ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: শিশুর সাইবার হয়রানি বাড়ছে
� ন্যাশনাল চাইল্ড হেল্পলাইনে সাইবার হয়রানির কল বেড়েছে ৪২ শতাংশ।
� বয়স বাড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুর অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে।
� দুই থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের মধ্যে ৯৫ শতাংশ মুঠোফোনে আসক্ত।
� শিশুরা কার্টুন দেখার সময় প্রাপ্তবয়স্কদের কন্টেন্ট চলে আসতে পারে।

শিশুদের সাইবার হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। ন্যাশনাল চাইল্ড হেল্পলাইনের তথ্য বলছে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে শিশুদের সাইবার হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা বেড়েছে ৪২ শতাংশ, যা শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতে মোবাইল ফোন পেয়ে শিশুরা অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠছে। আবার কখনো কখনো অভিভাবকেরাই পড়াশোনা, যোগাযোগ কিংবা বিনোদনের জন্য বয়স বাড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুর অ্যাকাউন্ট খুলে সাইবার বিপদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছেন। এ জন্য অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও তদারকির পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত অপরাধ তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
একটি বহুজাতিক সংস্থার কর্মকর্তা জানান, তিনি করোনাকালে ২০২০ সালে অনলাইন ক্লাসের জন্য বয়স বাড়িয়ে মেয়েকে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিলেন। তখন মেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত। পরে ওই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে মেয়ের সঙ্গে সমবয়সী পরিচয় দেওয়া অপরিচিত এক ব্যক্তির বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে কৌশলে ওই ব্যক্তি মেয়ের পাসওয়ার্ড জেনে অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেয়। আপত্তিকর ছবি, ভিডিও ধারণ করে মেয়েকে ব্ল্যাকমেল করতে শুরু করে সে। ভয়ে-আতঙ্কে মেয়েটি প্রথমে কিছু জানায়নি। মেধাবী মেয়েটি একপর্যায়ে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পড়াশোনা থমকে যায়। পরে দীর্ঘদিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাউন্সেলিংয়ে থেকে সে স্বাভাবিক হয়েছে। মাধ্যমিক পাস করেছে। কিন্তু এখনো মাঝে মাঝে পুরোনো ট্রমা ফিরে আসে।
ওই মেয়ের মতো অসংখ্য শিশু এমন ঘটনার শিকার হয়ে বিভীষিকাময় সময় পার করছে। শিশুদের ক্রমবর্ধমান সাইবার হয়রানির বিষয়টি উঠে এসেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত ন্যাশনাল চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এর তথ্যেও। এই তথ্য বলছে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর হেল্পলাইনে শিশুদের সাইবার হয়রানি-সংক্রান্ত কল আসার পরিমাণ ৪২ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালে এই হেল্পলাইনে মোট ৭ লাখ ৬৯ হাজার ৮৬১টি কল গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ৫৯৭টি ছিল শিশুদের সাইবার হয়রানি-সংক্রান্ত। এসব কলের মধ্যে ১৭৯টি ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে হেল্পলাইনে আসা ৫ লাখ ২৭ হাজার ৯৫৪টি কলের মধ্যে ৫৬৫টি ছিল সাইবার হয়রানি-সংক্রান্ত। এসব ঘটনায় ১৭০টি ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
চাইল্ড হেল্পলাইনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সাইবার হয়রানি বিষয়ে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫০টি কল এসেছিল। চলতি বছর প্রতি মাসে গড়ে ৭০টির বেশি কল এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এগুলো শুধু হেল্পলাইনে আসা ঘটনার হিসাব। এর বাইরেও শিশুদের সাইবার হয়রানির অনেক বেশি ঘটনা ঘটছে, যা হেল্পলাইনে না জানানোয় সামনে আসেনি।
হেল্পলাইন ১০৯৮-এর ব্যবস্থাপক চৌধুরী মো. মোহায়মেন গত শনিবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, পরিবারগুলো ভেঙে ছোট হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের বদলে শিশুরা অনলাইনে অপরিচিত মানুষের সংস্পর্শে আসছে। অথচ কে প্রকৃত পরিচয়ে যোগাযোগ করছে, আর কে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করছে, তা বোঝার ক্ষমতা তাদের সব সময় থাকে না। অপরাধীরা অনেক সময় শিশুর সমবয়সী পরিচয় দিয়ে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। পরে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও কিংবা তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো দিয়ে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করতে পারে। তাই সন্তানের অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়ার পর কারা তার বন্ধু হচ্ছে, কী ধরনের বার্তা আসছে এবং কেউ ব্যক্তিগত তথ্য চাইছে কি না, তা নিয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা জরুরি।
ফেসবুক, টিকটকসহ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৩ বছরের কম বয়সে অ্যাকাউন্ট করা যায় না। কিন্তু অনেকে বয়স বাড়িয়ে অ্যাকাউন্ট খোলে। এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর সূত্র ধরে শিশুদের ঘর ছাড়ার ঘটনা মাঝে মাঝেই গণমাধ্যমে আসছে। সম্প্রতি কুমিল্লার পঞ্চম শ্রেণিপড়ুয়া তিন শিশু তৃতীয় শ্রেণিপড়ুয়া এক শিশুকে নিয়ে ঘর ছেড়েছিল। পরে তাদের হবিগঞ্জ থেকে উদ্ধার করা হয়।
কুমিল্লারই সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীর মোবাইল ফোনে এক তরুণের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে কক্সবাজারে যাওয়া এবং বাড়ি ফেরার পথে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যবহার করা হয় না। ইন্টারনেট সেবাদাতা (আইএসপি) প্রতিষ্ঠানগুলো প্যারেন্টাল গাইডলাইন মেনে চলে না। ফলে শিশুরা কার্টুন দেখার সময় বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রল করার সময় প্রাপ্তবয়স্কদের কনটেন্ট চলে আসতে পারে। এমন অভিজ্ঞতার শিকার হচ্ছে অনেক শিশু। অনেকে সেগুলোতে আসক্ত হচ্ছে। অনেক সময় এগুলো তাদের বিপদ ডেকে আনছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ১০০টি পরিবারের ওপর সমীক্ষা চালায় বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন। ওই সমীক্ষায় দেখা যায়, দুই থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের মধ্যে ৯৫ শতাংশ মোবাইল ফোনে আসক্ত। তার মধ্যে কার্টুন এবং ভিডিও গেম দেখে প্রায় ৯৫ শতাংশ। টিকটক দেখে প্রায় ৫০ শতাংশ শিশু।
২০১৯ সালে ইউনিসেফ বাংলাদেশ ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১ হাজার ২৮১ শিশুর ওপর জরিপ করে। এই জরিপে অংশ নেওয়া ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইনে সাইবার বুলিং, সহিংসতা বা হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানায়। ২৫ শতাংশ শিশু ১১ বছর বয়সের আগেই ডিজিটাল জগতে প্রবেশের কথা জানিয়েছিল। একই জরিপে ৭০ শতাংশ ছেলে ও ৪৪ শতাংশ মেয়ে অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তির বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করার কথা জানায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে সাইবার বুলিং, সহিংসতা ও হয়রানির শিকার শিশুর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। অনেক বাবা-মা সন্তানের জন্মদিন, স্কুলে যাওয়ার ছবি, পুরস্কার গ্রহণ, ঘুরতে যাওয়া কিংবা দৈনন্দিন জীবনের নানা ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। এই প্রবণতাও পরে শিশুটিকে বিপদে ফেলতে পারে। সেই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রসার শিশুর এই ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা গত শনিবার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকা সাধারণ পারিবারিক ছবিও এআই ব্যবহার করে যৌন নিপীড়নমূলক ছবি বা ভিডিওতে রূপান্তর করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশন (আইডব্লিউএফ) ২০২৫ সালে এমন ৩ হাজার ৪৪০টি ভিডিও শনাক্ত করেছে। যেখানে ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩টি। তিনি বলেন, অভিভাবকদের প্রথমে বুঝতে হবে, শিশু কোনো কনটেন্ট নয়। অপ্রয়োজনে শিশুর নামে প্রকাশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট খোলা উচিত নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের সাইবার হয়রানি থেকে রক্ষা করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ব্যক্তিগত রাখা, অনুসারীদের তালিকা নিয়মিত যাচাই করা, শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার এবং দ্বিস্তরীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু রাখা জরুরি। শিশুদেরও অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তির পাঠানো সংযোগ বা লিংকে প্রবেশ, উপহার দেওয়ার প্রলোভন, ভিডিও কলে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব, গোপনে কথোপকথন চালানোর অনুরোধ কিংবা ব্যক্তিগত ছবি চাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করতে হবে। কোনো অনলাইন যোগাযোগে অস্বস্তি বোধ করলে বা কেউ ভয় দেখালে যেন তারা নির্ভয়ে অভিভাবককে জানাতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
শিশু সুরক্ষায় কাজ করা সংগঠন ‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন, সন্তানের মোবাইল ফোন নিয়মিত পরীক্ষা করা কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইন্টারনেট বন্ধ রেখে অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। শিশুকে অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্যের গুরুত্ব, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের ঝুঁকি এবং হয়রানির শিকার হলে করণীয় সম্পর্কে শেখানোও জরুরি। অনলাইনে কোনো ছবি বা তথ্যের অপব্যবহার হলে তাড়াহুড়ো করে সব মুছে না ফেলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট লিংক, ব্যবহারকারীর নাম, বার্তা, স্ক্রিনশট, ঘটনার সময় এবং মূল ফাইল সংরক্ষণ করতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে জানানো উচিত। অভিভাবকদের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও এ বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত।
ডিজিটালি রাইট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট খোলা নিষিদ্ধ করা কোনো সমাধান নয়। এ জন্য নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতা ও তদারকির পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত অপরাধ তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে স্কুলপর্যায় থেকে অনলাইন নিরাপত্তাবিষয়ক শিক্ষা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। শিশুদের অনলাইন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পরিবার, সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি।









