Ajker Patrika

দুটি বাস ও জীবনের গল্প

সম্পাদকীয়
দুটি বাস ও জীবনের গল্প

সিরিয়ার ভয়াবহ যুদ্ধ এবং বিভিন্ন পক্ষের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের জেরে যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের মধ্যে শিশুরা অন্যতম। এই শিশুরা ভয়াবহ গোলাবর্ষণের বিভীষিকায় হারিয়েছে তাদের শৈশব। যুদ্ধ শেষে এখন দেশটির রাজনীতি-সংস্কৃতি-অর্থনীতি কতটা পুনর্গঠিত হয়, সেটা সময়ই বলে দেবে, তবে সে দেশে এ মুহূর্তে একটি বাসের গল্প দেশের শিশুদের মনে আশার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।

যদিও এটা ডিজিটাল যুগ কিন্তু নিজের হাতে মনকাড়া বইয়ের স্পর্শ পেলে সে বই পড়ে ফেলার যে আনন্দ, তাকে এখনো ডিজিটাল বই খর্ব করতে পারেনি। ২০২৫ সালের আগস্ট মাস থেকে সিরিয়ার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যে ‘সাংস্কৃতিক বাস’ নামের একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তা সেই দেশের শিশুদের মনে ব্যাপক উৎসাহের জন্ম দিয়েছে। সংস্কৃতি যে মানুষের জীবন গঠনের জন্য অমূল্য সম্পদ, সেটাও বোঝা যায় এই শিশুদের দিকে তাকালে।

বর্তমানে এই উদ্যোগে রয়েছে দুটি বাস। প্রতিটি বাসে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০টি করে বই। বাসগুলো কাজ করছে ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার হিসেবে। দীর্ঘকাল ধরে যে শিশুরা শিল্পকলা ও সৃজনশীলতার পরশ পায়নি, তারা এখন এই বইগুলো পড়ার মাধ্যমে ফিরে আসছে সত্যিকার নান্দনিক জীবনে। দেশের অবহেলিত, বঞ্চিত, প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করছে বাস দুটি। শুধু সমৃদ্ধ শহরের মানুষের কাছে থাকবে শিল্পকলা আর সংস্কৃতিচর্চার অধিকার—এই ধরনের স্থবিরতা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে সিরিয়ার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। বলে রাখা ভালো, শিশুদের পাশাপাশি বড়দের জন্যও এই ভ্রাম্যমাণ পাঠাগারে রয়েছে বই।

বাস দুটির সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবী লেখক, কবি ও শিল্পীদের একটি দলও যুক্ত আছে বলে বিনোদন ও শিক্ষার সমন্বয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণবন্ত জীবনের স্পর্শও থাকছে এই আয়োজনে। আলেপ্পোর নূরা আল রাসলান নামের এক শিক্ষক বলেছেন, ‘এটি এমন এক লড়াই, যা বুলেটের বদলে শব্দ, রং আর সুর ব্যবহার করে।’

আমরা এই শিক্ষকের বলা কথাগুলোকে গুরুত্ব দিতে চাই। একটি জাতি সমৃদ্ধ হয় জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে। একনায়কতন্ত্র জ্ঞানচর্চার পীঠস্থানগুলোকে দুর্বল করে রাখে। প্রয়োজনে সে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে ফেলে। সুকুমার বৃত্তি অর্জন করতে হলে, সহনশীলতা শিখতে হলে, অন্যকে সম্মান করার মানসিকতা গড়ে তুলতে চাইলে জ্ঞানের পথটাকেই আলোকিত করতে হয়। নইলে জ্ঞানহীন এক জরদ্গব সমাজের জন্ম হয়, যেখানে শিক্ষাটাই হয়ে ওঠে বাহুল্য।

আমাদের দেশের কিছু শিক্ষার্থী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অটোপাস নিয়ে যে আন্দোলন করেছিল এবং সরকার যা মেনে নিয়েছিল, সেটা আমাদের জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়ার দুর্ভিক্ষের দিকেই আঙুল তুলে দেয়। আমাদের দেশে জ্ঞানতৃষ্ণা বাড়িয়ে তোলার জন্য যদি উচ্চপর্যায় থেকে ভাবা হতো, তাহলে এমন একটি তরুণসমাজ গড়ে উঠতে পারত, যারা হানাহানি, অশ্রাব্য গালাগাল ও অন্যকে অসম্মানিত করার প্রবণতাকে রুখে দিতে পারত। সিরিয়ার বাসগুলো সে রকম একটি সমাজ গড়ে তুলতে অবদান রাখছে। আমরা সে রকম কিছু ভাবছি কি?

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত