Ajker Patrika

৯০ বছরের অমীমাংসিত গাণিতিক সমস্যা ৮৮ ঘণ্টায় সমাধান করল ১০ হাজার এআই বট

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
৯০ বছরের অমীমাংসিত গাণিতিক সমস্যা ৮৮ ঘণ্টায় সমাধান করল ১০ হাজার এআই বট
ওপেনএআই দাবি করেছে, তাদের এআই মডেল ও কয়েক হাজার বট মাত্র ৮৮ ঘণ্টায় ৯০ বছরের পুরোনো এক অমিমাংসীত গাণিতিক সমীকরণ সমাধান করেছে। প্রতীকী ছবি

নতুন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল এবং হাজার হাজার এআই বট কয়েক দশক ধরে অমীমাংসিত থাকা এক জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়েছে। তাও আবার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এ সমাধান খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছে চ্যাটজিপিটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি গতকাল মঙ্গলবার জানিয়েছে, প্রায় ১০ হাজার এআই এজেন্ট বা বটকে একটি নির্দিষ্ট কাজে নিয়োজিত করে তারা মাত্র ৮৮ ঘণ্টায় একটি অত্যন্ত কঠিন গণিতের সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়েছে। এসব এআই এজেন্ট কিছুটা স্বায়ত্তশাসিতভাবে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে পারে।

গাণিতিক সমস্যাটি ন্যাভিয়ার-স্টোকস সমীকরণের অংশ। এই সমীকরণটি তরল কীভাবে প্রবাহিত হয়, তা ব্যাখ্যা করে। প্রায় ৯০ বছর ধরে এই সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকের কোনো গাণিতিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট গাণিতিক সমীকরণ সঠিক, সেটি প্রমাণ করার মতো যুক্তি এতদিন পাওয়া যায়নি। ওপেনএআই তাদের পাওয়া সমাধানকে ‘মাইলফলক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং বলেছে, এটি প্রমাণ করে যে এআই প্রযুক্তির সক্ষমতা দ্রুত উন্নত হচ্ছে।

তবে ওপেনএআইয়ের সমাধানটি এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গণিতবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ক্লে ম্যাথমেটিক্যাল ইনস্টিটিউটও এটি প্রকাশ্যে গ্রহণ করেনি। এই প্রতিষ্ঠানই মিলেনিয়াম প্রাইজ পরিচালনা করে। নির্দিষ্ট কয়েকটি কঠিন গাণিতিক সমস্যার সমাধান প্রথমবারের মতো করতে পারলে এই পুরস্কারের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়া হয়।

ওপেনএআই জানিয়েছে, আগস্টের শেষ দিকে তারা একটি নতুন মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে। খুব দ্রুতই দেখা যায়, মডেলটি গণিতে অত্যন্ত দক্ষ। এআই মডেল হলো এমন কম্পিউটার প্রোগ্রাম, যেগুলো বিপুল পরিমাণ তথ্যের ওপর প্রশিক্ষিত হয়ে তথ্যের মধ্যে থাকা বিভিন্ন ধরন ও প্যাটার্ন শনাক্ত এবং পূর্বাভাস দিতে শেখে।

ওপেনএআইয়ের নতুন মডেলটি এখনো শুধু প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরেই ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ, এটি কোম্পানির সর্বশেষ প্রকাশিত এআই মডেলের তুলনায় ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি সক্ষম।’ তাই গবেষকেরা এটিকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও উন্নত পর্যায়ের গণিতের সমস্যা সমাধানে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন।

ওপেনএআই স্বীকার করেছে, গত সপ্তাহে ১ সেপ্টেম্বর তারা ‘গুজব শুনেছিল’ যে মিলেনিয়াম প্রাইজের দুটি সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। এরপর প্রতিষ্ঠানটি অবশিষ্ট সমস্যাগুলোর কয়েকটি সমাধানের চেষ্টা করতে নতুন অভ্যন্তরীণ মডেলে প্রশিক্ষিত হাজার হাজার এআই বটকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে, অর্থাৎ ১০ হাজার এআই বটকে কাজে লাগানোর প্রায় ৮৮ ঘণ্টা পর, ওপেনএআই ন্যাভিয়ার-স্টোকস সমীকরণের এক্সিজটেন্স অ্যান্ড স্মুথনেস প্রবেলেমের বা ন্যাভিয়ার-স্টোকস সমীকরণের অস্তিত্ব ও মসৃণতা সমস্যার একটি সমাধান খুঁজে পায়।

এই সমস্যাটি টার্বুলেন্স বা অশান্ত প্রবাহের একেবারে কেন্দ্রে। টার্বুলেন্স এমন একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, যা এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি। এআই বটগুলোর সমাধানে পৌঁছাতে তুলনামূলকভাবে খুব কম সময় লাগলেও, ওপেনএআই জানিয়েছে, শুধু ন্যাভিয়ার-স্টোকস সমস্যাটি নিয়েই বটগুলো নিজেদের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ বার্তা আদান-প্রদান করেছে।

এ ছাড়া তারা মোট ১৩০ বিলিয়ন আউটপুট টোকেন ব্যবহার করেছে। টোকেন বলতে এআই মডেল কোনো উত্তরে যে পৃথক পৃথক টেক্সট বা কোড তৈরি করে, সেগুলোকে বোঝানো হচ্ছে। ওপেনএআইয়ের নিজেদের সবচেয়ে উন্নত মডেলগুলোর আউটপুটের জন্য নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, এত বিপুল পরিমাণ কাজ করতে আনুমানিক ১ কোটি ডলার খরচ হতো।

ওপেনএআই এখন যে সমাধান পেয়েছে বলে দাবি করছে, তা মিলেনিয়াম প্রাইজের নির্ধারিত প্রমাণের চারটি বক্তব্যের মধ্যে দুটি সমাধান করেছে। এই পুরস্কারের মূল্য ১০ লাখ ডলার। ওপেনএআই মঙ্গলবার বলেছে, ‘এই ফলাফল প্রকাশ করার পেছনে আমাদের লক্ষ্য হলো আমাদের এআই মডেলগুলোর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা জানানো।’ প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, ‘এই ফলাফলের জন্য আমরা মিলেনিয়াম প্রাইজ দাবি করার লক্ষ্য রাখি না।’

তবে এরই মধ্যে ওপেনএআইয়ের এই দাবি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক ট্রিস্টান বাকমাস্টার মঙ্গলবার বলেন, তিনি এবং ওপেনএআইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকে কর্মরত গণিতবিদ লেভেন্ট আলপোগেও এই সমস্যার সমাধানের জন্য কাজ করছিলেন।

এই দুজন তাদের গবেষণার কাজে ওপেনএআইয়ের ‘কোডেক্স’ (Codex) নামের টুল ব্যবহার করছিলেন। তবে বাকমাস্টার বলেন, ৩ সেপ্টেম্বর তিনি জানতে পারেন যে তাদের অগ্রগতির বিষয়ে ‘তথ্য ওপেনএআইয়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।’

বাকমাস্টারের এই বক্তব্য প্রকাশিত হয় একই দিনে, তবে কয়েক ঘণ্টা আগে ওপেনএআই তাদের ন্যাভিয়ার-স্টোকস নিয়ে করা কাজ প্রকাশ করে। বাকমাস্টার দাবি করেন, তাদের কাজের বিষয়ে তথ্য ওপেনএআইয়ের কাছে পৌঁছানোর ‘পরেই’ প্রতিষ্ঠানটি ন্যাভিয়ার-স্টোকস সমীকরণ নিয়ে কাজ শুরু করে। তিনি ওপেনএআইয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে আদান-প্রদান করা ইমেইলের কিছু অংশও প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি প্রতিষ্ঠানটির কাজ শুরু করার সময় এবং তারা কী পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

বাকমাস্টার আরও বলেন, তিনি এখনো ওপেনএআইয়ের সম্পূর্ণ প্রমাণটি পড়েননি। তবে তিনি প্রকাশ্যে আসতে বাধ্য হয়েছেন, কারণ ‘আমাকে কী বলা হয়েছিল, কখন বলা হয়েছিল এবং আমাকে কী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল’ তা জানানো জরুরি মনে করেছেন। তিনি বলেন, এর বিকল্প হলো এমন একটি ধারাবাহিক ঘোষণা চলতে দেওয়া, যা তিনি জানেন ‘মিথ্যা।’

মঙ্গলবার ওপেনএআই বাকমাস্টার ও আলপোগের ‘কাজের’ প্রশংসা করেছে এবং সেটিকে ‘অসাধারণ’ বলে অভিহিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তারা বাকমাস্টার ও আলপোগের কোনো কাজ ‘তারা প্রকাশ্যে প্রকাশ করার আগে কোনো উপায়েই দেখেনি।’ ওপেনএআই আরও বলেছে, ন্যাভিয়ার-স্টোকস সমস্যায় কাজ করার সময় কোনো ব্যবহারকারীর তথ্যও ব্যবহার করা হয়নি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত