Ajker Patrika

বাংলাদেশের তারকা ফুটবলাররা কেন খেপ খেলেন

আনোয়ার সোহাগ, ঢাকা
বাংলাদেশের তারকা ফুটবলাররা কেন খেপ খেলেন
শেখ মোরসালিনকে খেপ খেলতে দেখা গেছে। ছবি: সংগৃহীত

মৌসুম শুরু হতে এখনো প্রায় দুই সপ্তাহ বাকি। বেশির ভাগ ক্লাবের অনুশীলনই শুরু হয়নি। জাতীয় দলেরও এখন কোনো ক্যাম্প নেই। এই অবসর সময়ে তাই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের স্থানীয় টুর্নামেন্টে খেপ খেলায় ব্যস্ত জাতীয় দলের একঝাঁক ফুটবলার। কোথাও কাদামাখা মাঠ, কোথাও এবড়োখেবড়ো মাঠ—সেখানেই খেলছেন শেখ মোরসালিন, ফয়সাল আহমেদ ফাহিম, মেহেদী হাসান মিঠু, রাকিব হোসেন, মোহাম্মদ হৃদয়দের মতো বাংলাদেশ ফুটবলের পরিচিত মুখ।

বাংলাদেশের ফুটবলে এই দৃশ্য নতুন নয়। তবে পেশাদার যুগে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের এমন মাঠে খেলতে দেখা নিয়ে এবার প্রশ্ন উঠেছে বেশি। স্থানীয় এক ম্যাচ হয়তো একজন খেলোয়াড়ের বাড়তি আয়, কিন্তু ওই ম্যাচে পাওয়া চোটে নষ্ট হয়ে যেতে পারে তাঁর পুরো মৌসুম। ক্ষতি হতে পারে ক্লাবের, প্রভাব পড়তে পারে জাতীয় দলেও।

এত ঝুঁকি নিয়েও জাতীয় দলের ফুটবলাররা খেপ খেলেন কেন? উত্তরটা শুধু টাকায় সীমাবদ্ধ নেই। মৌসুমের বিরতি, ক্লাবের অনুশীলন শুরু না হওয়া, দীর্ঘদিন প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের বাইরে থাকা, স্থানীয় আয়োজকদের অনুরোধ এবং বাড়তি আয়ের সুযোগ—সব মিলিয়েই টিকে আছে খেপের সংস্কৃতি।

ম্যাচে ২০ হাজার-১ লাখ টাকা

খেপের বাজার মূলত ঢাকার বাইরে। স্থানীয় টুর্নামেন্টে জাতীয় দলের পরিচিত কোনো ফুটবলার নামলে দর্শকের আগ্রহ বাড়ে, টুর্নামেন্টের আকর্ষণও বাড়ে। তাঁদের পারিশ্রমিকও তুলনামূলক বেশি। একটি ম্যাচ খেলেই ২০-৭০ হাজার টাকা পাওয়া যায়। কখনো কখনো তা লাখেও পৌঁছায়। যাতায়াতের পাশাপাশি থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও সাধারণত আয়োজকেরাই করেন।

এবারের দলবদলের পরিস্থিতিও খেপের প্রবণতা বাড়ানোর মতো। গত দুই মৌসুমে ক্লাবগুলোর বাজেট কমেছে, দলবদলের বাজারেও আগের সেই ব্যস্ততা নেই। চলতি দলবদলে বেশির ভাগ ক্লাব এখনো দল গোছাতে পারেনি। অধিকাংশ ক্লাবের প্রাক্‌-মৌসুম অনুশীলনও শুরু হয়নি। চুক্তিবদ্ধ হয়েও অনেক খেলোয়াড় এখনো ক্লাবের আনুষ্ঠানিক অনুশীলনের বাইরে। খেলোয়াড়দের বড় একটি অংশ এখনো ক্লাবের নিয়মিত অনুশীলন ও ম্যাচের বাইরে। এই সময়ে খেলা যেমন তাঁদের কাছে বাড়তি আয়ের সুযোগ, তেমনি প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের সঙ্গে থাকারও একটি উপায়।

বাংলাদেশের তারকা ফুটবলারদের এখন খেপ খেলতে দেখা যাচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের তারকা ফুটবলারদের এখন খেপ খেলতে দেখা যাচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

‘না’ করতে পারেন না

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খেপ খেলা জাতীয় দলের এক ফরোয়ার্ড জানান, বিষয়টা শুধু টাকার জন্য নয়। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘এমন এমন মানুষ ফোন দেয়, আপনি হয়তো ওটা না করতে পারেন না আরকি।’

তবে তিনিও জানেন, পেশাদার ফুটবলার হিসেবে এভাবে খেলা উচিত নয়। স্থানীয় পর্যায়ের মাঠ, প্রতিপক্ষের খেলার ধরন ও শারীরিক ঝুঁকির কারণে চোট পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাঁর নিজের কথাতেও সেই স্বীকারোক্তি আছে, ‘এমনও না যে প্রতিদিনই আমরা খেপ খেলছি। যেহেতু অনেক দিন সবাই খেলার বাইরে। অনেকেই চায় খেলতে, আবার একটু ঘুরেও এল সবাই একসঙ্গে। এটা ঠিক, খেলা উচিত না। কারণ, সবাই তো পেশাদার খেলোয়াড়।’

খেপ খেলার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যুক্তি চোটের ঝুঁকি। শুধু চোট নয়, ফিটনেস নিয়েও সমস্যা হতে পারে। নতুন মৌসুমের আগে খেলোয়াড়ের শরীরকে প্রস্তুত রাখাই যেখানে মূল কাজ, সেখানে অনিয়ন্ত্রিত ম্যাচ খেলে চোট বা ক্লান্তি নিয়ে ক্লাবে ফিরলে প্রাক্‌-মৌসুম প্রস্তুতিও ব্যাহত হতে পারে। এর প্রভাব পরে জাতীয় দল পর্যন্ত গড়াতে পারে।

সাবেক কোচ গোলাম সরওয়ার টিপু বলেন, ‘এটা সব সময় যে পয়সার জন্য খেলতে যায়, বিষয়টা এমন নয়। তবে এটা যতটা এড়ানো যায়, তত ভালো।’

বাফুফে নাকি ক্লাবের দায়

টিপুর মতে, খেলোয়াড়দের খেপ খেলা ঠেকাতে বাফুফের চেয়ে ক্লাবই বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আবার কখনো কখনো ক্লাব কর্মকর্তারাও স্থানীয় টুর্নামেন্টে খেলোয়াড়দের উৎসাহ দেন—এমন বাস্তবতার কথাও বলেছেন তিনি, ‘মাঝারি মানের খেলোয়াড়েরা ঠিকমতো পারিশ্রমিক পায়ই না। তাই খেপ খেলাটা যে একেবারে অন্যায়, সেটাও না। তবে এ ব্যাপারে বাফুফে ও ক্লাবগুলোর কঠোর হওয়া উচিত।’

ক্লাবের নিয়ন্ত্রণ কোথায়

দলবদল ও নিবন্ধন শেষ হওয়ার পর খেলোয়াড়েরা আনুষ্ঠানিকভাবে ক্লাবের অধীনে থাকবেন। তখন ক্লাবের নিয়মের বাইরে গিয়ে খেললে শাস্তির সুযোগ থাকবে, এমনটাই জানিয়েছেন মোহামেডানের টিম লিডার আমিরুল ইসলাম বাবু, ‘১৩ আগস্টের পর আমরা তাদের শক্তভাবে বলে দেব, নিয়মের বাইরে কেউ যেতে পারবে না।’

খেপ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নের তির বাফুফের দিকে। নির্দিষ্ট অভিযোগ না পাওয়া পর্যন্ত নিজেরা খুঁজে খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অবস্থানে নেই ফেডারেশন। বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল বলেন, ‘যদি এ রকম কিছু আমাদের নজরে আসে, অবশ্যই আমরা অ্যাকশন নিতে বাধ্য হব।’

বাফুফে সভাপতি যে ‘নজরে আসার’ কথা বলেছেন, সেটি নিয়ে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের দাবি, তিনি নিজেই টাঙ্গাইল ও ঝিনাইদহে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের খেপ খেলতে দেখেছেন। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘যে খেলোয়াড়েরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে খেপ খেলেছে, সেই বিষয় নজরে এনে তাদের প্রথমে সতর্ক করতে চাই, তারপর আমরা হয়তো ব্যবস্থা নেওয়ার চিন্তা করব।’ পেশাদার ফুটবলাররা ঝুঁকি নিয়ে খেপ খেলতে যাওয়ায় হতাশ ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘যেখানে আমরা খেলোয়াড়দের পেশাগত স্বীকৃতি বাবদ ক্রীড়া ভাতা প্রদান করছি, সরকার তাদের মাসিক ভাতা দিচ্ছে, সেই খেলোয়াড়দের খেপ খেলতে যাওয়াটা কতটুকু সমীচীন এবং দেশের প্রতি যে কমিটমেন্টের অভাব, সেটারও বহিঃপ্রকাশ পেয়েছি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত