Ajker Patrika

ইডেন–বদরুন্নেসা–হোম ইকোনমিকস নিয়ে ‘বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয়’ গড়তে চায় জামায়াত

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ২২: ২২
ইডেন–বদরুন্নেসা–হোম ইকোনমিকস নিয়ে ‘বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয়’ গড়তে চায় জামায়াত
জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত পলিসি সামিট-২০২৬–এ রূপরেখা উপস্থাপন করেন দলটির আমির শফিকুর রহমান। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে। ছবি: সংগৃহীত

ক্ষমতায় গেলে রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে ও হোম ইকোনমিকস কলেজকে (বাংলাদেশ গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ) একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবে জামায়াতে ইসলামী। এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বড় কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হবে বলেও ঘোষণা দিয়েছে দলটি।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে জামায়াত আয়োজিত ‘পলিসি সামিট ২০২৬ ’–এ দলটির পক্ষ থেকে এসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

ফ্যাসিবাদী শাসনের একটি অন্ধকার অধ্যায় পার করে দেশ এখন গণতান্ত্রিক রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বলে মন্তব্য করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ‘এই পথে এখনো বড় বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। প্রধান চ্যালেঞ্জ এখন টিকে থাকা নয়, বরং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।’

দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও কর্মসংস্থানের মান কমে গেছে। বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে। অধিকাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক, অনিরাপদ ও স্বল্প আয়ের কাজে নিয়োজিত। শিক্ষিত তরুণেরা শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে রূপান্তর ঘটাতে পারছেন না, আর নারীরা সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনো নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন।

তাই শুধু প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়, মানুষের জীবনে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও পরিকল্পনার সক্ষমতা তৈরি করাই অর্থনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন জামায়াত আমির।

সুশাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়ন করা হবে। অতীতে জামায়াতের নেতৃত্বে পরিচালিত মন্ত্রণালয়গুলোতে দুর্নীতিমুক্ত ও দক্ষ প্রশাসনের নজির রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

শফিকুর রহমান আরও বলেন, রাষ্ট্র ও নাগরিক, সরকারি ও বেসরকারি খাত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে।

পলিসি সামিটে ঘোষিত প্রস্তাবে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তরুণসমাজ ও আইসিটি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও সমতা বাস্তবায়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশের কৌশল: শাসন কাঠামোর রূপরেখা’, ‘সমৃদ্ধির প্রসার: অর্থনীতি, ব্যবসা এবং বিনিয়োগ’, ‘তরুণদের কর্মসংস্থান: জেন-জি ও আলফা প্রজন্মের সম্ভাবনা উন্মোচন’, ‘সমতা বাস্তবায়ন: নারী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগের কার্যকর প্রয়োগ’, ‘আগামীর শিক্ষা: পরিবর্তনের জন্য নীতি, স্বাস্থ্যসেবা: রূপান্তরের জন্য নীতি’-শীর্ষক ছয়টি সেশন ছিল। সেখানে বক্তারা সরকারে গেলে এসব বিষয়ে জামায়াতের ভূমিকা কী হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

জামায়াতের নেতারা জানান, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়। ট্যাক্স ও ভ্যাটের হার ধাপে ধাপে কমিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে ট্যাক্স ১৯ শতাংশ এবং ভ্যাট ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড চালুর মাধ্যমে এনআইডি, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিকসেবা একীভূত করার কথা বলা হয়।

এ ছাড়া প্রস্তাবে আগামী তিন বছরে শিল্প খাতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বন্ধ কলকারখানা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে চালু করে ১০ শতাংশ মালিকানা শ্রমিকদের দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসাবান্ধব নীতি, সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণের কথাও বলা হয়।

শিক্ষা খাতে গ্র্যাজুয়েশন শেষে চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ দুই বছর মেয়াদে পাঁচ লাখ গ্র্যাজুয়েটকে মাসিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটি বলেছে, মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে ১ লাখ শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ এবং প্রতিবছর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ১০০ শিক্ষার্থীকে বিশেষ সহায়তা করা হবে। ইডেন, বদরুন্নেসা ও হোম ইকোনোমিক্স কলেজ একীভূত করে বৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বড় কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পরিকল্পনাও রয়েছে। সব নিয়োগ মেধাভিত্তিক হবে বলে জানানো হয়।

স্বাস্থ্য খাতে ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক ও পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং ‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেইজ প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

তরুণদের জন্য দক্ষ জনশক্তি ও জব প্লেসমেন্টে আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন, পাঁচ বছরে ১ কোটি তরুণকে বাজারভিত্তিক স্কিল প্রশিক্ষণ, প্রতিটি উপজেলায় ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ এবং প্রতিটি জেলায় ‘জেলা জব ইয়ুথ ব্যাংক’ স্থাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে পাঁচ বছরে ৫০ লাখ জব এক্সেস নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দলটি।

নারী, তরুণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে ৫ লাখ উদ্যোক্তা এবং ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরির পরিকল্পনার কথাও বলা হয়। আইসিটি খাতে ‘ভিশন ২০৪০’ ঘোষণা করে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ লাখ আইসিটি জব সৃষ্টি, ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়, জাতীয় পেমেন্ট গেটওয়ে স্থাপন এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

রেমিট্যান্স খাতে দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে পাঁচ থেকে সাত বছরে আয় দুই থেকে তিনগুণ বাড়ানো এবং প্রবাসী পেশাজীবী ও গবেষকদের দেশে ফিরিয়ে ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ কাজে লাগানোর পরিকল্পনা আছে জামায়াতের।

অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘আমাদের পূর্ণ প্রস্তুতি আছে। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে শুধু দল থেকে মন্ত্রী বানাবে বিষয়টা এমন নয়, আমরা বাংলাদেশের মানুষ থেকে মন্ত্রী বানাব। বাংলাদেশে তো অর্থমন্ত্রী হওয়ার মতো লোক আছে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হওয়ার লোক আছে। সুতরাং সব বাংলাদেশিকে নিয়ে যদি আমরা কনসিডার করি, তাহলে কি লোকের অভাব হবে?’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত