অঙ্কের জরিমানার মুখোমুখি হলো ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা। গত বুধবার মার্ক জাকারবার্গের এই প্রতিষ্ঠানটিকে ২৫ বিলিয়ন ডলার (২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার) জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত।

চলতি বছরের শুরুতে দুই সপ্তাহের বিচার শেষে জুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এ রায় দেওয়া হয়। রায়ে বলা হয়, ফেসবুক ব্যবহারকারীদের তথ্য কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়, তা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে জনসাধারণের কাছে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে মেটা।

বিচারক বলেন, ‘মিথ্যাচার শুধু ফেসবুকের তথ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।’ তাঁর ভাষায়, এসব মিথ্যা ‘ফেসবুকের মূল ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত বিস্তৃত’।

মেটার প্রধান আইনজীবী সি জে মাহোনি বলেন, এই রায়ের ফলে নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা পরিচালনা করা ‘প্রায় অসম্ভব’ হয়ে পড়েছে। মেটা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে। মাহোনির দাবি, আপিলে প্রতিষ্ঠানটি জয়ী হবে।

মেটার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত আরোপ করা জরিমানার মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড়। চলতি বছর আরও কয়েকটি মামলায় প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করা হয়েছে অথবা মামলা নিষ্পত্তিতে সমঝোতা করতে হয়েছে। এর মধ্যে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার সঙ্গে ১৮ বিলিয়ন ডলারের একটি সমঝোতাও রয়েছে।

নিউ মেক্সিকোর মামলাটির সূত্রপাত ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারিতে। সে সময় মেটা ফেসবুক নামেই ব্যবসা পরিচালনা করত। রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা ফেসবুকের লাখ লাখ ব্যবহারকারীর তথ্য কাজে লাগিয়েছিল। ২০১৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-সংক্রান্ত কাজেও এসব তথ্য ব্যবহার করা হয়। ওই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

নিউ মেক্সিকো কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, বিদ্বেষমূলক বক্তব্যসংবলিত কনটেন্ট থেকে মেটা কীভাবে লাভবান হয় এবং এ ধরনের বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির নীতিমালা কীভাবে কার্যকর করা হয়, সে বিষয়েও জনসাধারণকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। জুরি বোর্ড এ অভিযোগেও মেটাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে।

তবে মেটা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মাহোনি বলেন, ‘মূলত এই মামলার লক্ষ্য হলো, মানুষ অনলাইনে কী বলতে পারবে, সে বিষয়ে নতুন নিয়ম কার্যকর করতে বক্তব্যের ওপর কর আরোপ করা।’

নিউ মেক্সিকোর আইনজীবীরা মেটার বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহীদের দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যকে মামলার ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। এসব বক্তব্যে বলা হয়েছিল, ব্যবহারকারীর অনুমতি ছাড়া তাঁদের তথ্য কখনো তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে ভাগাভাগি করা হয় না এবং তৃতীয় পক্ষ এসব তথ্যে প্রবেশও করতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে এর বিপরীত ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।

আইনজীবীদের দাবি, ব্যবহারকারীদের তথ্য নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নিয়ে মেটার অসততার কারণে অঙ্গরাজ্যটির প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। জুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মেটা অঙ্গরাজ্যের আইন ৪ কোটিরও বেশি বার লঙ্ঘন করেছে।

নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেজ বুধবার বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেছে, যেন তাদের আকার ও প্রভাব তাদের আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছে। আজকের এই রায় স্পষ্ট করে দিয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠানই এতটা ক্ষমতাবান নয় যে তাকে জবাবদিহির আওতার বাইরে রাখা যাবে।’

মেটার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৪০ বিলিয়ন ডলার জরিমানা চেয়েছিলেন অঙ্গরাজ্যটির আইনজীবীরা। অন্যদিকে মেটার যুক্তি ছিল, ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি জরিমানা আরোপ করা হলে তা হবে অসাংবিধানিক।

বুধবারের রায়ে বিচারক ফ্রান্সিস ম্যাথিউ মেটাকে জরিমানা করার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নেন। তিনি এমন অঙ্কের জরিমানা নির্ধারণ করেন, যা প্রতিষ্ঠানটির প্রতি প্রান্তিকের মুনাফার কাছাকাছি।

বিচারক বলেন, ফেসবুক ব্যবহারকারীদের তথ্য কীভাবে ব্যবহার ও ভাগাভাগি করা হয়েছে, তা নিয়ে আইন লঙ্ঘন এবং জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার ঘটনাগুলো ছিল ‘ইচ্ছাকৃত’। ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১১ বছরেরও বেশি সময় ধরে এসব ঘটনা ঘটেছে।

বিচারক ম্যাথিউ তাঁর আদেশে লেখেন, মেটার জ্যেষ্ঠ নির্বাহীদের মধ্যে যোগাযোগের বিভিন্ন নথি ‘জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল’।

অঙ্গরাজ্যের আইন হাজার হাজার বার লঙ্ঘনের ভিত্তিতে মেটার বিরুদ্ধে মোট জরিমানার অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়েছিল ২১৯ বিলিয়ন ডলার। তবে বিচারক সেই অঙ্ক কমিয়ে ২৫ বিলিয়ন ডলার করেন।

এর আগে ২০১৯ সালে ব্যবহারকারীদের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে মেটার কার্যক্রম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন প্রতিষ্ঠানটিকে ৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছিল।

আদালতে মেটার বিরুদ্ধে নিউ মেক্সিকো অন্যতম সোচ্চার প্রতিপক্ষ। চলতি বছর শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলো কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগেও অঙ্গরাজ্যটি মেটাকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছে।

ওই মামলার বিচারক শেষ পর্যন্ত শিশুদের মানসিক ক্ষতি ও যৌন শোষণের সঙ্গে মেটার কার্যক্রমের তুলনা করেছিলেন শিল্পকারখানা থেকে বায়ুদূষণের সঙ্গে। তাঁর ভাষায়, মেটার ক্ষেত্রে দূষণের ধরন হলো ‘শিশুদের মানসিক ক্ষতি ও যৌন শোষণ’।

মেটার বিরুদ্ধে এত বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করা হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রতিযোগিতায় অন্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে প্রতিষ্ঠানটি অবকাঠামো খাতে এর চেয়েও অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করছে।

আর্থিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে এক ফোনালাপে জাকারবার্গ জানান, ভোক্তাদের জন্য তৈরি মেটার এআই টুল ‘মিউজ’ ইতিমধ্যে ১ কোটি মানুষ ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন, ‘মিউজকে কোটি কোটি মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে তোলাই আমাদের লক্ষ্য ও কৌশল।’

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে চলতি বছর মেটা অন্তত ১৩৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার পরিকল্পনা করেছে। এ অর্থের বেশির ভাগই এআই-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে ব্যয় হবে। তবে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ১৪৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে মেটার নগদ অর্থপ্রবাহ ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। বিবিসির পর্যালোচনা করা প্রতিষ্ঠানটির আগের আর্থিক নথি অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির ১৪ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম মেটার নগদ অর্থপ্রবাহ ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণাত্মক হয়েছে।

নগদ অর্থপ্রবাহ বলতে পরিচালন ব্যয় ও বিনিয়োগের অর্থ পরিশোধের পর একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে যে অর্থ অবশিষ্ট থাকে, তা বোঝায়। অর্থাৎ আয় আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি হলেও মেটা এখন তার আয়ের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করছে।

তবে মেটার আয় বাড়ছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর তিন মাসে প্রতিষ্ঠানটির আয় ২৬ শতাংশ বেড়ে ৬৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে মুনাফা বেড়ে প্রায় তিন গুণ হয়ে ৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

এরপরও এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। আর্থিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে ওই ফোনালাপে মেটার প্রধান অর্থ কর্মকর্তা সুসান লি নতুন একটি শেয়ার বিভাজনের ঘোষণা দেন। এর আওতায় বর্তমান শেয়ারধারীরা ভোটাধিকারবিহীন নতুন এক শ্রেণির একটি করে শেয়ার পাবেন। লি বলেন, নতুন এই শ্রেণির শেয়ার এখনই কোনো নির্দিষ্ট বিনিয়োগের জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে না। তবে এআই খাতে চলমান ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি ইঙ্গিত দেন, আগামী বছর প্রতিষ্ঠানটির ‘অর্থায়নের ক্ষেত্রে আরও নমনীয়তা’ প্রয়োজন হতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত