Ajker Patrika

চিকিৎসাব্যবস্থার দীনতা

সম্পাদকীয়
চিকিৎসাব্যবস্থার দীনতা

২০২৬ সালের ‘উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সম্মেলন’-এ প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এ ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের স্বাস্থ্য খাতের গভীর সংকটগুলো চিহ্নিত করা এবং তা নিরসনে পুরো ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ছাড়া সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের একটা বড় সমস্যা হলো সরকারি-বেসরকারি সব বিশেষজ্ঞ হাসপাতাল রাজধানীকেন্দ্রিক। ফলে সাধারণ মানুষজন উপজেলা পর্যায় থেকে ভালো চিকিৎসা পেতে ঢাকায় আসতে বাধ্য হয়। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক, জনবল, ধারণক্ষমতা ও যন্ত্রপাতির সংকটের কারণে ভালো চিকিৎসা পাওয়া দুর্লভ ব্যাপার। আবার শয্যা পাওয়া থেকে পরীক্ষার জন্য দালাল ছাড়া সিরিয়াল পাওয়া যায় না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারেও এসব হাসপাতাল স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এত সমস্যা-সংকট থাকার পরেও নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ এসব হাসপাতালে যেতে বাধ্য হয়। কারণ বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই। বিপরীতে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি বিরূপ হয়ে ধনিক শ্রেণির লোকজন ভারতসহ নানা দেশে চিকিৎসা নিতে যান। আবার এ দেশে ভুল চিকিৎসার হাজারো ঘটনা ঘটছে।

চিকিৎসকের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অভিযোগ—ব্যতিক্রম বাদে দেশের বেশির ভাগ চিকিৎসক রোগীবান্ধব নন। তাঁরা রোগীকে শুধু অর্থ আয়ের মাধ্যম হিসেবে দেখেন। ফলে কমিশন পাওয়ার লোভে বেশি বেশি ওষুধ এবং অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা দিয়ে থাকেন। চিকিৎসকেরা যেন ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা! তাঁরা শুধু গাদা গাদা ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেন। অনেকেই রোগ প্রতিরোধের জন্য জীবনযাপন পরিবর্তনের পরামর্শ দেন না। রোগ যে আসলে খাওয়াদাওয়া ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে হয়, সেটা অনেক নিম্নবিত্ত বা স্বল্পশিক্ষিত রোগী জানেন না। রোগীর সঙ্গে ভালোভাবে কথা না বলারও অভিযোগ আছে কোনো কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে।

অনিরাপদ খাদ্যের কারণে কিডনি, হৃদ্‌রোগ, ক্যানসার ইত্যাদি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এই ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পেতে রোগ প্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই। সে জন্য দরকার সরকারিভাবে মানুষকে সচেতন করা এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি তাঁদের ভর্তুকির ব্যবস্থা করা।

প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়তে হলে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তন। উপজেলাকেন্দ্রিক হাসপাতালগুলোতে পূর্ণাঙ্গ ‘স্পেশালাইজড ইউনিট’ গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় অন্তত মৌলিক রোগ নির্ণয়ের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যবস্থা করতে হবে।

চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা চালু করা এখন সময়ের দাবি। জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা সরকার নির্ধারণ করেছে এবং ই-হেলথ কার্ড প্রবর্তনের যে পরিকল্পনা নিয়েছে, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। এখন বাস্তবায়ন করা জরুরি।

স্বাস্থ্যসেবা কোনো করুণা নয়, বরং নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। মানবিক চিকিৎসক এবং সরকারের বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ছাড়া দেশের স্বাস্থ্য খাতের রোগ সারানো সম্ভব নয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত