Ajker Patrika

ওপারে বিজেপির জয়ে এপারের ভাবনা

সম্পাদকীয়
ওপারে বিজেপির জয়ে এপারের ভাবনা

গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের সময় হয়ে এসেছে। তিস্তা চুক্তি হয় হয় করেও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। দুটি নদীই বাংলাদেশে ঢুকেছে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে। দিল্লির ভাষ্য, পশ্চিমবঙ্গের আপত্তিতেই এগোয়নি তিস্তা চুক্তি। এখন কেন্দ্র ও রাজ্য—দুই জায়গাতেই বিজেপি ক্ষমতায়। তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি এবার কীভাবে এগোয়, সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

আমাদের প্রতিবেশী ভারতের সবগুলো রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেকটাই আলাদা। প্রাচীন বৃহত্তর বাংলার এই পশ্চিমাংশ ইতিহাসের ফেরে অন্য সার্বভৌম রাষ্ট্রের অংশ। সংগত কারণেই এককালের পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের গভীর বন্ধনে আবদ্ধ পশ্চিমবঙ্গ।

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষের মধ্যে রয়েছে আত্মীয়তার সম্পর্ক। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েন বা সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সময়ে সময়ে ক্ষোভ ও সংশয়ের সৃষ্টি করলেও ‘দুই বাংলা’র মধ্যে সম্পর্কে তা বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি। তবে এমন পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের এবারের বিধানসভা নির্বাচনে হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল বিজেপির নজিরবিহীন সাফল্য অনেকের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে। আওয়ামী লীগের পতনের পরের বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক আবহের জেরে বিজেপি রাজ্য পর্যায়ের নেতাদের মুখে যেসব কথা শোনা গিয়েছিল, অনেকেই সেসব নিয়ে আলোচনা করছেন এখন। বিজেপি নেতাদের ওই সব কথাবার্তা দৃশ্যত ভোটের বাক্সে ভালো ফলই দিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে আগে কখনোই এভাবে ধর্ম সম্প্রদায় বা জাতপাতের রাজনীতির প্রাধান্য দেখা যায়নি। বিশাল ভারতে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চর্চার একটি উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো এ রাজ্যকে। বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি সেখানে জায়গা করে নিতে রীতিমতো বেগ পেয়েছে। তবে দীর্ঘদিন চেষ্টার পর গত কয়েক বছরে তারা দ্রুত শিকড় ছড়িয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। তা-ও এককালের অগ্নিকন্যা, পোড়খাওয়া রাজনীতিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্গের এভাবে ভেঙে পড়া অনেককেই বিস্মিত করেছে। বিজেপি তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় মমতা আমলের দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচার, অর্থনৈতিক দুর্গতির পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মুসলিম অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলেছিল। দলটির নেতারা বলেছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ’রা পশ্চিমবঙ্গের সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিকে বিপন্ন করছে। ভোটের ফলাফলে ধারণা করা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের বিপুলসংখ্যক হিন্দু ভোটার মমতার প্রতি ভরসা হারানোর পাশাপাশি সেই ভিত্তিহীন প্রচারণায় বিশ্বাস করেছেন। বিজেপি নেতারা প্রকাশ্যেই বলেছেন, মুসলিমরা ভোট দিয়েছে তৃণমূলকে আর হিন্দুরা বিজেপিকে।

প্রশ্ন উঠেছে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই সাফল্য নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ আছে কি না? এ প্রশ্নের সোজাসাপ্টা জবাব দেওয়ার সময় হয়তো এখনো আসেনি। তবে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে, বিশেষ করে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সংলগ্নতার কারণে এদিকে কিছু ভাবনার বিষয় অবশ্যই আছে। দুই বাংলার ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা আগেই বলেছি। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি ক্ষেত্র থেকে যে লেনদেন, তার বড় অংশের মাধ্যম পশ্চিমবঙ্গ। বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্তের পুরোটা এবং উত্তরের অনেকটা জুড়ে পশ্চিমবঙ্গ। দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলসহ কয়েকটি স্থলবন্দর রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে। পণ্য পরিবহন ছাড়াও তুলনামূলক সুলভে লাখো মানুষের যাতায়াত চলে এসব সীমান্ত দিয়ে।

আওয়ামী লীগের পতন-পরবর্তী বছর দেড়েকের টানাপোড়েনের পরবর্তীকালে বাংলাদেশে নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তখন একেবারে ঘরের কাছের রাজ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের কারও কারও জন্য সংশয় এমনকি উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রনীতি স্থির করার দায়িত্ব অবশ্যই কেন্দ্র অর্থাৎ নয়াদিল্লির। কিন্তু কেন্দ্রের মসনদে থাকা দলই পশ্চিমবঙ্গে এবার ক্ষমতাসীন হচ্ছে। এর ওপর ভৌগোলিক নৈকট্যের বিষয়টি তো রয়েছেই। বিজেপি ক্ষমতায় বসার আগেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা খুব স্বস্তিদায়ক নয়। কাজেই এ নিয়ে বাংলাদেশের জনমনে আলোচনা ও উদ্বেগ একেবারে অস্বাভাবিক বা অযৌক্তিক নয়। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়তে পারে।

ভারত একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্র বলা হয় দেশটিকে। দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারে ২০১৪ সাল থেকেই ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি ও তার কয়েকটি মিত্র দল। নির্বাচনের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গেও তাদের ক্ষমতায় আসা স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কোন দলকে ভোট দেবে, সেটি তাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে সীমান্তসংলগ্ন ভারতীয় রাজ্যগুলোর ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে জাতীয় স্বার্থে আমাদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যথাযথ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী কিছু না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। আরেক সীমান্তসংলগ্ন রাজ্য আসামের বিজেপি দলীয় মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যেই কথিত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ নিয়ে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, তা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি সম্প্রতি কীভাবে কথিত অবৈধদের বাংলাদেশে পুশ ব্যাক করা হয়, তার বর্ণনা দিয়েছেন ক্যামেরার সামনে।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হলে বিজেপির একটি অংশ রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পায়। কারণ, তারা ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’ ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে পারে। শুভেন্দু অধিকারীসহ পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির কিছু নেতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ নিয়ে অনেক বিতর্কিত বক্তব্য দিয়েছেন। বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নির্বাচনী প্রচারণায় সীমান্তে কঠোরতা বৃদ্ধি, কথিত অনুপ্রবেশ রোধ এমনকি বিতর্কিত পুশ ব্যাকের মতো বিষয় উঠে এসেছে। নেতাদের এসব বক্তব্য যদি ভবিষ্যতে নীতি বা কর্মসূচিতে রূপ নেয়, তাহলে তা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

তথাকথিত ‘অবৈধ অভিবাসী’ ইস্যুই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের। আসামে বিতর্কিত যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইতিমধ্যে লাখ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এসআইআর করে পশ্চিমবঙ্গেও ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে লাখ লাখ মানুষের ভোটাধিকার। তাদের বড় একটি অংশ মুসলিম। পশ্চিমবঙ্গে যদি বাংলাভাষী মুসলিমদের ঢালাওভাবে নাগরিকত্ব হরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়, তাহলে তা সীমান্ত অঞ্চলে নতুন সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

অতি জনবহুল বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভার বহন করছে। এর সঙ্গে যদি নতুন করে আরও মানুষকে বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে সীমান্তের দিকে ঠেলে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে তা বাংলাদেশের জন্য গুরুতর চাপ সৃষ্টি করবে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও তা গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

অনেকে অবশ্য এ-ও বলছেন, অভিবাসীবিরোধী বক্তব্যসহ অনেক কিছুই নিছক রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর। ভোটের পর এসব বক্তব্যের তোড় থিতিয়ে আসবে। নির্বাচনী জনসভায় দেওয়া বক্তব্য সরকার গঠনের পর বাস্তবে কতটা কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেটাই আসল কথা। তবে যেকোনো বিচারেই বিষয়টিকে আমাদের হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, আসামের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—নাগরিকত্ব ইস্যু কীভাবে বড় সামাজিক ও মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ও সময়ে শরণার্থী বা উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক দর-কষাকষির উপাদান হিসেবে ব্যবহারের নজির রয়েছে। সিরিয়ার শরণার্থীসংকটে ইউরোপ ও তুরস্কের সম্পর্ক তার একটি বড় উদাহরণ।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন। গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের সময় হয়ে এসেছে। তিস্তা চুক্তি হয় হয় করেও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। দুটি নদীই বাংলাদেশে ঢুকেছে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে। দিল্লির ভাষ্য, পশ্চিমবঙ্গের আপত্তিতেই এগোয়নি তিস্তা চুক্তি। এখন কেন্দ্র ও রাজ্য—দুই জায়গাতেই বিজেপি ক্ষমতায়। তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি এবার কীভাবে এগোয়, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। তিস্তা চুক্তি না হওয়ার পেছনে ‘মমতার একগুঁয়েমি’ সত্যিই কতটা দায়ী ছিল, তা হয়তো এবার বোঝা যাবে।

সাম্প্রতিককালে পশ্চিমবঙ্গে জনসংখ্যাগত ভারসাম্য ও নাগরিকত্বের প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিজেপি একটি কৌশলী ও হিসাবি রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তারা নির্বাচনী সুবিধার জন্য জনসংখ্যাগত, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণের মতো নানা বিষয় বিবেচনায় নেয় বলে বিশ্লেষকদের মত। এর আগে পশ্চিমবঙ্গ ভেঙে পৃথক প্রশাসনিক অঞ্চল বা নতুন রাজ্য গঠনের আলোচনা শোনা গেছে। জনসংখ্যা, নাগরিকত্ব ও আঞ্চলিক রাজনীতির সমন্বয়ে নতুন ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তাই একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সীমান্ত ঘেঁষে এ ধরনের পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়তে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের ভোটের পর ওই সীমান্ত অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা কেউ কেউ করছেন। তবে সেখানকার পরিবেশ-পরিস্থিতি অনেকাংশেই নির্ভর করবে দেশের রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের আচরণের ওপর। এ ক্ষেত্রে সংযম ও দায়িত্বশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ধরনের উসকানির ফাঁদে পড়া উচিত হবে না।

ভারতের জনগণের গণতান্ত্রিক পছন্দকে সম্মান জানানো বাংলাদেশের কূটনৈতিক দায়িত্ব। পাশাপাশি বাংলাদেশের উচিত হবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে গঠনমূলক ও বাস্তবভিত্তিক অবস্থান বজায় রাখা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী: শুভেন্দু প্রায় নিশ্চিত, পেতে পারেন দুই ডেপুটি

মির্জা ফখরুল-ফাতেমাসহ আরও যাঁরা পাচ্ছেন খালেদা জিয়া স্মৃতি স্বর্ণপদক

প্রাণ গ্রুপে ৬০ পদে নিয়োগ, ফ্রেশাররাও আবেদন করতে পারবেন

আনসার কর্মকর্তার চোখ থেঁতলে দিলেন হকারেরা, আহত আরও ৫

ডিএমপিতে নতুন ৪ থানাসহ আরও যে তথ্য দিলেন কমিশনার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত