বাংলাদেশের সংবিধানে সরকারের সমালোচনা করার অধিকার সরাসরি নিশ্চিত করা হয়েছে বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার মাধ্যমে। ৩৯ (১) অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ৩৯ (২) (ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার আছে, যার মধ্যে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করার সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার অন্তর্ভুক্ত। এমনকি সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে ৩৯ (২) (খ) অনুচ্ছেদে, যা সরকারের কাজের সমালোচনা ও জনমত প্রকাশে সহায়তা করে। সম্ভবত ময়মনসিংহের ভালুকাবাসী হনুফা আক্তার সাথী ‘সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা’ করার ব্যাপারটি জানতেন। তাই প্রকাশ্যেই তিনি সেটি করেছিলেন। কিন্তু স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাঁর করা ‘সমালোচনা’ আমলে না নিয়ে সাথীর বিচার দাবি করলেন।
সম্প্রতি সাথীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বৈদ্যুতিক তার চুরির ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করতে তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পেজ থেকে লাইভে আসেন। বিএনপিকে ভোট দিয়ে তিনি আজ ভুক্তভোগী বলে লাইভে জানান। লাইভের দুটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ২৫ অক্টোবর স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাঁর প্রতিষ্ঠান ঘেরাও করেন এবং বিচার দাবি করেন। পরে পুলিশ এসে সাথীকে হেফাজতে নেয় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায়।
এই ধারা অনুযায়ী, কোনো পুলিশ অফিসার যদি জানতে পারেন যে, কোনো ব্যক্তি কোনো আমলযোগ্য অপরাধ করার পরিকল্পনা করছেন এবং সেই অপরাধ অন্য কোনো উপায়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে তিনি ম্যাজিস্ট্রেট বা আদালতের কোনো পরোয়ানা ছাড়াই ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে পুলিশই বাদী হয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেয়।
তবে ওই ফেসবুক লাইভ দুটি পর্যালোচনা করে সরকারবিরোধী কোনো বক্তব্য পাননি বলে জানিয়েছেন ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। তিনি জানান, সাথীর বক্তব্য বরং বাক্স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে, অর্থাৎ সংবিধানের ৩৯ (২) (ক) অনুচ্ছেদে যা বলা আছে। তাই আদালতও তাঁকে জামিন দিয়েছেন।
তাহলে কেন সাথীর সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা ঘটে গেল? জাহিদুল ইসলাম এর একটি উত্তর দিয়েছেন—গুজবের কারণে। এবং ভিডিও প্রকাশের পর যে মার্কেটে সাথীর প্রতিষ্ঠান, সেখানকার কয়েকজন ব্যবসায়ী তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি তাঁদের সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেন। ফলে পুলিশকে ১৫১ ধারাটি অনুসরণ করতে হয়।
যাই হোক, ঘটনাটি কাউকে কাউকে হয়তো সংবিধানের বাক্স্বাধীনতা এবং সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করার তথ্যটি মনে করিয়ে দিতে সাহায্য করছে। সঙ্গে আরও মনে করিয়ে দিচ্ছে—গুজবে কান দিতে হয় না। তবে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটা এই ঘটনা থেকে কেউ কেউ পেতে পারেন তা হলো, সাধারণ জনগণ যখন সরকারের কাজের কোনো সমালোচনা করে তখন তা আমলে নিতে হয়, সমস্যা বা সংকটের সমাধান করতে হয়। জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সরকারের কেন্দ্র পর্যন্ত যখন জনগণের পাশে দাঁড়ায়, তখন সেই সরকারকে নাগরিকেরা মন থেকেই ভালোবাসে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে অনেক নেতা-কর্মীই এ কথা ভুলে যান; বরং ক্ষমতার প্রদর্শনকেই রাজনীতি মনে করেন।






