Ajker Patrika

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি ও পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়

বিমল সরকার
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি ও পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়
দেশভাগের পর ভারতের চণ্ডীগড়ে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার সরকারি সাতটি কলেজ ইস্যুতে গত কয়েক বছরে যা ঘটেছে, তা শিক্ষাক্ষেত্রে এককথায় নজিরবিহীন। শিক্ষার্থী-শিক্ষক, সরকার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে এমন সংশয়-সন্দেহ এবং অনাস্থা-অবিশ্বাস আমাদের গৌরব-গরিমাকে অনেকাংশেই ম্লান করে দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা মহানগরীর সেরা কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। দেশের প্রাণকেন্দ্র রাজধানীতে দফায় দফায় অনেকবার আন্দোলন করা নিয়ে মানুষকে জিম্মি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যতটা না সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের দোষ দেওয়া যায়, তার চেয়ে বেশি দোষ হলো সরকারের। কারণ, শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত চাওয়া প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি ঘোষণা দেওয়ার পরেও, অধ্যাদেশ দিতে দেরি হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়।

তবে অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর অবশেষে আমরা আশার আলো দেখতে পেয়েছি। ঢাকার সাত সরকারি কলেজ একীভূত করে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রণীত অধ্যাদেশটি সম্প্রতি (২২ জানুয়ারি ২০২৬) উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় উপমহাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরানো যাক। ১৮৫৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয় কলকাতায়। একই সময় (১৮৫৭) কলকাতার মতোই মাদ্রাজ (বর্তমান চেন্নাই) ও বোম্বেতেও (মুম্বাই) পৃথক দুটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। এর ২৪ বছর পর ১৮৮২ সালে লাহোরে স্থাপিত হয় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠাকাল বিবেচনায় লাহোরে অবস্থিত পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় উপমহাদেশ তথা ব্রিটিশ-ভারতের চতুর্থ বিশ্ববিদ্যালয়। আর পঞ্চমটি এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, স্থাপিত হয় ১৮৮৭ সালে। এভাবেই ঢিমেতালে বাড়তে থাকে উপমহাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা। ১৯২১ সালে স্থাপিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৪৭ সালে র‍্যাডক্লিফের দেওয়া দাগ অনুযায়ী বাংলা, পাঞ্জাব, আসাম প্রভৃতি অঞ্চলের জনগণ ভারতীয় ও পাকিস্তানি পরিচয়ে পরিচিত হয়।

ভারত বিভক্তির সময় শিক্ষাক্ষেত্রে বড় সমস্যা দেখা দেয় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে। ঐতিহ্যবাহী এই বিশ্ববিদ্যালয়টির ভৌগোলিক অবস্থান ও মূল স্থাপনা পাকিস্তানের অংশে পড়লেও এফিলিয়েটিং বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর আওতাধীন অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়ে যায় ভারতীয় অংশে। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিধি ছিল খুবই সুবিস্তৃত। প্রতিষ্ঠার সময়ই শিক্ষার মানোন্নয়ন ও বিস্তৃতি এবং চাপ কমানোর জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনতা থেকে বেশ কিছু কলেজকে মুক্ত করে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। এ ছাড়া উত্তর ভারতের বেশির ভাগ অংশ, এমনকি মিয়ানমারের কিছু অংশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। কিন্তু দেশভাগের ফলে পাকিস্তানি এই বিশ্ববিদ্যালয়টির ভারতীয় অংশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অন্তর্ভুক্তি বাতিল করে দেওয়া হয়। অধিভুক্ত ভারতীয় ওইসব কলেজের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভাগ্য হঠাৎ করেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অস্থিরতা দেখা দেয় এমনকি গান্ধী-নেহরুর মতো রাজনীতিকদের মাঝেও। এমতাবস্থায় ভারত সরকার তাদের মানচিত্রভুক্ত পাঞ্জাবের চণ্ডীগড়ে তড়িঘড়ি একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়ে খুব দ্রুত তা বাস্তবায়ন করতে উঠেপড়ে লেগে যায়। এভাবে স্বাধীনতার বছরই, ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠা পায় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় নামে উপমহাদেশে আরও একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রতিবেশী দুটি স্বাধীন দেশ। দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় একই নামে দুটি প্রদেশ বা জনপদ। আবার একই নামে দুটি পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ও। তবে একই নামে পরিচিত হলেও ইংরেজি ভাষায় ভারতীয় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের বানানটিতে শুরুতেই কিছুটা ভিন্নতা রাখা হয়। ১৮৮২ সালে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানটি ‘ইউনিভার্সিটি অব দ্য পাঞ্জাব’ (লাহোর) নামে প্রসিদ্ধি লাভ করলেও ১৯৪৭ সালেরটি ‘পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি’ (চণ্ডীগড়) নামে পরিচিতি পায়।

এদিকে উপমহাদেশ বিভক্তির সময় (১৯৪৭) পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে বাংলা (বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি) বিভাগের ফলে কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক আওতা এবং কর্মপরিধিতেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। অবশ্য এ নিয়ে কিছু বিপত্তিরও সৃষ্টি হয়। শুরুতে (১৯২১) আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল শহরের ঢাকা ও জগন্নাথসহ আশপাশের গুটিকয় কলেজ। ঢাকা শহরের বাইরের পুরো পূর্ববঙ্গব্যাপী কলেজগুলোর সব কটি ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। এমন প্রেক্ষাপটে ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ববঙ্গের সব কটি কলেজ নতুন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। তবে বাংলা ভাগের ফলে উল্লিখিত কলেজসমূহের হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য পাঞ্জাব ভাগের মতো এমন কোনো অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারিত্র্য-বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন এনে আবাসিকের পাশাপাশি এফিলিয়েটিং বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে যায় নবোদ্যমে।

মেঘে মেঘে অনেক বেলা হলো। ইস্যু, সমস্যা আর সংকট যা-ই বলা হোক না কেন, নেহরুরা যা পেরেছিলেন এক বছরে, আমাদের সেখানে লাগল কয়েক বছর। আমরা গুরুত্বপূর্ণ এ ইস্যুটির পূর্বাপর নিয়ে আর আলোচনা করতে চাই না। মোটামুটি সংশ্লিষ্ট সবার সুমতিতে এতটুকু যে এগোনো গেছে পরিস্থিতির আলোকে তা-ইবা কম কিসে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকসহ সবার মাঝে স্বস্তি বিরাজ করুক। আমরা আশা করি, সরকার যেন ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিকে সক্রিয় করতে আর যেন কোনো গাফিলতির আশ্রয় না নেয়। সময়ক্ষেপণ করা হলে আবার যে পরিস্থিতি ঘোলাটে হবে না, সে দায় কিন্তু শিক্ষার্থীদের ওপর আর চাপানোর সুযোগ থাকবে না।

বিমল সরকার, কলাম লেখক অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত