Ajker Patrika

বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নই অধিক জরুরি

ড. মো. শফিকুল ইসলাম
বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নই অধিক জরুরি

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার প্রসারকে কেন্দ্র করে গত এক দশকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি অভূতপূর্ব প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ ক্রমাগত বাড়ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দ্রুততা ও আইনি বিষয় নিয়ে নানা প্রশ্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়।

সাধারণত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন একটি দীর্ঘ ও বহু স্তরবিশিষ্ট প্রক্রিয়া, যেখানে এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগে। কিন্তু গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে মাত্র তিন মাসের মধ্যে অনুমোদন পাওয়া নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই সময়ে আরও ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই বৈষম্যকে আরও স্পষ্ট করে। প্রকৃতপক্ষে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, আইন ও নিয়মনীতির যথাযথ প্রয়োগ এবং সমতা বজায় রাখা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্ক এড়ানো যায় এবং উচ্চশিক্ষা খাতে সুশাসন নিশ্চিত হয়।

বর্তমানে আরও কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, যা অনুমোদিত হলে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। এ পরিস্থিতি একদিকে যেমন উচ্চশিক্ষার সুযোগ বিস্তারের প্রতীক, অন্যদিকে তেমনি এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উত্থাপন করছে—এ মুহূর্তে কি সত্যিই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন, নাকি বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়নই অধিক জরুরি?

সরকার একটি উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে উচ্চশিক্ষার হার ৭০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বর্তমানে এ হার মাত্র ১০-১২ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই ব্যবধান পূরণের জন্য প্রতিটি জেলায় একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। ইতিমধ্যে অনেক জেলায় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। কারণ, এসব বিশ্ববিদ্যালয় অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কোনো অবকাঠামো ছাড়াই অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছিল, যা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সরকার অনেক সমালোচনার মধ্যে পড়েছিল।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে এখনো প্রায় ২৫টিতে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নেই। অন্যদিকে কিছু জেলায় একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যা একটি অসম বণ্টনের চিত্র তুলে ধরে। বিশেষ করে ফরিদপুর, নরসিংদী, বান্দরবান কিংবা পঞ্চগড়ের মতো জেলাগুলো এখনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বঞ্চিত। ফলে উচ্চশিক্ষার সুযোগে আঞ্চলিক বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এই দ্রুতগতির পেছনে একটি ইতিবাচক দিক থাকলেও এর নেতিবাচক দিকগুলোও উপেক্ষা করার মতো নয়। প্রথমত, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ শিক্ষক, গবেষণা সুবিধা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার বিষয়গুলো অনেক সময় যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয় না। ফলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কেবল নামমাত্র প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যেখানে মানসম্মত শিক্ষা প্রদান সম্ভব হয় না।

দ্বিতীয়ত, উচ্চশিক্ষার মান রক্ষা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট, গবেষণার অভাব এবং আধুনিক শিক্ষার উপকরণের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকাশনা কিংবা উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়েও বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য অবস্থান অর্জন করতে পারেনি। এর প্রধান কারণ হলো, গুণগত মানের ঘাটতি এবং গবেষণায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের অভাব।

তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সেই হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট কর্মবাজারে প্রবেশ করছে; কিন্তু তাদের দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রে বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জনের পরও উপযুক্ত চাকরি পাচ্ছে না, যা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিকল্পনার অভাবও একটি বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা বা স্থানীয় চাপের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর ফলাফল প্রদান করতে ব্যর্থ হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু জমি বা ভবনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত একাডেমিক কাঠামো, গবেষণা পরিকল্পনা এবং দক্ষ মানবসম্পদ।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উন্নত দেশগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে মানোন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেয়। যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্প খাতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে বিশ্বমানের শিক্ষা প্রদান করছে। সেখানে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার মাধ্যমে শিক্ষার মান উন্নয়ন করা সম্ভব। বিশেষ করে গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর পাঠ্যক্রম চালু করা সময়ের দাবি।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং বিশেষায়িত শিক্ষা চালুর বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত। সব বিশ্ববিদ্যালয়কে একই ধরনের কোর্স প্রদান না করে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রভিত্তিক বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হলে শিক্ষার মান এবং কার্যকারিতা উভয়ই বৃদ্ধি পাবে। উদাহরণস্বরূপ, কৃষি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান বা সামুদ্রিক গবেষণার জন্য আলাদা বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে এসবে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। অনলাইন শিক্ষা, ভার্চুয়াল ক্লাসরুম এবং আন্তর্জাতিক কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই বিশ্বমানের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে। তাই আমাদের দেশেও নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসার ঘটানো জরুরি হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে টেকসই ও কার্যকর করতে হলে কেবল সংখ্যা বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিলেই হবে না; বরং গুণগত মান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাস্তবমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়তো সাময়িকভাবে একটি ইতিবাচক ব্যাপার হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এর সুফল পেতে হলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেয়ে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন, সুশাসন এবং মানোন্নয়নের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে তার শিক্ষার গুণগত মানের ওপর, সংখ্যার ওপর নয়। তাই সময় এসেছে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার, আর নয় নতুন বিশ্ববিদ্যালয়। এখন প্রয়োজন মানসম্মত, যুগোপযোগী এবং দক্ষতাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা।

ড. মো. শফিকুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক, কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত