Ajker Patrika

ব্যর্থতাই সাফল্যের ভিত্তি

সম্পাদকীয়
ব্যর্থতাই সাফল্যের ভিত্তি

উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার কমেছে, কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। ২০২৬ সালে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে, যা গত বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ কম। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজারের বেশি। আরও দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেননি। এসব পরিসংখ্যানকে শুধু ‘পরীক্ষার ফল’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছু প্রশ্ন তুলে দেয় এগুলো।

এবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেননি। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা অনুসন্ধান করা জরুরি। শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের মান, শিক্ষকদের দক্ষতা, পরীক্ষার পদ্ধতি কিংবা মূল্যায়নের কঠোরতা—কোন বিষয় কতটা দায়ী, তা তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নির্ণয় করতে হবে। শুধু শিক্ষার্থীদের ‘অযোগ্য’ বলে দায় সারলে সমস্যার সমাধান হবে না। আবার শিক্ষার্থীরা যদি রাজনৈতিক অস্থিরতার দোহাই দিয়ে ‘ঠিকমতো পড়াশোনা করা হয়নি’ বলে শুধু শিক্ষাব্যবস্থার ওপর দায় চাপিয়ে দিতে চান, সেটাও হবে খোঁড়া যুক্তি।

শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এক বছরে ৯১টি বেড়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী ব্যর্থ—এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কী ভাবছে, তা জানা জরুরি। পাঠদান, শিক্ষক উপস্থিতি, ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে।

বোর্ডভিত্তিক ফলাফলেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য বৈষম্য; যেমন ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ এবং বরিশালে তা ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এই ব্যবধান কমাতে বা দূর করতে কোন বোর্ডে কী ধরনের সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে অঞ্চলভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

পরীক্ষার ফল খারাপ হলেই শিক্ষাব্যবস্থা ব্যর্থ—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। তবে ধারাবাহিক অগ্রগতির বদলে ফলাফলে অবনতি এবং শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান বেড়ে যাওয়া, এসব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলোকে ফলাফল বিশ্লেষণ করে সমস্যার প্রকৃত কারণ প্রকাশ করতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, নিয়মিত পাঠদান, দুর্বল শিক্ষার্থীদের বাড়তি সহায়তা এবং প্রতিষ্ঠান তদারকিতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল পাসের হার কিংবা জিপিএ-৫-এর সংখ্যা বাড়ানো নয়; শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটানো। সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রথম শর্ত হলো শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা স্বীকার করা। এবারের ফলাফল বলে দিচ্ছে, আত্মসমালোচনার পাশাপাশি কার্যকর সংস্কার করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার নীতিনির্ধারক এবং শিক্ষার্থী উভয় পক্ষকে মনে রাখতে হবে, ব্যর্থতাই সাফল্যের ভিত্তি। সে অনুযায়ী আগামী বছরের প্রস্তুতি নিতে হবে। মুষড়ে পড়লে হবে না। ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এখনই।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত