Ajker Patrika

কেপ ভার্দেই যেন এই বিশ্বকাপের বিজ্ঞাপন

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
কেপ ভার্দেই যেন এই বিশ্বকাপের বিজ্ঞাপন
পতাকা নিয়ে গ্যালারিতে খেলা দেখতে এসেছিলেন কেপ ভার্দের এই তরুণী। উরুগুয়েকে ২-২ গোলে রুখে দিয়ে সমর্থকদের খুশিই করেছে কেপ ভার্দে ফুটবল দল। ছবি: এক্স

আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ১০টি দ্বীপ নিয়ে গড়ে ওঠা ছোট্ট এক দেশ কেপ ভার্দে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে জনসংখ্যা মাত্র সোয়া পাঁচ লাখ। ফুটবল মানচিত্রে যাদের নাম খুঁজে পেতে খোদ ফুটবলবোদ্ধাদেরও বেগ পেতে হতো, সেই ‘নীল হাঙররাই’ এখন ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। অভিষেক বিশ্বকাপেই দুই সাবেক চ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়েকে রুখে দিয়ে তারা তৈরি করেছে এক নতুন মহাকাব্য; যা কেবল ফুটবলীয় চমক নয়, বরং আত্মবিশ্বাস ও লড়াকু মানসিকতার এক অনন্য উদাহরণ।

টুর্নামেন্ট শুরুর আগে কেপ ভার্দেকে নিয়ে বাজি ধরার মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষ ছিল ইউরোপসেরা স্পেন। লামিনে ইয়ামাল, পেদ্রি কিংবা রদ্রির মতো বিশ্বমানের তারকাদের নিয়ে গড়া স্প্যানিশ আক্রমণভাগকে যেভাবে তারা গোলহীনভাবে রুখে দিয়েছিল, তাতেই নড়েচড়ে বসেছিল ফুটবল বিশ্ব।

তবে উরুগুয়ের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচটি প্রমাণ করেছে, স্পেনের বিপক্ষে সেই ড্র কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে বুক চিতিয়ে লড়াই করে ২-২ গোলের ড্র ছিনিয়ে এনেছে তারা। কেভিন পিনার ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া দুর্দান্ত ফ্রি-কিক আর হেলিও ভ্যারেলার বুদ্ধিদীপ্ত গোল উরুগুইয়ান রক্ষণভাগকে ম্যাচজুড়ে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে। বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে প্রথম নবাগত দল হিসেবে নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচেই দুই সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মুখোমুখি হয়ে অপরাজিত থাকার অনন্য কীর্তি এখন এই দ্বীপরাষ্ট্রের দখলে। ২০০২ সালে সেনেগালের পর প্রথম কোনো নবাগত দল হিসেবে বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে অপরাজিত থাকার রেকর্ডও ছুঁয়েছে তারা।

মাঠের এই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের পেছনে মূল চালিকাশক্তি দলটির প্রধান কোচ বুবিস্তা। উরুগুয়ে ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি ফুটবল বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন এক জীবনদর্শন। পরাশক্তিদের রুখে দেওয়ার রহস্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বুবিস্তা বলেন, ‘একটি দেশ ছোট হতে পারে, অর্থনৈতিক সমস্যা থাকতে পারে, কিন্তু যদি তাদের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা, কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা এবং গোছানো পরিকল্পনা থাকে, তবে তারা বিশ্বের বড় বড় দলগুলোর সঙ্গেও পাল্লা দিতে পারে—যাদের দলে বিশ্বমানের খেলোয়াড় ও সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।’

কেপ ভার্দের এই রূপকথা কেবল মাঠের ১১ জনের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। গোলপোস্টের নিচে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে ওঠা গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার প্রথম ম্যাচের পর একলাফে ২০ হাজার থেকে ১৫ মিলিয়নে পৌঁছানো কিংবা গ্যালারিতে কেপ ভার্দে সমর্থকদের ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান প্রমাণ করে, এই দলের পেছনে স্পন্দন হয়ে কাজ করছে একটি পুরো জাতি।

কোচ বুবিস্তার কথাতেও সেই সুর প্রতিধ্বনিত, ‘আমরা এখানে শুধু ফুটবল খেলার জন্য আসিনি, বরং সারা বিশ্বের কাছে আমাদের দেশ, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের সংগীত এবং স্টেডিয়ামে আমাদের দর্শকদের উন্মাদনাকে তুলে ধরতে এসেছি। আমাদের দলই আমাদের দেশের মানুষের আসল পরিচয়।’

গ্রুপ ‘এইচ’-এর সমীকরণে ২ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তিনে থাকলেও কেপ ভার্দের সামনে এখন নকআউটের দরজা উন্মুক্ত। আগামী শনিবারে সৌদি আরবের বিপক্ষে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে জয় পেলেই নিশ্চিত হবে শেষ বত্রিশের টিকিট। ফুটবল মাঠে নামের ওজন বা অর্থনৈতিক প্রাচুর্য যে শেষ কথা নয়, সাহসের জোর আর নিখুঁত রণকৌশলই যে আসল শক্তি—তা চলতি বিশ্বকাপে ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিচ্ছে কেপ ভার্দে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত