
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের করা ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ নিয়ে সম্প্রতি আলোচনা জোরালো হয়েছে। অনেকের মতে, চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ সেভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। চুক্তিটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এতে বাংলাদেশের জন্য যতটা না ছাড়ের ব্যবস্থা রয়েছে, তার চেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রের অর্জনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক মাস আগে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত ৯ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে চুক্তির ঘোষণাটি আসে। এরপর চুক্তিটি মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এই চুক্তিতে শুল্ক হ্রাস, অশুল্ক বাধা অপসারণ, ডিজিটাল বাণিজ্য, শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ বিস্তৃত বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসেই সারা বিশ্বের প্রায় সব দেশের সঙ্গেই বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেন। কয়েক মাস না যেতেই তাঁর প্রশাসন বিভিন্ন দেশের ওপর বিভিন্ন হারে শুল্ক আরোপ করে। এরপর ট্রাম্প সব দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি করার আহ্বান জানান। সেই আহ্বানে সাড়া দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে।
নতুন এই চুক্তি ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত ‘ইউএস-বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফোরাম অ্যাগ্রিমেন্ট (টিকফা)’ চুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। এর লক্ষ্য দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি (২০২৪ সালে যা ছিল ৬ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) হ্রাস করা এবং শুল্ক ও অশুল্ক বাধাগুলো দূর করা।
চুক্তির অন্যতম প্রধান দিক হলো শুল্কায়ন প্রক্রিয়া। চুক্তি অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর বিদ্যমান শুল্ক কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনবে। এ ছাড়া নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কের হার সরাসরি শূন্য শতাংশ করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যে নির্ধারিত শুল্ক আরোপ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক প্রয়োগ করবে। কিছু পণ্যে চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুল্ক শূন্য, কিছু পণ্যে ৫ বছরে সম্পূর্ণ শুল্ক প্রত্যাহার, আবার কিছু ক্ষেত্রে ১০ বছরে ধাপে ধাপে শুল্ক কমানো হবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিতে বাংলাদেশ কোনো কোটা আরোপ করবে না।
বিশেষ করে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের জন্য একটি বিশেষ মেকানিজম বা পদ্ধতি চালু করার কথা বলা হয়েছে চুক্তিতে। এতে নির্দিষ্ট পরিমাণ বাংলাদেশি পোশাক শূন্য শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবে। তবে এই আমদানির পরিমাণ নির্ধারিত হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে রপ্তানি করা টেক্সটাইল কাঁচামাল (যেমন তুলা এবং কৃত্রিম তন্তু) ব্যবহারের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে।
বিনিময়ে বাংলাদেশও মার্কিন শিল্প ও কৃষি পণ্যের জন্য বিশেষ শুল্ক সুবিধা ও অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাসায়নিক, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, মোটরযান ও যন্ত্রাংশ এবং তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম, সয়াবিন, দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, হাঁস-মুরগির মাংস, বাদাম এবং ফলমূল।
বাণিজ্য সহজতর করতে বাংলাদেশ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অশুল্ক বাধা অপসারণে রাজি হয়েছে। এগুলো হলো মোটরযান, ওষুধপণ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে পুনঃ উৎপাদিত পণ্য বা যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে মার্কিন মানসম্পন্ন পণ্য অতিরিক্ত পরীক্ষা ছাড়াই বাজারে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক বাধা অপসারণ করা হবে, আমদানি লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন হবে বলে নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশেষ বাজার সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে চুক্তিতে।
ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার এবং ইলেকট্রনিক ট্রান্সমিশনের ওপর স্থায়ীভাবে কাস্টমস শুল্ক না বসানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়া সাইবার নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশ একে অপরকে সহযোগিতা করবে। চুক্তি অনুযায়ী, মার্কিন কোম্পানির ওপর বৈষম্যমূলক ডিজিটাল কর আরোপ করা যাবে না।
চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞায় বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে হবে, তৃতীয় দেশের কম দামে পণ্য রপ্তানি প্রতিরোধ এবং সংবেদনশীল প্রযুক্তি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশকে কিছু নির্দিষ্ট দেশের কাছ থেকে পারমাণবিক সরঞ্জাম কেনা থেকেও বিরত থাকার শর্ত দেওয়া হয়েছে চুক্তিতে।
বাংলাদেশকে শক্তিশালী মেধাস্বত্ব আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি অনলাইন পাইরেসি দমন, ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং সীমান্ত পর্যায়ে জাল পণ্য প্রতিরোধ নিশ্চিত করতে হবে।
চুক্তির পাশাপাশি বেশ কিছু বড় বাণিজ্যিক লেনদেনের ঘোষণাও এসেছে। সে অনুসারে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী ’বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস’ মার্কিন বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কিনবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের এলএনজিসহ অন্যান্য জ্বালানি পণ্য কেনার কথা বলা হয়েছে চুক্তিতে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বার্ষিক ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের গম, সয়াবিন এবং তুলা কেনার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন চিজ ও মাংসজাত পণ্যের নাম ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশ কোনো ধরনের বাজার বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না। চেডার, মোজারেলা, গৌডা, সালামি, ব্রাটওয়ার্স্টসহ বহু আন্তর্জাতিক পণ্য বাংলাদেশে সহজে প্রবেশের সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রম অধিকার রক্ষায় কঠোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জোরপূর্বক শ্রম জোরপূর্বক শ্রম ও শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা হবে, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজ করতে আইন সংশোধন করা হবে, ইপিজেড এলাকায় শ্রমিকদের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করা হবে এবং শ্রমিকদের ধর্মঘটের অধিকার সম্প্রসারিত করা হবে। এ ছাড়া ন্যূনতম মজুরি পর্যালোচনার ব্যবস্থার শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে চুক্তিতে। মেধাসম্পদ সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক চুক্তি বাস্তবায়নের অঙ্গীকারও করেছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ২০২৩ সালের শ্রম আন্দোলন-সংক্রান্ত মামলাগুলো নিষ্পত্তির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে চুক্তিতে।
চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে পরিবেশ রক্ষায় নিজস্ব আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, অবৈধভাবে বন উজাড় ও বন্য প্রাণী পাচার রোধ এবং টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেবা প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য করা হবে না, তেল-গ্যাস, বিমা ও টেলিযোগাযোগ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ সহজ করা হবে এবং বিনিয়োগ অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত ও স্বচ্ছ করা হবে।
চুক্তি অনুযায়ী, শর্ত লঙ্ঘন করলে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় শুল্ক আরোপ করতে পারবে এবং চুক্তি বাতিল করতে চাইলে ৬০ দিনের নোটিশ দিতে হবে।
আজকের পত্রিকার পাঠকদের জন্য চুক্তিটির হুবহু অনুবাদ তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আজ পড়ুন প্রথম পর্ব:
১. বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত পণ্যের ওপর শুল্ক হার প্রয়োগ করবে, যা পরিশিষ্ট-১-এর প্রথম ভাগে নির্ধারিত আছে।
২. পক্ষসমূহ অন্যভাবে সম্মত না হলে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত পণ্যের আমদানির ওপর কোটা আরোপ করবে না।
৩. যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক হার প্রয়োগ করবে, যা পরিশিষ্ট-১-এর দ্বিতীয় ভাগে নির্ধারিত আছে।
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর এমনভাবে আমদানি লাইসেন্সিং প্রয়োগ করবে না, যা এসব পণ্যের আমদানিকে সীমিত করে। বাংলাদেশ নিশ্চিত করবে যে প্রচলিত যেকোনো অস্বয়ংক্রিয় আমদানি লাইসেন্সিং কেবল অন্তর্নিহিত ব্যবস্থাকে পরিচালনা করার জন্য প্রয়োগ করা হবে, এবং তা স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন ও অযথা বোঝা সৃষ্টি করবে না এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমিয়ে দেবে না।
১. যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত পণ্যসমূহকে, যা প্রযোজ্য যুক্তরাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক মান, যুক্তরাষ্ট্রের কারিগরি বিধিমালা, অথবা যুক্তরাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক মান মূল্যায়ন পদ্ধতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, অতিরিক্ত মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা ছাড়াই বাংলাদেশ তার ভূখণ্ডে প্রবেশের অনুমতি দেবে। এ ক্ষেত্রে:
(ক) বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়নকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে তার নিজস্ব সংস্থাগুলোর মতোই আচরণ করবে; এবং
(খ) বাংলাদেশ এমন পণ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি পদ্ধতির গ্রহণযোগ্যতা সহজতর করবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অধীনে তৃতীয় পক্ষের মান মূল্যায়নের আওতাভুক্ত নয়।
চুক্তির পরবর্তী অংশগুলো পড়তে চোখ রাখুন আজকের পত্রিকায়...

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করেছে সরকার। নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী ডিজেল প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বেড়ে ১১৫ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা ও প্রতি লিটারে ২০ টাকা বেড়ে অকটেন ১৪০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
১ ঘণ্টা আগে
প্রবীণ সাংবাদিকদের অবসর ভাতা বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। আজ শনিবার সকালে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অসুস্থ সাংবাদিক ইসমাইল হোসেন নেগাবানকে দেখতে গিয়ে মন্ত্রী সাংবাদিকদের এসব কথা জানান।
৩ ঘণ্টা আগে
দেশের ছয় জেলায় কালবৈশাখীর সঙ্গে বজ্রপাতে ১২ জন নিহত হয়েছেন। সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, রংপুর, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে সুনামগঞ্জে। জেলায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
৪ ঘণ্টা আগে
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত দুই মাসে বর্তমান সরকারের ৬০টি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার গত দুই মাস পূর্ণ করেছে।
৪ ঘণ্টা আগে