Ajker Patrika

ভাত চুরি

সম্পাদকীয়
ভাত চুরি

কুমিল্লায় ১৩ বছরের অপ্রতীম নামের এক শিশুকে মোবাইল ফোনের কারণে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় যখন সারা দেশ ক্ষোভে ফেটে পড়ছে, তখনই আরেকটি নির্মম ঘটনা ঘটেছে খুলনায়। আজমুল হোসেন ওরফে আযম নামের বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে ‘ভাত চুরি’ করে খাওয়ার অপরাধে প্রথমে মারধর এবং পরে ছাদ থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁর মেসমেট এবং কিছু বহিরাগত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে।

ভুল করে অন্য মেসের একজনের ভাত খেয়ে ফেলেছিলেন আযম। এমন সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেভাবে এক তরুণকে জীবন দিতে হলো, তা শুধু একটি অপরাধমূলক হত্যাকাণ্ড নয়, অমানবিকতার চরম বহিঃপ্রকাশও। ছোট একটা ভুলের কারণে এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনো সভ্য সমাজের কাজ হতে পারে না। এ ঘটনা স্পষ্ট করে, সমাজে অপরাধের চেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করেছে সহনশীলতার অভাব এবং তীব্র জিঘাংসা।

এ ধরনের অমানবিকতা এক দিনে তৈরি হয় না। যখন কোনো সমাজে বিচারের সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অপরাধী উপযুক্ত শাস্তির মুখোমুখি না হয়, তখন মানুষের মধ্যে আইন অমান্য করা এবং ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করার প্রবণতা বেড়ে যায়। এভাবে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সহিংস হয়ে ওঠার এই মানসিকতা প্রমাণ করে, তরুণসমাজের একাংশের মধ্যে মানবিক অনুভূতির চর্চা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ছাত্রাবাস বা মেসের মতো স্থানগুলো—যেখানে জ্ঞানচর্চা, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতার কেন্দ্র হওয়ার কথা ছিল, সেখানে যদি উগ্রতা ও নির্মমতা স্থান করে নেয়; তবে সেটি পুরো জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারের প্রতিচ্ছবির এক অশনিসংকেত।

এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করা শুধু আইনি প্রক্রিয়ায় সম্ভব নয়। মানুষের ভেতরের উগ্রতা ও জিঘাংসা প্রতিরোধে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের যদি উপযুক্ত তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেওয়া না হয়, তবে তা সমাজে আইনশৃঙ্খলা ও মানবিকতার ওপর আস্থা কমিয়ে দেবে। আইনি প্রক্রিয়া পারে সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে অপরাধপ্রবণতা কমাতে। আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই পারে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভরসা ফিরিয়ে আনতে।

একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মানবিক সমাজ গঠনে সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবারের সদস্যসহ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সহিংসতার ভয়াবহতা এবং প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে সহনশীল আচরণের উপলব্ধি ব্যতিরেকে এ ধরনের অপরাধ সমাজ থেকে দূর করা সম্ভব নয়।

প্রত্যেক মানুষকে বুঝতে হবে ক্ষোভ বা আক্রোশ কখনো কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না; বরং তা বৃহত্তর ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। সমাজ থেকে এ ধরনের হিংস্রতা দূর করে ভালোবাসার পরিবেশ গড়ে তুলতে না পারলে, এমন নির্মম ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব নয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত