
স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য কলকাতার বাঙালি সাংবাদিক। তিনি রাজনীতি, আইন, পরিবেশ, ইতিহাস ও সংস্কৃতিসহ নানা বিষয় নিয়ে ভারতের দ্য ওয়ার, স্ক্রোল, ফার্স্টপোস্টসহ বিভিন্ন পোর্টালে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও গবেষণাধর্মী লেখালেখি করেন। ‘মিশন বেঙ্গল: আ স্যাফরন এক্সপেরিমেন্ট’, ‘লালগড় অ্যান্ড দ্য লেজেন্ড অব কিষানজি’ ও ‘কোন পথে বাংলা’ বইগুলোর লেখক তিনি। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন, লাখ লাখ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার রাজনীতি, বিজেপির উত্থানের পরিপ্রেক্ষিত, বামদের ব্যর্থতা এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা।
আসন্ন পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরাসরি অভিযোগ, বিজেপি নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে নির্বাচনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। তাঁর এই অভিযোগের কারণ কী?
প্রথমে নির্বাচন কমিশনার এবং পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক আছে। ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের একটা নির্দেশ ছিল যে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করবে সরকারপক্ষ, বিরোধী দল ও প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত একটি কমিটি। কিন্তু সরকার দ্রুত আইন করে, এই কমিটিতে থাকবেন সরকারপক্ষের দুজন ও বিরোধীপক্ষের একজন। ফলে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের কমিটি সরকারের দখলে চলে যায়।
এই নতুন আইনে জ্ঞানেশ কুমারই প্রথম নিযুক্ত হন। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে দুটি মন্ত্রকে (মন্ত্রণালয়ে) কাজ করেছেন। কাশ্মীরের প্রশাসনিক পুনর্গঠন, রামমন্দির নির্মাণের মতো বিজেপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের দায়িত্ব সামলেছেন। তাই তাঁর নিয়োগ নিয়ে বিরোধীরা প্রথম থেকেই আপত্তি জানায়। কিন্তু ওই আইনকে চ্যালেঞ্জ করে শীর্ষ আদালতে যে মামলা হয়েছিল ২০২৪ সালে, তার শুনানি আজ অবধি শুরু হয়নি। ইতিমধ্যে বিভিন্ন রাজ্য নির্বাচনে তাঁর ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক ভোট চুরির অভিযোগ উঠেছে। তিনি বিজেপির ভাষায় কথা বলেন, এই অভিযোগ তুলেছে দেশের বিভিন্ন বিরোধী দল।
গত বছর বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন চালু হতেই তাঁর ভূমিকা নিয়ে একের পর এক বিতর্ক তৈরি হয়। ফলে বাংলায় এই বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে সংঘাতের ক্ষেত্র পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল। এরপরই দেখা যায়, বাংলার ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় কমিশনের আনা নানা নিয়ম বিজেপিকে সুবিধা করে দিচ্ছে। কমিশন বারবার বলেছে, তাদের মূল লক্ষ্য হলো ‘কোনো যোগ্য নাগরিক যেন বাদ না পড়েন; এবং কোনো অযোগ্য ব্যক্তি যেন অন্তর্ভুক্ত না হন’ এটি নিশ্চিত করা। কিন্তু ক্রমেই তাদের অবস্থান পাল্টে যায়।
‘কোনো অযোগ্য ভোটার যেন অন্তর্ভুক্ত না হন’—এই বিষয়টি নিশ্চিত করার ওপর এতটাই জোর দেওয়া হলো যে লাখ লাখ ভোটার অভিযোগ করেছেন, তাঁদের নাম অন্যায়ভাবে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে তাঁরা এই নির্বাচনে ভোট দেওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে, যেহেতু হাতে সময় কম, তাই প্রতিটি সম্ভাব্য যোগ্য নাগরিকের অন্তর্ভুক্ত হওয়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কিছু মানুষের ভোটাধিকার আপাতত স্থগিতই থেকে যাবে। কিন্তু সম্ভাব্য অযোগ্যদের বাদ দিতেই হবে।
বিহারের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার আগে কমিশন জানিয়েছিল যে যাদের নাম বিহারের ২০০৩ সালের ‘এসআইআর’ (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন) তালিকায় রয়েছে, তাদের নতুন করে কোনো নথিপত্র জমা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যৌক্তিক অসংগতি নামক একটি নতুন পদ্ধতি চালু করার ফলে হাজার হাজার মানুষ, যাদের নাম পশ্চিমবঙ্গে ২০০২ সালের তালিকায় ছিল, তারা এখন দেখছে যে তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে।
গত নভেম্বর মাসে বাংলায় এই প্রক্রিয়া শুরুর সময় কমিশন জানিয়েছিল, খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পরেই কেবল নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিকরা সেইসব ভোটারদের নোটিশ পাঠাবেন, যাঁদের তথ্য পূর্ববর্তী ভোটার তালিকার সঙ্গে মেলানো যায়নি—যাতে তাঁদের যোগ্যতার বিষয়টি যাচাই করা যায়। বাস্তবে দেখা গেল, ২০০২ সালের তালিকায় যাঁদের নাম ছিল—এমন লাখো মানুষকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যৌক্তিক অসংগতি ক্যাটাগরির আওতায় নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
এখানে কমিশন একটি নতুন পদ বা ক্যাটাগরি চালু করেছিল, যার নাম ‘মাইক্রো অবজারভার’; এদের অন্য রাজ্য থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল এবং এদের এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল যে এরা রাজ্যের নিয়মিত নির্বাচনী আধিকারিকদের সিদ্ধান্তকেও বাতিল বা অগ্রাহ্য করতে পারত। তবে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর এই মাইক্রো অবজারভারদের ক্ষমতা কমিয়ে ফেলতে হয়।
নথিপত্র জমা দেওয়ার অনুমোদিত তালিকায় রাজ্যের কর্তৃপক্ষের দ্বারা ইস্যুকৃত ‘ডোমিসাইল’ বা বাসস্থানের শংসাপত্রও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে বাংলায় হঠাৎ করেই বলা হলো যে এই নথিপত্র আর গ্রহণ করা হবে না। আইনি লড়াইয়ের পর সেই নির্দেশ সংশোধন করতে হয়। নির্বাচন কমিশনের নথিপত্রের তালিকায় রাজ্য বোর্ডগুলোর ইস্যু করা মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু প্রক্রিয়ার মাঝপথেই নির্বাচন কমিশন সেগুলো গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। আইনি লড়াইয়ের মুখে সেই সিদ্ধান্তও সংশোধন করতে হয়।
বিহারের ক্ষেত্রে নিয়ম ছিল যে বুথ লেভেল এজেন্ট বা রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রেরই বাসিন্দা হবেন। কিন্তু বাংলায় বলে দেওয়া হলো গোটা বিধানসভা কেন্দ্রের আওতাধীন যেকোনো ভোটকেন্দ্রের প্রতিনিধিরাই এই দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করেছে যে এই নিয়মটি মূলত বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে। কারণ, হাজার হাজার ভোটকেন্দ্রে বিজেপির কোনো সাংগঠনিক উপস্থিতি নেই। তাই এই নিয়মের সুবাদে তারা অন্য ভোটকেন্দ্রের সংগঠকদের কাজে লাগিয়ে সেসব কেন্দ্রেও নির্বাচনী প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পাবে।
ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ‘ফরম ৬’ ও ‘ফরম ৭’ জমা দেওয়ার সময়সীমা ও অন্যান্য বিধিনিষেধ শিথিল বা বর্ধিত করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে এটিও করা হয়েছে বিজেপিকে সহায়তা করার লক্ষ্যেই। এ কারণেই তৃণমূল কংগ্রেস এবং সিপিএম—উভয় দলই এই অভিযোগ উত্থাপন করেছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের মধ্যেই ভোটার তালিকায় সংশোধন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রায় ৯১ লাখ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আসল কারণ কী?
১১ বছর আগে নরেন্দ্র মোদি ভারতের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে একটি নতুন নাগরিকত্ব নীতি নিয়ে আসেন। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে, আসামের শিলচরে একটি জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময়, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী মোদি বলেন, ‘অন্যান্য দেশে নির্যাতিত ও ভুক্তভোগী’ হিন্দুদের প্রতি ভারতের দায়িত্ব রয়েছে। তাঁর মতে, বাংলাভাষী হিন্দুরা, যাঁরা তাঁদের ধর্মবিশ্বাসের জন্য বাংলাদেশে হয়রানির শিকার হয়ে দেশত্যাগ করেছিলেন, তাঁদের স্থান দিতেই হবে ভারতকে। কিন্তু ‘ভোটব্যাংকের রাজনীতি’র অংশ হিসেবে ভারতে ‘এনে বসানো’ মানুষ, যাদের মধ্যে ‘চোরাচালানকারী’রাও আছে, তাদের ‘ফিরে যেতে হবে’। তাঁর স্পষ্ট মতামত হলো, অন্য দেশ থেকে আসা হিন্দুরা ‘শরণার্থী’ আর মুসলমানরা ‘অনুপ্রবেশকারী’। অর্থাৎ, হিন্দুরা কেউ অর্থনৈতিক কারণে আসেননি, সবাই ধর্মীয় নির্যাতনের কারণে বাধ্য হয়ে এসেছেন। কিন্তু মুসলমানরা যাঁরা এসেছেন, তাঁরা এ দেশের সম্পদে ভাগ বসাতেই এসেছেন।
আসামে এটি ছিল এক নতুন প্রস্তাবনা। সেখানে ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিক থেকেই বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষদের অভিবাসন একটি উত্তপ্ত রাজনৈতিক বিষয় হয়ে আছে। বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষদের অভিবাসন নিয়ে অসমীয়া সংগঠনগুলোর বিরোধিতায় কোনো ধর্মীয় বিভাজন ছিল না। কিন্তু হিন্দু, মুসলিম ও অসমীয়া সংগঠনগুলো সকল সন্দেহভাজন বাংলাদেশিকে তাড়াতে চাইত।
আসামের পর এই একই কথা মোদি পশ্চিমবঙ্গেও বলেন। উত্তপ্ত হয় নির্বাচনী প্রচার। প্রবল হিন্দুত্বের হাওয়া তুলে ও সুশাসনের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তিনি ক্ষমতায় আসেন। পরের বছর, বিজেপির মূল সংগঠন, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে ভারসাম্যহীনতার চ্যালেঞ্জ’ নামে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। সেটা ২০১৫ সালের অক্টোবরের ঘটনা। সেখানে তারা বলে, ২০১১ সালের আদমশুমারির ধর্মীয় তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ‘গুরুতর জনসংখ্যাগত পরিবর্তন’ সামনে এসেছে। তারা আরও বলে, ‘বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর বৃদ্ধির হারে ব্যাপক পার্থক্য, অনুপ্রবেশ এবং ধর্মান্তরের ফলে’ ধর্মীয় জনসংখ্যার অনুপাতে ভারসাম্যহীনতা আসছে। এ ক্ষেত্রে তারা দেখায় যে, দেশের মুসলিম জনসংখ্যা ১৯৫১ সালে ৯.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১১ সালে ১৪.২৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে আর ‘দেশের অনেক জেলায় খ্রিষ্টান জনসংখ্যার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি’ ঘটেছে। এই ‘ভারসাম্যহীনতা’ দেশের ঐক্য, অখণ্ডতা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্য হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। সুতরাং দেশের জনসংখ্যা নীতির পর্যালোচনা প্রয়োজন।
এরপর ২০১৭ সালের মার্চে আবার একটি রেজল্যুশন নেয় আরএসএস। এবারে তারা এ বক্তব্য দেয় যে, ‘পশ্চিমবঙ্গে ক্রমবর্ধমান জিহাদি কার্যকলাপ’ বেড়ে গেছে। এখানেও অন্যতম বিষয় হলো, ১৯৫১ সালে রাজ্যের ৭৮.৪৫ শতাংশ হিন্দু জনসংখ্যা ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে ৭০.৫৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ‘এটি দেশের ঐক্য ও অখণ্ডতার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়,’ তারা বলে।
মোদ্দা কথা, মুসলমান জনসংখ্যা বেড়ে গেছে, কমাতে হবে। এরপর ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় এই নাগরিকত্ব ইস্যুকে কেন্দ্র করে প্রবল মেরুকরণ ঘটায় বিজেপি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ২০২২ সালে কর্ণাটকে, ২০২৩ সালে তামিলনাড়ুতে এবং ২০২৪ সালে দিল্লি, উত্তর প্রদেশ এবং ওডিশায় বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকেরা বাংলাদেশি সন্দেহে ব্যাপক হয়রানি এবং হেনস্তার সম্মুখীন হয়েছেন। এখানে ভোটার তালিকার এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনকে সেই পরিপ্রেক্ষিতেই দেখা হচ্ছে।
ভোটার তালিকা থেকে এই বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া কি বিজেপির ভোটব্যাংককে শক্তিশালী করার কোনো কৌশল?
সেভাবেই বিষয়টি দেখা হচ্ছে।
বিভিন্ন দুর্নীতি, চাঁদাবাজিসহ একাধিক অভিযোগের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-মন্ত্রীদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার প্রভাব এ নির্বাচনে পড়ার আশঙ্কা কতটুকু?
প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া আছে। কিন্তু ভোটার তালিকা সংশোধনসংক্রান্ত হইচইতে অন্য বিষয়গুলো খানিক চাপা পড়ে গেছে।
পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর বামফ্রন্ট ক্ষমতায় থাকার পরও তৃণমূল কংগ্রসের প্রতিপক্ষ দল কেন ও কীভাবে বিজেপি হয়ে উঠল?
কারণ, পশ্চিমবঙ্গে সংঘের বৃদ্ধি অনেকগুলো বিষয়ের প্রভাবে হয়েছে। এখানে তাদের উত্থান অনেকটাই জাতীয় স্তরে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কয়েক বছর ধরে সারা বিশ্বেই দক্ষিণপন্থী চিন্তাধারার আবেদন বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদ একদিকে পুঁজির ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীকরণ ও সামাজিক সম্পদের লুণ্ঠন ও অন্যদিকে ব্যক্তির ক্রমবিচ্ছিন্নতার (আইসোলেশন) মধ্যে দিয়ে যে সামাজিক অস্থিরতা ও আশঙ্কা তৈরি করেছে, তা থেকে দ্রুত মুক্তির পথ হিসেবে অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ দক্ষিণপন্থীদের চিন্তাভাবনাকে সমর্থন করছে। ভারতেও সেই প্রভাব পড়েছে।
তা সত্ত্বেও, এই শক্তি কেরালা, তামিলনাড়ু, অন্ধ্র প্রদেশ ও তেলাঙ্গানায় সেভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। কিন্তু বাংলায় দ্রুতগতিতে শক্তি বৃদ্ধি পেল কেন, সে প্রশ্ন অস্বীকার করা যায় না। বাংলায় সংঘের উত্থানের পেছনে নিশ্চয়ই তৃণমূলের একটা বিশেষ ভূমিকা আছে, তা সে ১৯৯৮ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে মোটের ওপর বিজেপির সঙ্গেই জোটে থাকা হোক, বা ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের কিছু আগে-পরে থেকে তৃণমূলের মঞ্চে কিছু হিন্দু মৌলবিদের উপস্থিতি—এগুলোই সংঘকে বল জুগিয়েছে।
কিন্তু বামেরাও তাঁদের সমর্থকদের ধরে রাখতে পারেননি। নিশ্চয়ই রাজনৈতিক হিংসার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া অনেক বাম কর্মীর বিজেপিতে যাওয়ার (কিছু নেতাও গেছেন) একটা কারণ। কিন্তু রাজ্যের অনেক ক্ষেত্রে আমি সাবেক বাম কর্মী বা সংগঠকদের কট্টর হিন্দুত্ববাদী সুরে কথা বলতে শুনেছি। সংঘের শাখায় দেখেছি। রাজনৈতিক আশ্রয়ের কারণে যাঁরা ডান দিকে গেছেন, তাঁদের অনেকেরই বামবিরোধী মগজধোলাই হয়েছে। সংঘ তো সেটা করবেই। আবার বামদেরকেই সংঘ প্রধান মতাদর্শগত শত্রু বিবেচনা করে। সংঘের অনেকেই মনে করেন, সাবেক বাম কর্মীরাই তাঁদের শ্রেষ্ঠ স্বয়ংসেবক হতে পারেন, কারণ তাঁদের মধ্যে মতাদর্শগত কর্মকাণ্ডের একটা প্রবণতা আছে এবং নিজের আখের গোছানোর বাইরে কিছু করার প্রবণতা আছে।
ঘটনাচক্রে জাতীয়ভাবে হিন্দুত্ববাদীদের উত্থানের সময়ই, ২০১৪-১৫ সাল নাগাদ, সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট জঙ্গি সংগঠনের কার্যকলাপ যখন বিশ্বজুড়েই ইসলাম বিদ্বেষ ছড়ানোয় বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল, ওই একই সময়ে বাংলাদেশে ইসলামি শক্তির একটা উত্থান ঘটে, মূলত শাহবাগ আন্দোলনের একটি প্রতিক্রিয়া হিসেবে। ক্রমে আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু জঙ্গিগোষ্ঠী বাংলাদেশে সংখ্যালঘু ও মুক্তমনাদের ওপর একের পর এক হামলা চালায়। ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে।
এইসব ঘটনা হিন্দুত্ববাদীরা এখানে ব্যাপক প্রচার করে। বাংলাদেশ থেকে হিন্দু সংগঠনের নেতা-কর্মীদের, এমনকি ওপারের প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বদের, যেমন সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী শাহরিয়ার কবির, বিভিন্ন ফ্রন্টাল অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে কলকাতায় নিয়ে এসে সংবাদ সম্মেলন করানো হয়, যেখান থেকে তাঁরা মুসলিম মৌলবাদকে তুলোধোনা করেন। স্বাভাবিকভাবে তাঁদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম মৌলবাদ ও উগ্রবাদই মূল সমস্যা। কিন্তু এ রাজ্যের পরিপ্রেক্ষিতে সেই সব বক্তব্যের অন্য অনুরণন তৈরি হয়। সেই আবহে এখানে বর্ধমানে খাগড়াগড় বিস্ফোরণের পর বাংলাদেশি জঙ্গিগোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক খুঁজে পাওয়ার ঘটনায় এখানে হঠাৎই ইসলামাতঙ্ক ছড়ানোর একটা আদর্শ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
হঠাৎ উদ্ভূত এই নতুন পরিস্থিতি বাংলার সব কটি দলের মধ্যেই নানা রাজনৈতিক দোলাচলের সৃষ্টি করে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বাংলায় বিজেপির ব্যাপক উত্থানের পেছনে বাংলার অন্য সব কটি রাজনৈতিক দলের দায় আছে। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে শাসক দলের হিংসা যে তৃণমূলবিরোধী ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, সেই আবহে বাম এবং কংগ্রেসের সুস্পষ্ট নির্বাচনী সমঝোতায় আসতে না পারাটা তৃণমূলবিরোধী ভোট বিজেপির দিকে সংহত হওয়ার সহায়ক হয়। নির্বাচনী সাফল্য সংঘের বিস্তারের রাস্তা চওড়া করে।
বাংলাভাষী মানেই বাংলাদেশি—এমন একটা তত্ত্ব প্রচার করে পরিযায়ী শ্রমিকদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার করছে মূলত বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোর প্রশাসন। আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ডের মতো সরকারি প্রমাণপত্র দেখিয়েও রেহাই পাচ্ছেন না তাঁরা। বিষয়টি নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে কি? একই সঙ্গে তৃণমূলের তরফ থেকে পশ্চিমবঙ্গে এই তথাকথিত ‘বাংলাদেশি’ তকমার বিরুদ্ধে তেমন জোরালো প্রতিবাদ না থাকার কারণ কী?
২০২৪ সালের জুনে টানা তৃতীয় মেয়াদে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে হিন্দু মৌলবাদীরা ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের’ বিরুদ্ধে লাগাতার সুর চড়িয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে, ওডিশার নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার বলেছিল যে তারা অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করার জন্য রাজ্যব্যাপী একটি জরিপ করবে। ২০২৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে ঝাড়খন্ড বিধানসভা নির্বাচনে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের’ বিরুদ্ধে তুমুল বিষোদ্গার করা হয়, যা মূলত ঝাড়খন্ডে দীর্ঘদিনের বসবাসরত বাংলাভাষী মুসলমানদের উদ্দেশ করেই করা হয়।
এ বছর ফেব্রুয়ারিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দিল্লি পুলিশকে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার থেকে আসা অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর দেশব্যাপী অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের খুঁজে বের করে বহিষ্কারের অভিযান দ্রুতগতিতে শুরু করে। তারপর ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পেহেলগামে জঙ্গি হামলার পর ‘বাংলাদেশি’-বিরোধী অভিযান তীব্রতর হয়। বিভিন্ন বিজেপিশাসিত রাজ্যে ধরপাকড় শুরু হয় বাংলাভাষীদের, যাঁদের অধিকাংশই মুসলিম।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ বাংলাভাষী মুসলমান। পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামের জনসংখ্যার যথাক্রমে এক-চতুর্থাংশের বেশি এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি বাঙালি মুসলমান। তাঁরা আছেন পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী বিহার ও ঝাড়খন্ডেও। কথ্য ভাষার পার্থক্য থেকে বাঙালিরাই অনেক সময় বুঝতে পারেন না, কে কোন অঞ্চলের। ভিন্ন রাজ্যে পুলিশের কাছে তাই বাঙালিমাত্রেই সন্দেহজনক বাংলাদেশি। মুসলিম হলে তো কথাই নেই!
সরকার কর্তৃক জারি করা পরিচয়পত্র, যেমন আধার, প্যান, রেশন কার্ড বা ভোটার আইডিকে কোনো গুরুত্বই দেয়নি সেসব রাজ্যের পুলিশ। যুক্তি দিয়েছে যে এগুলো সহজেই জাল করা যেতে পারে। তারা চেয়েছে আরও ‘পোক্ত’ প্রমাণ। যেমন পাসপোর্ট, জন্মসনদ, জমির রেকর্ড, মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড বা শংসাপত্র,
১৯৭১ সালের পূর্ববর্তী ভোটার তালিকায় নাম, ইত্যাদি। বানান বা জন্মতারিখে অমিল থাকলে সেই নথি মানা হয়নি। এই নথিগুলো বেশির ভাগ প্রান্তিক মানুষের কাছেই নেই।
মহারাষ্ট্র, গুজরাট, রাজস্থান, দিল্লি, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ওডিশায় এই সব হয়রানি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন কমিশন ২৪ জুন একটি আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কহীন ঘোষণা করে: ভোটার তালিকার একটি ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’। প্রথমে বিহার, তারপর বাংলা ও অন্যান্য রাজ্য। দেখা যায়, কমিশনের এই ঘোষণার বিবরণ সংঘ পরিবারের ঘোষিত লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’-এর অন্যতম কারণ ভোটার তালিকা থেকে ‘বিদেশিদের’ নাম অপসারণ। ঠিক যেভাবে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোর পুলিশ আধার, প্যান, রেশন কার্ড বা ভোটার আইডিকে মানছিল না, সেভাবেই এগুলোকে মানতে চায়নি নির্বাচন কমিশন।
এই বাংলা-বিহার-ঝাড়খন্ডের সীমান্ত এলাকায় সংঘ পরিবারের আছে বিশেষ দীর্ঘমেয়াদি নজর। ভারতের মোট মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ১১ শতাংশ বাস করে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং ঝাড়খন্ডের সংযোগস্থলে অবস্থিত ১১টি সংলগ্ন জেলায়—মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুর, নদীয়া, বীরভূম, কিষাণগঞ্জ, কাটিহার, আরারিয়া, পুর্নিয়া, সাহেবগঞ্জ ও পাকুড়। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, এই অঞ্চলে মুসলিমদের জনঘনত্ব সবচেয়ে বেশি—এই ১১টি জেলার মোট ৩.৩৯ কোটি জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশ মুসলিম।
এই অঞ্চলে মুসলিমদের জনঘনত্ব উত্তর প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলের চেয়েও বেশি, তবে তিনটি ভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে থাকায় এই অঞ্চলটি জাতীয় স্তরের আলোচনায় কম গুরুত্ব পায়। এই ১১টি জেলার মধ্যে চারটিতে (মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুর ও কিষাণগঞ্জ) বাংলাভাষী ও উর্দুভাষী মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই অঞ্চলের ১৩টি লোকসভা আসনে ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ ভোটার মুসলিম—এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে আটটি, বিহারে চারটি এবং ঝাড়খন্ডে একটি আসন। ফলে এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে সংঘ পরিবারের বৃহত্তর জনবিন্যাসের-রাজনীতি করাটাই স্বাভাবিক ব্যাপার।
তবে পশ্চিমবঙ্গের ওপার বাংলা (বাংলাদেশ) থেকে আসা যে পরিমাণ হিন্দু বসবাস করেন, তার কোনো তুলনা হয় না বিহারের মতো রাজ্যের ক্ষেত্রে। খাতা-কলমে নাগরিকত্ব আইন লঘু করা হলেও এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া মানুষের সংখ্যা এতই কম যে কেন্দ্রীয় সরকার লজ্জায় সেই তথ্য কোথাও প্রকাশ্যে আনতে পারছে না। এই আইনে নাগরিকত্ব পেতে হলে তো বাংলাদেশে একদা বাসের কোনো একটা প্রমাণ দিতে হবে, যা অনেকের কাছেই নেই। তাই আবেদনই করেছেন সামান্যসংখ্যক মানুষ। হাতে নাগরিকত্বের চিঠি না পেলে এসআইআরে কোনো লাভ নেই। ফলে প্রচুর হিন্দুও এই ভোটার তালিকা সংশোধনে বাদ পড়ে গেছেন।
তৃণমূল ভুক্তভোগীদের পাশে থাকার চেষ্টা করেনি, এটা বলা যাবে না। তাদের ভূমিকা যথেষ্ট নয়, এই অসন্তোষও আছে। তবে, এই বিশেষ সংশোধন মুসলিমদের এতটাই কোণঠাসা করে দিয়েছে যে তৃণমূলের বিরুদ্ধে তাঁদের ক্ষোভ ব্যক্ত করার সুযোগ এখন খুব কম।
গত নির্বাচনে বামফ্রন্ট একটিও আসন না পাওয়ার কারণ কী? এবারও কি একই রকম ফলের আশঙ্কা আছে?
১৫ বছরের রাজনীতির গতি-প্রকৃতির দিকে চোখ রাখলে দেখা যায়, তাদের ভোট কমা শুরু হয় ২০০৯ সাল থেকে, যখন সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজ্য উত্তাল হয়ে উঠেছিল। বামদের কৃষক ভোটের একাংশ ও শহুরে বামমনস্ক ভোটারদের একাংশ সেই সময় থেকে তৃণমূলের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৫০.৭ শতাংশ ভোট পাওয়া বামদের ভোট ২০০৯ সালের নির্বাচনে ৪৩.৩ শতাংশে নেমে আসে। আর ২০১১ সালে ক্ষমতা হারানোর বছরে সেটা দাঁড়ায় ৪১.১ শতাংশে। ২০১৪ সালে দেশজুড়ে নরেন্দ্র মোদির উত্থানের বছরে, বাম ভোটের একাংশ বিজেপির দিকে চলে গেলে বামদের ভোট ৩০ শতাংশে নেমে আসে। বিজেপি একলাফে ৫-৬ শতাংশ গড় ভোট থেকে ১৭ শতাংশ ভোট পেয়ে যায়। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামরা এই হারানো ভোট কিছুটা পুনরুদ্ধার করলেও এই নির্বাচনে তৃণমূল ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ফিরে আসায় বামদের সমর্থকেরা একেবারেই হতোদ্যম হয়ে পড়েন। এর পরই তাঁরা ক্রমেই বিজেপির দিকে ঝুঁকতে থাকেন। এরপর ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বামদের ছাপিয়ে বিজেপিই তৃণমূলের মুখ্য বিরোধী দল হিসেবে উঠে আসে। ফলে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বামদের ভোট ব্যাপকভাবে বিজেপির দিকে চলে যায়। আবার আরেকাংশ, যাঁরা বিজেপিকে আটকাতে বেশি উৎসাহী, তাঁরা তৃণমূলের পথ ধরেন। সেই যে ধস নামল, এখনো আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি।
বামদের ভোট ক্রমেই কমে যাওয়ার কারণ কী?
বামরা ভোট হারিয়েছে অনেক ধাপে। প্রথমে জমি আন্দোলনের ধাক্কায় ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে ২০১৩ পঞ্চায়েত নির্বাচন পর্যন্ত কিছু বামমনস্ক ভোট চলে যায় তৃণমূলে। ২০১৪ থেকে বাকি থাকা বাম সমর্থকদের একাংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। তার একটি কারণ, হিন্দুদের একাংশের মধ্যে বিজেপির এই প্রচার প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যালঘু মুসলমানদের তোষণ করছেন, হিন্দুদের বঞ্চিত করছেন। আরেকটি কারণ হলো, এই বাম সমর্থকদের একাংশের কাছে তৃণমূলকে হারানোটা এতটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে বিজেপিকে বাম দলগুলো বরাবর সাম্প্রদায়িক শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেই বিজেপিকেই তারা মূল তৃণমূলবিরোধী শক্তি হিসেবে বেছে নেয়।
এর পেছনে নিশ্চয়ই বাম সমর্থকদের ওপর তৃণমূলের রাজনৈতিক সন্ত্রাসের একটা ভূমিকা আছে। অনেক বাম সমর্থকই বিজেপির আশ্রয় নেন বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারে থাকায় ‘প্রোটেকশন’ দিতে পারবে মনে করে। এভাবে বাম ভোটে যখন বিজেপির বিপুল উত্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০১৯ সালে, তখন বাম ভোটারদের আরেকাংশ—সংখ্যালঘু মুসলিম ও ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দুরা—যাঁদের কাছে সাম্প্রদায়িক বিজেপিকে আটকানোই মুখ্য, তাঁরা তৃণমূলের দিকে হেলে পড়েন। তখন থেকে এই ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত সেই একই ধারা বজায় আছে।
তৃণমূল-বিজেপি মেরুকরণের চাপে বামেরা কেন আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেননি, সে নিয়ে অনেক কাটাছেঁড়া চলছে ও চলবে। গোটা দেশেই বিজেপির রাজনীতি এক প্রবল মেরুকরণের হাওয়া তৈরি করেছে। বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিরোধী জনতা বেছে নিচ্ছে বিজেপির বিরুদ্ধে যে দল বা জোট সবচেয়ে শক্তিশালী, তাকে। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি, অপশাসনের মতো বিষয়গুলো পেছনে চলে যাচ্ছে।
এমনিতেই বিশ্বজুড়ে বাম আন্দোলনে ভাটা ও দক্ষিণপন্থীদের উত্থানের একটা পর্যায় চলছে। কমিউনিস্ট বিপ্লবের আবেদন কমেছে। রাজ্যে, তৃণমূল সরকারের নানান জনকল্যাণমূলক প্রকল্প—ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ সত্ত্বেও তৃণমূলের এক বড় জনভিত্তি তৈরি করেছে সমাজের প্রান্তিক মানুষদের মধ্যে, বিশেষত কৃষক সমাজ ও নারীদের মধ্যে। এর থেকেও ভালো কি বামেরা দিতে পারে, তা তাঁরা এখনো মানুষকে বোঝাতে পারেননি। তৃণমূল বারবারই বলে, নীতিতে তারা বাংলার বামদের থেকে বেশি বাম, বেশি জনকল্যাণকামী। বামরা মানুষের কাছে এই দাবিকে নস্যাৎ করতে পারেননি।
ঘটনা হলো, সেই ২০০৭-০৮ সাল থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দলীয় কর্মসূচিতে নানান বাম প্রভাব টেনে আনতে থাকেন। তাঁর সরকার এখন পর্যন্ত সেই অর্থে কোনো বড় জনবিরোধী নীতি গ্রহণ করেনি। তিনি শিল্পোন্নয়ন করতে চাওয়া বামেদের সরকার ফেলে দেওয়ার পর থেকে রাজ্যে কোনো বড় শিল্প আনতে পারেননি, এই হুতাশ বামেরা প্রায়ই করে থাকেন। কিন্তু যাঁরা বড় শিল্প চান, তাঁদের কাছে বামেদের থেকে বিজেপির গ্রহণযোগ্যতা বেশি।
তৃণমূলের ১৩ বছরের রাজ্য শাসন ও বিজেপির ১০ বছরের দেশ শাসনে নিশ্চয়ই একাংশের ভোটার তৈরি হয়েছেন, যাঁরা দুই পক্ষের ওপরই অসন্তুষ্ট। এই ভোটারদের ভোট, মেরুকরণ এড়িয়ে, কীভাবে নিজের বাক্সে নিয়ে আসতে পারেন বামেরা বা আদৌ পারেন কি না—সেটাই দেখার বিষয়।
বিভিন্ন সময়ে কংগ্রেস, বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসে যুক্ত থেকে হুমায়ুন কবীর এবার ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’ নামে নিজের দল গড়েছেন। মুসলমান ভোট কেটে বিজেপিকে সুবিধা করে দিতে সম্প্রতি তাদের কাছে এক হাজার কোটি টাকা নেওয়ার ভিডিও ফাঁস হয়েছে। বিষয়টিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
নির্বাচনে ওর বিশেষ প্রভাব থাকবে বলে মনে হয় না। বাংলার মুসলমান সমাজ যথেষ্ট রাজনীতিসচেতন। যদিও এক তরুণ অংশের মধ্যে খানিক উগ্রতার প্রভাব দেখা যাচ্ছে, এদের সামাজিক প্রভাব এখনো নগণ্য।
এর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তিতে বাগড়া দিয়েছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারত আবারও সম্পর্ক পুনরুদ্ধার পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে কি তিস্তা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান বদলাতে পারে? কিংবা মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতা ধরে রাখলে কি এই ইস্যুতে আগের অবস্থানই বজায় রাখবে?
তিস্তার পানি দিতে মমতা রাজি হবেন না। বিজেপির পক্ষেও চট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া মুশকিল। এই সিদ্ধান্তে উত্তরবঙ্গে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বাংলাদেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক যোগাযোগকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে?
বিজেপি জিতলে সাংস্কৃতিক সংঘাত, বৈরিতা বাড়বে, আদানপ্রদান কমবে। তারা বাংলা ভাষা ও বাঙালি পরিচয়কেই ভারত ও বাংলাদেশে ভাগ করতে চায়।
সময় দেওয়ার জন্য আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।
আজকের পত্রিকা এবং আপনাকেও ধন্যবাদ।

অসহিষ্ণুতা কোন পর্যায়ে পৌঁছালে একজন মানুষ দানব হয়ে উঠতে পারে, তারই একটি নমুনা দেখা গেল মানিকগঞ্জে। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বেতিলা-মিতরা ইউনিয়নের বার্থা গ্রামে মো. জুলহাস হোসেন কেন রিকশাচালক মো. জুসনকে ইটের উপর্যুপরি আঘাতে হত্যা করলেন...
২ ঘণ্টা আগে
ভালোবাসা মরে যায় না। কোনো না কোনোভাবে টিকে থাকে। মন ভালো করে দেওয়া একটি খবর এসেছে মৌলভীবাজার থেকে। ৩১ বছর একটি স্কুলে শিক্ষকতা করার পর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে অবসরে গেলেন রানু গোপাল রায় নামের একজন শিক্ষক। সিলেট অঞ্চলের মানুষেরা ভালোবাসার এই অপূর্ব দৃষ্টান্ত তৈরি করলেন।
১ দিন আগে
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না, বিশেষ করে যারা অনির্বাচিত শাসক গোষ্ঠী। আমাদের সংস্কৃতিতে সংকোচনের নীতি অনেক শাসকই গ্রহণ করেছে। নিজের মতো করে একটা সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়েছে। দেশভাগের পর থেকেই জিন্নাহর এই আকাঙ্ক্ষা শুরু হয়।
১ দিন আগে
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার প্রসারকে কেন্দ্র করে গত এক দশকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি অভূতপূর্ব প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ ক্রমাগত বাড়ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দ্রুততা ও আইনি বিষয়...
১ দিন আগে