আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমার আইডি থেকে স্টোরি টেলিং করি। বেশ কয়েক দিন ধরে খেয়াল করছি, আমার ভয়েসওভারগুলো ব্যবহার করে এআই দিয়ে কনটেন্ট বানানো হচ্ছে। সেই কনটেন্টে গিয়ে যখন কমেন্ট করছি, তখন আমার কমেন্টগুলো ডিলিট করে দেওয়া হচ্ছে। কয়েক দিন আগে আমার ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে আমাকে সাইবার বুলিং করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমাকে সরাসরি বলা হয়েছে, আমি যদি কমেন্ট করা বন্ধ না করি, তাহলে আমার ছবি নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করা হবে। আমি সব প্রমাণ রেখেছি। আমার পেজটিও কয়েকবার হ্যাক করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমি আইনি পদক্ষেপ নিতে চাই। সে ক্ষেত্রে কী করতে পারি, পরামর্শ দিন।
মুমতাহা লাবণী, সিরাজগঞ্জ
মুমতাহা, আপনি যে ঘটনাগুলো বলেছেন, আপনার ভয়েস ব্যবহার করে এআই কনটেন্ট তৈরি, ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে সাইবার বুলিংয়ের চেষ্টা, ‘কমেন্ট বন্ধ না করলে ছবি নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করা হবে’ ধরনের হুমকি এবং আপনার পেজে অননুমোদিত প্রবেশের চেষ্টা—এসবকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ কার্যকর। এই আইনের ধারা ২৫-এ ব্ল্যাকমেলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্নো বা এ ধরনের ক্ষতিকর/ভীতিপ্রদ উপাদান তৈরি, প্রকাশ বা প্রকাশের হুমকি এআই দিয়ে তৈরি বা এডিট করা উপাদানসহ অপরাধ হিসেবে রাখা হয়েছে।
কাজেই এখন আপনি কোনো প্রমাণ মুছবেন না। প্রতিটি ঘটনার জন্য আলাদা স্ক্রিনশট ও সম্ভব হলে স্ক্রিন রেকর্ডিং; পোস্ট/প্রোফাইল/ভিডিওর ইউআরএল; অ্যাকাউন্টের ইউজার নেম ও প্রোফাইল ইউআরএল; হুমকির পুরো কথোপকথন, তারিখ ও সময়; আপনার কমেন্ট মুছে ফেলার প্রমাণ; এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টের অরিজিনাল লিংক; আপনার ছবি কোথা থেকে নেওয়া হয়েছে, তার প্রমাণ এবং পেজে লগইন অ্যাটেম্পট বা সিকিউরিটি অ্যালার্টের স্ক্রিনশট রাখুন। সম্ভব হলে এগুলো একাধিক জায়গায় ব্যাকআপ রাখুন এবং অরিজিনাল ফাইল অপরিবর্তিত রাখুন।
হুমকিদাতার সঙ্গে তর্কে যাবেন না
আরও তথ্য বের করার জন্য নিজে থেকে কথোপকথন বাড়ানোর দরকার নেই। আগে প্রমাণ সংরক্ষণ করুন, তারপর রিপোর্ট/আইনি পদক্ষেপ নিন। এ ছাড়া জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সিতে অভিযোগ করুন। এনসিএসএর অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিযোগের জন্য তাদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ০১৩০৮৩৩২৫৯২ এবং হেল্পলাইন ৩৩৩(৮)।
থানায় লিখিত অভিযোগ/জিডি করার কথা বিবেচনা করুন
আপনি যেহেতু সিরাজগঞ্জের, কাছের থানায় অভিভাবক/বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ক কাউকে সঙ্গে নিয়ে লিখিত অভিযোগ করতে পারেন। অভিযোগে শুধু ‘সাইবার বুলিং’ না লিখে কী ঘটেছে, কখন ঘটেছে, কোন অ্যাকাউন্ট থেকে কী হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং কী কী প্রমাণ আছে—এসব ধারাবাহিকভাবে লিখুন। প্রয়োজন হলে পুলিশ বিষয়টি উপযুক্ত সাইবার তদন্ত ইউনিটে পাঠাতে পারে। বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী অননুমোদিতভাবে কারও ছবি ব্যবহার, ভুয়া অ্যাকাউন্ট এবং সোশ্যাল মিডিয়া হ্যাকিং-সংক্রান্ত অভিযোগ নেওয়ার ব্যবস্থা আছে।
অ্যাকাউন্ট এখনই সুরক্ষিত করুন
পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন, দুই ধাপের অথেনটিকেশন চালু করুন, অচেনা লগডইন ডিভাইস বা সেশন থেকে লগআউট করুন, রিকভারি ই-মেইল অথবা ফোন নম্বর পরীক্ষা করুন, অন্য কোথাও একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করলে সেটিও বদলান। কাউকে ওটিপি, পাসওয়ার্ড বা রিকভারি কোড দেবেন না। কনটেন্টগুলো প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করুন। বিশেষ করে ইমপার্সোনেশন, হ্যারেজমেন্ট, প্রাইভেসি ভায়োলেশন, নন-কনসেন্সুয়াল ই-মেইল বা থ্রেটনিং কনটেন্টের যে ক্যাটাগরি প্রযোজ্য, সেটি ব্যবহার করুন। রিপোর্ট করার আগে প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
পরামর্শ করে লিখিত অভিযোগ তৈরি
আপনার হাতে যেহেতু প্রমাণ আছে, একজন আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে একটি লিখিত অভিযোগ তৈরি করা সবচেয়ে ভালো। সেখানে এআই জেনারেটেড বা এডিটেড, ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহারের হুমকি এবং অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং অ্যাটেমট—সব ঘটনা একই টাইমলাইনে দেখানো যেতে পারে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: শুধু ভয়েসওভার ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই ধরনের ফৌজদারি অপরাধ হবে—এমনটা বলা ঠিক হবে না। আপনার ক্ষেত্রে আসল আইনি বিষয় নির্ভর করবে তারা কীভাবে আপনার ভয়েস/ছবি ব্যবহার করেছে, কী উদ্দেশ্যে করেছে, কী হুমকি দিয়েছে এবং ক্ষতির চেষ্টা করেছে তার ওপর। তাই প্রমাণ দেখে আইনজীবী বা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষকে সিদ্ধান্ত নিতে দিন।










