Ajker Patrika

আদালতে অভিযোগপত্র

রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড

  • প্রধান আসামি ফয়সালসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র।
  • আসামিদের মধ্যে ১১ জন গ্রেপ্তার, ফয়সালসহ ৬ জন পলাতক।
  • হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি বাপ্পীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
ওসমান হাদি। ছবি: সংগৃহীত
ওসমান হাদি। ছবি: সংগৃহীত

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদিকে হত্যা করা হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের পরিকল্পনায় ন্যক্কারজনক এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ বলেছে, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রাজধানীর পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি মো. তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীর (৪৩) সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

এই মামলার তদন্ত শেষে গতকাল মঙ্গলবার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ (৩৭), তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে মামলার তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। বাপ্পী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর। অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিদের মধ্যে ১১ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। ফয়সাল, হত্যার সময় মোটরসাইকেল চালানো আলমগীর শেখ, বাপ্পীসহ অন্য ৬ জন পলাতক।

ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর বেলা আড়াইটার দিকে তিনি ব্যাটারিচালিত রিকশায় করে যাওয়ার সময় পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তরা তাঁকে গুলি করে। মাথায় গুলিবিদ্ধ হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে তিনি মারা যান।

ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনায় পল্টন মডেল থানায় প্রথমে হত্যাচেষ্টা মামলা করা হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর এটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত করা হয়। মামলার তদন্ত করে ডিবি পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রভুক্ত ১৭ আসামির মধ্যে যে ১১ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন তাঁরা হলেন প্রধান আসামি ফয়সালের বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০), মা হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা (২১), মো. কবির (৩৩), মো. নুরুজ্জামান ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), ভারতে পালাতে সহায়তার অভিযোগ থাকা সিবিয়ন দিউ (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) ও হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র-গুলি উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার মো. ফয়সাল (২৫)।

পলাতক ৬ জন হলেন হত্যায় অংশ নেওয়া ফয়সাল করিম (৩৭) ও মো. আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর শেখ (২৬), মো. তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী, ভারতে পালাতে সহায়তাকারী ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১) ও জেসমিন আক্তার (৪২)।

পুলিশ ইতিমধ্যে জানিয়েছে, প্রধান আসামি ফয়সাল ও আলমগীর শেখ ১২ ডিসেম্বর রাতে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন। তাঁদের ভারতে পালাতে সহায়তা করেছেন সীমান্তপথে মানব পাচারে জড়িত ফিলিপ স্নাল, তাঁর সহযোগী সিবিয়ন দিউ ও সঞ্জয় চিসিম। তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ভিডিওতে ফয়সাল দাবি করেন, তিনি ভারতে নয়, দুবাইয়ে আছেন। পুলিশ বলেছে, ওই ভিডিওটি যাচাই করে দেখা হচ্ছে।

অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পরপরই বিকেলে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের পরিকল্পনায় ন্যক্কারজনক এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বিগত সময়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনামূলক জোরালো বক্তব্য দিতেন। এতে ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হন।

মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ওসমান হাদিকে গুলি করা এজাহারভুক্ত পলাতক আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ফয়সাল করিম এবং তাঁর প্রধান সহযোগী মো. আলমগীর হোসেনকে পালানোর বিষয়ে সার্বিক সহায়তাকারী এবং তদন্তে পাওয়া তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি ও ডিএনসিসির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ মনোনীত কাউন্সিলর ছিলেন। আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং শহীদ হাদির পূর্ববর্তী বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্য থেকে এটি পরিষ্কার, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ডিবিপ্রধান জানান, গ্রেপ্তার আসামি ও সাক্ষীদের জবানবন্দি, সিসি ক্যামেরা ফুটেজ বিশ্লেষণ, উদ্ধার করা আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলোর ফরেনসিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও সার্বিক তদন্ত শেষে ঘটনার সঙ্গে পলাতক ফয়সাল করিম, আলমগীর হোসেনসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এই মামলায় নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে বা অন্য কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।

মামলার তদন্তকালে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের ব্যালিস্টিক পরীক্ষার প্রতিবেদন ‘পজিটিভ’ এসেছে বলে জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম।

প্রধান আসামি ফয়সালের স্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদী সদরের তরুয়া বিল থেকে ফয়সাল নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। তাঁর দেখানো মতে, তরুয়া বিল থেকে হাদি হত্যায় ব্যবহৃত পিস্তল ও গুলি উদ্ধার করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, হাদি হত্যার পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা কি বাপ্পী? জবাবে ডিবিপ্রধান বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বাপ্পীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ওসমান হাদি নতুন ধরনের এক রাজনীতি শুরু করেছিলেন এবং তাঁর বক্তৃতার মাধ্যমে পতিত সরকার, আওয়ামী লীগ বা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক বক্তব্য দিচ্ছিলেন। এসব সমালোচনার কারণেই ফয়সালকে দিয়ে হাদিকে হত্যা করানো হয়। এই মামলার আসামি এবং গুলিবর্ষণকারী হিসেবে চিহ্নিত ফয়সাল করিম ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও তাঁর সহযোগী আলমগীর আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী। তবে এই তিনজনের কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাঁরা পলাতক।

প্রধান আসামি ফয়সাল সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ওই ভিডিও বার্তায় আরও দাবি করেন, ওসমান হাদি হত্যা মামলায় তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে ফাঁসানো হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ডিবিপ্রধান বলেন, ‘ফয়সালের ওই ভিডিও বার্তা পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হয়েই আমরা অভিযোগপত্র দিয়েছি। ভিডিও বার্তাটি ঠিক আছে, কিন্তু অবস্থানটা ঠিক নয়। ফয়সাল দুবাইয়ে থাকার যে দাবি করেছেন, তা করতেই পারেন। আমরা তাঁকে পলাতক হিসেবে ধরে নিচ্ছি। তাঁর ভারতে থাকার বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ আছে।’

ফয়সাল করিম ও আলমগীরকে ভারতে পালাতে সহায়তার অভিযোগে মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছিল বলে যে বক্তব্য ডিএমপি এর আগে দিয়েছিল, তা সঠিক বলেও জানান শফিকুল ইসলাম।

অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী আজ বুধবার এই অভিযোগপত্র দেওয়া হবে বলে এর আগে জানিয়েছিলেন। এর এক দিন আগেই গতকাল অভিযোগপত্র দেওয়া হলো। হাদিকে গুলি করার ২৫ দিনের মাথায় অভিযোগপত্র দিল ডিবি পুলিশ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

তারেক রহমানের অনুরোধে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন হাসনা মওদুদ

‘চাইলে বাংলাদেশে ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের আচরণ অনুসরণ করুন, কিন্তু খেলোয়াড় কেন বলির পাঁঠা’

নিখোঁজ এনসিপি সদস্য ওয়াসিমের সন্ধান মিলল মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে

ঢাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে গুলি করে হত্যা

রুশ পতাকাবাহী ট্যাংকারটি ধরেই ফেলল মার্কিন বাহিনী, আটলান্টিকে টানটান উত্তেজনা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত