Ajker Patrika

খামেনির দাফনে এত দেরি হলো কেন—কোথায় ছিল মরদেহ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৬: ৪৩
খামেনির দাফনে এত দেরি হলো কেন—কোথায় ছিল মরদেহ
ছবি: এএফপি

ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তাঁর মৃত্যুর চার মাসেরও বেশি সময় পর। ইসলামি রীতিতে মৃত্যুর পর যত দ্রুত সম্ভব দাফনের প্রচলন থাকলেও, খামেনির ক্ষেত্রে এই দীর্ঘ বিলম্ব বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়লেও ইরানি কর্তৃপক্ষ বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অস্বাভাবিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিই এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, খামেনির মরদেহ ইতিমধ্যে তেহরানে আনা হয়েছে। রাজধানীর গ্র্যান্ড মোসাল্লায় তিন দিনের জন্য মরদেহ রাখা হবে। সেখানে লাখো মানুষ শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন। এরপর তেহরান, কোম ও মাশহাদসহ ইরানের বিভিন্ন শহরে এবং ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে আগামী ৯ জুলাই নিজের জন্মস্থান মাশহাদের ইমাম রেজার মাজার প্রাঙ্গণে খামেনিকে দাফন করা হবে।

ইরান সরকারের দাবি, এই শেষকৃত্য হবে ইরানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। এতে কয়েক কোটি মানুষের অংশগ্রহণের আশা করা হচ্ছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। ভারত, চীন, আফগানিস্তান ও ককেশাস অঞ্চলের কয়েকটি দেশও প্রতিনিধি পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।

খামেনি ৮৬ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন। একই হামলায় তাঁর পরিবারের কয়েক সদস্যও প্রাণ হারান। তাঁদের মরদেহও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে একসঙ্গে প্রদর্শন করা হবে।

তবে শেষকৃত্যকে ঘিরে কেবল ধর্মীয় আবেগই নয়, রাজনৈতিক বার্তাও স্পষ্ট। ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব এই বিশাল জনসমাগমকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি জনগণের সমর্থনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। কোম শহরের জুমার ইমাম আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ সাঈদি বলেছেন, শহীদ নেতার জানাজায় মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি কার্যত ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পক্ষে আরেকটি গণভোট হিসেবে বিবেচিত হবে।

ইরান সরকার ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পরিবহন, আবাসন ও খাবারের বিশেষ ব্যবস্থা করেছে বলে জানা গেছে। দেশটির কর্মকর্তারা মনে করছেন, দীর্ঘ যুদ্ধের পর এই অনুষ্ঠান সরকারের শক্তি ও ঐক্যের প্রদর্শনী হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, এই বাহ্যিক ঐক্যের আড়ালে রয়েছে গভীর জন অসন্তোষ। বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নে অনেক ইরানি ক্ষুব্ধ। যুদ্ধের আগেও মূল্যস্ফীতি বিরোধী বিক্ষোভে বহু মানুষ খামেনিবিরোধী স্লোগান দিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তেহরানের কিছু এলাকায় উল্লাসধ্বনি শোনা গিয়েছিল বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

খামেনির মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে তিনি প্রকাশ্যে আসেননি। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বাবার শেষকৃত্যেও তিনি উপস্থিত থাকবেন না বলে জানা গেছে।

গত চার মাস খামেনির মরদেহ কোথায় ছিল—এই প্রশ্নও ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়িয়েছে, মরদেহ অস্থায়ীভাবে দাফন করা হয়েছিল। তবে ইরানি কর্মকর্তারা সেই দাবি নাকচ করে বলেছেন, মরদেহ ইসলামি বিধান মেনে বিশেষ শীতল সংরক্ষণাগারে রাখা হয়েছিল।

সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক বিশ্লেষক ড. মোহাম্মদ ওমর ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেন, ইসলামে রাসায়নিক উপায়ে মরদেহ সংরক্ষণ বা এমবামিং নিরুৎসাহিত করা হয়। তবে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে শীতল তাপমাত্রায় মরদেহ সংরক্ষণের অনুমতি রয়েছে। তাঁর ভাষায়, ইরানের ফরেনসিক মর্গগুলোতে দীর্ঘ সময় মরদেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা আগে থেকেই রয়েছে। তাই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে চার মাস মরদেহ হিমায়িত অবস্থায় সংরক্ষণ করা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

ইরানের সরকার এখন এই শেষকৃত্যকে জাতীয় ঐক্য ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। অনুষ্ঠানের সরকারি প্রতীকচিহ্নে খামেনির মুষ্টিবদ্ধ হাতের পাশে লেখা হয়েছে—‘আমাদের উঠে দাঁড়াতেই হবে।’ প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান দেশটির সব জাতিগোষ্ঠী, ধর্ম ও রাজনৈতিক মতের মানুষকে শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই উপস্থিতিই হবে সন্ত্রাস, সহিংসতা ও বিদেশি চাপের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণের ঐক্যবদ্ধ জবাব।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত