Ajker Patrika

ই-সিগারেটে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার উদ্যোগ উদ্বেগজনক

রাফে আদনান আদেল
ই-সিগারেটে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার উদ্যোগ উদ্বেগজনক
রাফে আদনান আদেল। ছবি: সংগৃহীত

ই-সিগারেটের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সরকারি উদ্যোগকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ‘ভুল ও ঝুঁকিপূর্ণ’ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো। তাঁদের মতে, এই পদক্ষেপ তরুণ প্রজন্মকে নতুন ধরনের নিকোটিন আসক্তির দিকে ঠেলে দেবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য গঠিত একটি সংসদীয় বিশেষ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এই পরিবর্তনগুলো আনা হচ্ছে।

সূত্রগুলো আরও জানায়, সংসদীয় কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি খসড়া তৈরি করছে যেখানে ওই বিধানগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই এটি লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগে পাঠানো হবে।

এদিকে, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-সিগারেটে থাকা নিকোটিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ দ্রুত আসক্তি তৈরি করে। একই সঙ্গে ফুসফুসের ক্ষতি, হৃদ্‌রোগ এবং ক্যানসারের ঝুঁকিও তৈরি করে।

বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচসহ ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্ট প্রচলিত তামাকের মতোই আসক্তি তৈরি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে আরও ক্ষতিকর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যে এগুলোকে ক্ষতিকর হিসেবে সতর্ক করেছে। ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইতালি, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারতসহ ৪৭টি দেশ ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করেছে। পাশাপাশি ৩৪টি দেশ কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।

তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর মতে, এটি তরুণদের মধ্যে ‘গেটওয়ে প্রোডাক্ট’ হিসেবে কাজ করে—অর্থাৎ, যারা আগে কখনো ধূমপান করত না, তারাও ই-সিগারেটের মাধ্যমে নিকোটিনে আসক্ত হয়ে পরে প্রচলিত সিগারেটে চলে যায়। সরকার যদি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, তাহলে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।”

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ই-সিগারেটের ফ্লেভার ও আকর্ষণীয় ডিজাইন তরুণদের বিশেষভাবে টার্গেট করে তৈরি করা হয়, যা তাদের কাছে এটিকে ‘নিরাপদ’ বা ‘স্টাইলিশ’ হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু বাস্তবে এর ভেতরে থাকা টক্সিক কেমিক্যাল ফুসফুসের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতা তৈরি করে।

তাঁরা আরও বলেন, দেশে যখন প্রচলিত তামাক নিয়ন্ত্রণে সরকার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে, তখন ই-সিগারেটের মতো নতুন আসক্তির পথ খুলে দেওয়া নীতিগতভাবে সাংঘর্ষিক।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই অবস্থায় ই-সিগারেট বৈধ করা হলে সেই অর্জনগুলো হুমকির মুখে পড়বে। এটি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ রাখাই সবচেয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।

তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর দাবি, বিশ্বব্যাপী বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো (বিএটি, জেটিআই, ফিলিপ মরিস) ই-সিগারেটের ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে। বাংলাদেশেও এর অনুমোদন দিলে বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো আরও সম্প্রসারিত হবে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মোটেও সুখকর হবে না। দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। তাই ই-সিগারেটের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

উল্লেখ্য, তামাকবিরোধী আন্দোলনকারীদের ক্রমবর্ধমান দাবির মুখে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গত বছরের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার ই-সিগারেট বা ইএনডিএস আমদানি নিষিদ্ধ করেছিল। পরে ২৩ ডিসেম্বর অধ্যাদেশটি অনুমোদিত হয়, যেখানে তামাকজাত পণ্যের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করা হয়।

একই সঙ্গে তামাকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু নতুন বিধান যুক্ত করার পাশাপাশি ইএনডিএস এবং অন্যান্য নতুন ধরনের তামাকজাত পণ্য নিষিদ্ধ করা হয়।

অধ্যাদেশের ৬ (গ) ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যক্তি ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম, এর যন্ত্রাংশ বা অংশ বিশেষ (ই-সিগারেট, ভ্যাপ, ভ্যাপিং, ব্যাপার ও ই-লিকুইড ইত্যাদি), হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টস বা ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্টস যে নামেই অভিহিত হোক না কেন, উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি, সংরক্ষণ, বিজ্ঞাপন, প্রচার-প্রচারণা, প্রণোদনা, পৃষ্ঠপোষকতা, বিপণন, বিতরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহন করবেন না বা করাবেন না।

এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে কোনো ব্যক্তি অনধিক তিন মাসের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। যদি কেউ একই ধরনের অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করেন, তবে দণ্ডের হার পর্যায়ক্রমে দ্বিগুণ হবে। এই ধারার অধীনে অপরাধী যদি কোনো কোম্পানি হয়, তবে সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলো বাজেয়াপ্ত করা হবে।

এ ছাড়া কোম্পানির মালিক, ব্যবস্থাপক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলে ওই কোম্পানির তামাক ও তামাকজাত পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির লাইসেন্স বাতিল করা হবে। এসব নিষিদ্ধ পণ্য ব্যবহারের জন্য যেকোনো ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে।

অধ্যাদেশের ৫ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, সরাসরি ক্রেতার কাছে বিক্রির সময় ছাড়া বিক্রয়কেন্দ্রে সমস্ত তামাকজাত পণ্য এবং তাদের মোড়ক দৃষ্টির আড়ালে রাখতে হবে।

লেখক: পরিচালক, ওয়ার্ল্ড ওভারিয়ান ক্যানসার কোয়ালিশন

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ধর্ষক মসজিদের ইমাম নয়, বড় ভাই—ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় শনাক্ত

ইলন মাস্কের শুক্রাণু নিয়ে চার সন্তানের জন্ম দেন সহকর্মী জিলিস

অনলাইন জুয়ার দেড় কোটি টাকার ভাগ-বণ্টন নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাসের পর সরকারি কর্মচারীর আত্মহত্যা

এমএলএ বাগিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা বিরোধীদের, বিজয়ের দলের বিধায়কদের গণপদত্যাগের হুমকি

১২ মে থেকে শপিং মল-দোকানপাট খোলা রাখার নতুন সময় নির্ধারণ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত