Ajker Patrika

এক ‘অলৌকিক জাদুকর’ মদরিচের সমাপ্তি

আনোয়ার সোহাগ, ঢাকা
এক ‘অলৌকিক জাদুকর’ মদরিচের সমাপ্তি
পর্তুগালের বিপক্ষে ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচ শেষে লুকা মদরিচ। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষটা জয় দিয়ে হলো না ক্রোয়াট এই কিংবদন্তির। ছবি: এক্স

সব বিদায়ের শব্দ এক নয়। কেউ বিদায় নেয় করতালির মধ্যে, কেউ ট্রফি হাতে। আবার কিছু বিদায় আসে নীরবে চোখের কোণে জমে থাকা জল, দীর্ঘশ্বাস আর অপূর্ণতার ভার নিয়ে। লুকা মদরিচের বিশ্বকাপ অধ্যায় শেষ হওয়ার মুহূর্তটি ছিল ঠিক তেমনই।

পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ বত্রিশের ম্যাচে রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর কিছুক্ষণ স্থির দাড়িয়ে ছিলেন। চারপাশে উল্লাস, হতাশা, কান্না—সবকিছুর মাঝেও যেন সময় থেমে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর এগিয়ে এলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। এখনকার প্রতিপক্ষ এবং একসময়ের সতীর্থকে জড়িয়ে ধরলেন।

ম্যাচ শেষে সাংবাদিকেরা যখন তাঁর ভবিষ্যৎ জানতে চাইলেন, মদরিচ উত্তর দিলেন মাত্র কয়েকটি শব্দে, ‘এখন এসব নিয়ে কথা বলার সময় নয়। খুব শিগগির আপনারা জানতে পারবেন।’ নিজের সিদ্ধান্ত নয়, তাঁর ভাবনায় তখনো ছিল দলের হার।

মদরিচের ক্যারিয়ারের সৌন্দর্যটা এখানেই। তিনি কখনো আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে চাননি, কিন্তু আলো নিজেই তাঁকে খুঁজে নিয়েছে। তিনি কখনো নিজের গল্প বলেননি, তাঁর ফুটবলই সেই গল্প বলে গেছে। খেলার ধরনে নেই বাড়তি চাকচিক্য। ধারাবাহিকতা থাকলে আর কীই-বা দরকার। মদরিচ তেমনই এক যন্ত্র, যাঁকে ৪০ বছর বয়সেও সানন্দে মাঠ চষে বেড়াতে দেখা যায়।

এ কারণেই মদরিচ শুধু একজন মিডফিল্ডার নন; ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলের সমার্থকও। কিন্তু তাঁর শেষটা হলো অদ্ভুত এক নাটকীয়তা ও প্রযুক্তির মারপ্যাঁচে। তাই তো ক্রোয়েশিয়া কোচ জ্লাতকো দালিচের মন ভালো নেই, ‘হার দিয়ে এভাবে শেষ হওয়ায় আমি দুঃখিত।’

পর্তুগালের কোচ রবের্তো মার্তিনেসও মদরিচকে নিয়ে না বলে থাকতে পারলেন না, ‘এত দীর্ঘ সময় ধরে যে মান ধরে রেখেছে, সে এখনো তরুণের মতো ফুটবল খেলে। খেলা বোঝার ক্ষমতা অসাধারণ। মদরিচ এ ব্যাপারে এক অনন্য উদাহরণ। সে চিরকাল ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।’

বিশ্বকাপ কখনো জিততে পারেননি, তবে বিশ্বকাপের ইতিহাস তাঁকে নিজের অন্যতম উজ্জ্বল চরিত্র হিসেবে জায়গা দিয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত শৈশব থেকে উঠে এসে ছোট দলকে বিশ্বমঞ্চের শক্তিতে পরিণত করা, লাখো মানুষের স্বপ্নের প্রতীক হয়ে ওঠা—এসব অর্জনের পাশে একটি ট্রফির অভাবও যেন খুব বড় হয়ে দাঁড়ায় না।

তিনি যা করেছেন, তা শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ২০১৮ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়াকে ফাইনালে তুলেছিলেন, জিতেছিলেন গোল্ডেন বল। ২০২২ বিশ্বকাপেও হাল ছাড়েননি। কিন্তু তৃতীয় হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। ২০২৬ বিশ্বকাপে ৪০ বছর বয়সেও মাঝমাঠের সবচেয়ে পরিশ্রমী খেলোয়াড়দের একজন হয়ে শেষবারের মতো বিশ্বকাপকে বিদায় জানালেন। পর্তুগালের বিপক্ষে ২-১ গোলের হারের স্কোরলাইন লড়াকু গল্পটা হয়তো ফুটিয়ে তুলবে না।

আগামী কয়েক বছর? সেপ্টেম্বরে পা দেবেন ৪১ এ। দেশের হয়ে ২০২টি ম্যাচের পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলে তাঁর ঝুলিতে রয়েছে ৯৬৭টি ম্যাচ। অবসর নেওয়ার অধিকার যদি কারও থেকে থাকে, তবে তা তাঁরই রয়েছে। মার্তিনেস যেমনটা বলেছেন, ‘তিনি চিরকাল ফুটবলের লোকগাথায় বেঁচে থাকবেন।’

ক্রোয়েশিয়ার ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলার একটি ছোট দেশকে সীমানার চেয়ে অনেক দূর নিয়ে গেছেন এবং বারবার তা করে দেখিয়েছেন। দালিচ সেই সব খেলোয়াড়ের কথা বলেছেন, ‘যারা দুবার অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছে।’

মদরিচ ছিলেন ক্রোয়েশিয়ার সেই অলৌকিক জাদুকর।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত