Ajker Patrika

বিশ্বকাপবিদ্বেষী না হয়ে উপভোগের আহ্বান

রানা আব্বাস
বিশ্বকাপবিদ্বেষী না হয়ে উপভোগের আহ্বান
ছবি: সংগৃহীত

নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে বিশ্বকাপের আমেজ যেন খুব কমই পাওয়া গেল। যে শহরে হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপের মতো এত বড় ফুটবল উৎসব, সারা বিশ্ব থেকে আগত হাজারো অতিথিকে স্বাগত জানাতে শুধু এক-দুইটা ব্যানার, ব্যাকড্রপ চোখে পড়ল। এর মধ্যে একটাতে দেখা যাচ্ছে, স্ট্যাচু অব লিবার্টির পায়ে বল! তাতে বড় করে লেখা, ‘আই অ্যাম অ্যাট দ্য হোম অব দ্য ফাইনাল’।

নিউইয়র্ক-নিউজার্সিতে পাঁচটি গ্রুপপর্বের ম্যাচসহ তিনটি নকআউট পর্বের ম্যাচ। এর মধ্যে আছে ফাইনালও। নিউইয়র্ক বন্দর কর্তৃপক্ষের তাই মনে হয়েছে, এত মানুষ আসবেন, একটু ‘স্বাগত’ না জানালে কেমন হয়! সে কারণেই হয়তো যৎসামান্য ব্যবস্থা। এই বিশ্বকাপটা কি এমনি এমনি ‘মোস্ট নন-ওয়েলকামিং’ বলা হচ্ছে! আজকের পত্রিকার বিশ্বকাপ ম্যাগাজিন ‘চ্যাম্পিয়নে’ কলকাতার বিখ্যাত ক্রীড়া লিখিয়ে গৌতম ভট্টাচার্য লিখেছেন, এখনো সোশ্যাল মিডিয়ায় আমি কোনো মার্কিন পোস্টে দেখছি না, যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভিডিও বার্তায় বলা হচ্ছে, বিশ্বকাপটা আপনি কী করে ভালো করে দেখবেন। ট্রাম্প বলছেন যে ‘১৫টা উপায় বাতলে দিচ্ছি। এভাবে আপনি বিশ্বকাপ আরও ভালো করে দেখতে পারেন, আরও ভালো এনজয় করতে পারেন। আমার দেশে আসুন।’

অথচ ব্রাজিল-কাতার কিন্তু প্রতিটি পর্যায়ে মানুষকে আশ্বস্ত করেছিল, স্বাগত জানিয়ে বলেছিল, ‘আসুন এনজয় করুন, দুই হাতে আলিঙ্গন করুন আমাদের বিশ্বকাপ।’ বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে সমালোচনা আগেও হয়েছে। কিন্তু এবার যেন একটু বেশিই হচ্ছে।

বলা হচ্ছে, এটা নাকি ধনীদের বিশ্বকাপ, করপোরেটদের বিশ্বকাপ, যেটা বিশ্বকাপের মূল সুরের সঙ্গে একেবারেই বেমানান। আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিপরীতে ফিফাও ঠিক আগের মতো অনাবিল নয়।

বিশ্বকাপ নিয়ে যত সমালোচনাই হোক, ফুটবলপ্রেমী মার্কিনরা অবশ্য আহ্বান করছেন, গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থের রোমাঞ্চে ডুবে যেতে।

টাইমস অব নিউইয়র্কের বিশাল এক নিবন্ধ লেখা হয়েছে বিষয়টি নিয়ে। বিল সাপোরিটোর লেখা ‘বিশ্বকাপকে ঘৃণা করার দলে যোগ দেবেন না’ শিরোনামে নিবন্ধের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে দিচ্ছি—

এবার সমালোচনার খোরাক আরও বেশি। শুরুতেই আছে ফিফার চড়া দামে টিকিট বিক্রির চেষ্টা। কেপ ভার্দে বনাম সৌদি আরব কিংবা জর্ডান বনাম আলজেরিয়ার মতো ম্যাচের টিকিটও এমন দামে বিক্রি করা হয়েছে, যেন সেটা ব্রাজিল বনাম স্পেনের মতো মহারণ।

হোটেল কক্ষ অবিক্রীত পড়ে থাকার বিষয়টি নিয়েও কথা হচ্ছে। আবার অনেকে বলছেন, দলসংখ্যা বাড়ানোর কারণে টুর্নামেন্টে অনেক দুর্বল দল সুযোগ পেয়েছে, যারা বড় দলগুলোর কাছে বিধ্বস্ত হবে।

কিন্তু খুব শিগগিরই এসব আলোচনা গুরুত্ব হারাবে। বৃহস্পতিবার যখন সহ-আয়োজক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে ঐতিহাসিক আসতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের পর্দা উঠবে, তখন পুরো স্টেডিয়াম ‘এল ত্রি’ (মেক্সিকো দল)-এর সমর্থনে উন্মাদনায় ফেটে পড়বে।

পরদিন লস অ্যাঞ্জেলেসে যুক্তরাষ্ট্র বনাম প্যারাগুয়ে এবং টরন্টোতে কানাডা বনাম বসনিয়া-হার্জেগোভিনার ম্যাচেও একই রকম আবেগ-উচ্ছ্বাস দেখা যাবে বলে আশা করা যায়। একজন আমেরিকান কোচের অধীনে খেলা কানাডার জন্য বাড়তি প্রেরণাও আছে, কারণ নকআউট পর্বে তাদের মুখোমুখি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ বলা হয়? মাঠেই দেখা যাবে তার জবাব।

উচ্চমূল্যের পরও প্রায় সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। তবে প্রশ্ন হলো, আসলে কারা গ্যালারিতে বসবে?

ফিফার তথাকথিত ‘ডায়নামিক টিকিটিং’ ব্যবস্থা—যাকে আমি বরং ‘প্রতারণামূলক টিকিটিং’ বলতে চাই—অনেক সমর্থককে তাঁদের সামর্থ্যের চেয়ে বেশি দাম দিতে বাধ্য করেছে।

হোটেল কক্ষ খালি পড়ে থাকা থেকে বোঝা যায়, অনেকেই হয়তো তাঁদের টিকিট পরে পুনরায় বিক্রি করে দেবেন। এটাও ইঙ্গিত করে যে বহু বিদেশি সমর্থক হয়তো যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারছেন না, কিংবা ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে আসতে ভয় পাচ্ছেন।

ফলে হয়তো আরও বেশি আমেরিকান পরিবার, বিশেষ করে বাবা-মায়েরা, তাঁদের সন্তানদের নিয়ে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। সেটাও কিন্তু একেবারে খারাপ নয়।

১৯৯৪ সালে, যখন প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ হয়, তখন সমালোচকেরা প্রায় আনন্দে আত্মহারা ছিলেন! তাঁরা বলতেন, এমন ‘একঘেয়ে’ খেলায়, বিশেষ করে আমেরিকানরা, কেউই আগ্রহ দেখাবে না।

কিন্তু নিউজার্সির জায়ান্টস স্টেডিয়ামে ইতালি ও আয়ারল্যান্ডের ম্যাচটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। কানায় কানায় পূর্ণ স্টেডিয়ামের পরিবেশ ছিল চার বছর আগে ইতালিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে দেখা যেকোনো ম্যাচের মতোই রোমাঞ্চকর।

এরপর যখন তুলনামূলক দুর্বল বলে বিবেচিত যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী কলম্বিয়াকে হারিয়ে দিল, তখন পুরো টুর্নামেন্ট যেন বিস্ফোরিত হলো উচ্ছ্বাসে। আমেরিকানরা অবশেষে বিশ্ব ফুটবলের বড় মঞ্চে নিজেদের সামর্থ্য দেখাতে শিখেছে—এমনটাই মনে হয়েছিল সবার। নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ব্রাজিল, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আরও বহু দেশের সমর্থকেরা নিজেদের মতো করে উৎসব করে গেছেন। কারণ একটি বিষয় সব সময়ই সত্য—ফুটবলপ্রেমীরা তাঁদের প্রিয় বিশ্বকাপ উপভোগ করার পথ খুঁজে নেন।’

বিল তাঁর লেখাটা শেষ করেছেন এভাবে, ‘হ্যাঁ, এটাও সত্য যে টুর্নামেন্টের আয়োজক দেশগুলোর একটির নেতৃত্বে আছেন একজন বিদেশিবিদ্বেষী ও লোভী রাজনীতিক, যিনি মিত্রদের দূরে ঠেলে দিয়ে স্বৈরশাসকদের সান্নিধ্য লাভের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ফুটবল সমর্থকেরা এসব উপেক্ষা করবেন।

তাঁদের ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ক্ষেত্রেও একই কাজ করতে হয়েছে। বিশ্বকাপবিরোধীদের মতো ফুটবলপ্রেমীরা ঘৃণা প্রচারকারী নন। তাঁরা এখানে এসেছেন কারণ তাঁরা এই সুন্দর খেলাটিকে ভালোবাসেন।’

নিউইয়র্ক শহরে যতটুকু চোখ পড়েছে, ফুটবল উৎসবের ব্যাপক রং লেগেছে, তাও নয়। খেলা হবে নিউইয়র্ক থেকে ২০-২২ কিলোমিটার দূরের নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। বিশ্বকাপের আমেজটা বুঝতে তাই স্টেডিয়ামের কাছেই যেতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত