আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দখল একটা মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দখলের সীমানা বন-পাহাড়-নদী-সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত। কখনো কখনো কোনো সরকারের মধ্যে সদিচ্ছা জাগে বেদখল নদী, রেলওয়ের জায়গা এবং খাসজমি দখলমুক্ত করতে। কিন্তু দখলদাররা কোনো এক অদৃশ্য কৌশলে সরকারের এসব অভিযানকে দ্রুতই নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এর মধ্যে শক্তিশালী একটি গোষ্ঠী আমাদের পানির মধ্যে যে সম্পদ আছে তাকেও আঘাত করতে শুরু করেছে।
বিপুল বালু নদী থেকে উত্তোলন করে লুট করছে। প্রশাসন কোথাও কোথাও বিষয়টিকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করলেও, সেখানেও কীভাবে যেন বিষয়গুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যেতে সক্ষম হয় তারা। এসব করে তারা রাতারাতি এত অর্থের মালিক হয়ে যায় যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসনের আমলা এবং আরও কিছু প্রভাবশালী লোককে তারা কবজা করে ফেলে। সব সরকারের আমলেই তাদের ক্ষমতার গতি দুর্দমনীয় এবং কারও পক্ষে সম্ভব হয় না তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার। নদীর ভেতরে যে জলমহালগুলো আছে সেগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনকানুন থাকলেও তার পরোয়া করে না।
এরপর আছে পাহাড় কাটার উৎসব। পাহাড় কেটে শুধু যে মাটির ব্যবসাটা হয় তা নয়, সেখানে বেশ কিছু স্থাপনাও গড়ে তোলা হয়। সেই স্থাপনাগুলো ভাঙার ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে আর থাকে না। তারপর আছে বনভূমি দখল করে লুণ্ঠন করার ঘটনা। সবার চোখের সামনেই কী করে বনবৃক্ষরাজি বন বিভাগের অসাধু কর্মচারীরা কিছুসংখক লুটেরার সঙ্গে হাত মিলিয়ে দখল করে ফেলছে, তা আমরা প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে জানতে পারি। যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা পাহাড় পাহারা দিত, তাদেরকে নানা ধরনের মামলায় জড়িয়ে লুণ্ঠনের কাজটাকে একেবারেই নিষ্কণ্টক করে ফেলেছে তারা। সুন্দরবনের বৃক্ষ, প্রাণী এবং মাছ—এসব দখলদারদের লুণ্ঠনের আওতার বাইরে নয়। মাঝে মাঝেই দেখা যায়, একদল বনদস্যু ধরা পড়ছে এবং তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কিন্তু সেটিও কিছু সময়ের জন্য।
তারপর আসে খাসজমি। সরকারের খাসজমিগুলো চিহ্নিত করা হলেও সেখানে বারবার ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করে ফেলেন। এই দখলদারদের নীলনকশা প্রায়ই রচিত হয় এবং অস্ত্রের জোরে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে অথবা ভিন্ন কায়দায় সেসব দখল করে নেওয়া হয়। জানা যায়, এই দখলদারদের একটা বড় অংশ স্থানীয় সরকার এবং সংসদে একটা ভালো জায়গাও করে নিয়েছে। যারা ওইসব বড় বড় দুর্নীতির প্রকল্পে ঠাঁই পায় না, তখন তারা চাঁদাবাজিতে নামে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কয়েক হাজার দলীয় কর্মীকে বহিষ্কার করেছিল। সম্প্রতি একজন সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করাতে বাধ্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সেটার কারণও দখলবাণিজ্য। তার মানে এটাই প্রমাণিত সত্য যে দখল রাজনীতির একটা প্রধান প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের দেশের রাজনীতির এই দখলদারত্ব প্রবণতার সঙ্গে বৈশ্বিক দখলদারত্বের তুলনা করা যেতে পারে। যেমন কয়েক শতাব্দী ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারগুলো তার প্রতিবেশী এবং সারা পৃথিবীর দুর্বল সরকারগুলোকেও দখল করে রাখছে। হুমকি-ধমকিতে কাজ না হলে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে সেসব দেশকে করায়ত্ত করে ধ্বংস করে দিয়েছে। এর মধ্যেও কিছু কিছু রাষ্ট্র নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। সেসব ক্ষেত্রে সারা বিশ্বের মানুষ প্রতিবাদে-প্রতিরোধে রুখে দাঁড়িয়েছে। আবার কিছু রাষ্ট্রের সরকার তাদেরকে পরাজিত করে নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছে।
আমাদের দেশের জনগণও দখলদারত্ব নিয়ে খুবই ক্ষুব্ধ। তারাও নানা ধরনের ঘটনা নিয়ে প্রতিবাদও করছে। কিন্তু রক্ষা করতে পারছে না। এর প্রধান কারণ রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ক্ষমতার বিনিময়ে এসবকে তাদের ন্যায্য অধিকার বলে মনে করে। যেহেতু আমাদের দেশে আইন থাকলেও আইনের প্রয়োগ খুবই দুর্বল। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং আইনের প্রয়োগও দুর্বল।
আমাদের দেশে অনেক আগে থেকেই রাজনীতির সঙ্গে ধর্মের একটা মিশেল শুরু হয়েছে। এই মিশেলের ফলে যেকোনো জায়গায় ধর্মীয় উপাসনালয় করতে চাইলে কেউ বাধা দিতে পারে না এবং এসব ক্ষেত্রে সরকারও কোনো বড় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না। শিল্পপতিরা যেকোনো উপায়ে অর্জিত অর্থের পাহারাদার একটি রাজনৈতিক দলকে বেছে নেয়। তারপরে এলাকায় মসজিদ বা মাদ্রাসা করার উদ্যোগ নিয়ে থাকে। সেটির পেছনে যদি কোনো দখলদারত্ব থাকে, সেটাও প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় না। কারণ, দুর্বল কোনো প্রতিরোধের কারণে সেটা শূন্যে মিলিয়ে যায়।
এসবের পাশাপাশি এখানে একটি বড় স্পর্শকাতর বিষয় আছে। তা হলো, স্কুল- কলেজের মাঠ। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠগুলো দখল হয়ে গেলেও, তা রক্ষা করা সম্ভব হয় না শুধু ম্যানেজিং কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন না করার কারণে। এর বিরোধিতা যে কেউ করতে চাইলে তার ওপর নেমে আসে নানা ধরনের নিপীড়ন। মজার ব্যাপার হলো, ওসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতাসীনদের ছেলেমেয়েরা কেউ লেখাপড়া করে না। শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি দখল করাও একটা বড় ঘটনা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির ইচ্ছামতোই শিক্ষক নিয়োগ, শৃঙ্খলা সব কিছুই ম্যানেজিং কমিটির নিয়ম অনুযায়ী চলে। কারণ, তারা সরকারেরই লোক।
জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ের যেসব সরকারি স্থাপনা রয়েছে, যেগুলোতে খুব নিয়মিত কার্যক্রম নেই, সেগুলোও অবলীলায় দখল হয়ে যাচ্ছে। একবার কোনো এক জেলা শহরের শিল্পকলা একাডেমিতে গিয়ে দেখেছি সেখানকার গ্রিনরুমটি কারও থাকার জন্য ভাড়া দিয়ে দেওয়া হয়েছে। শিল্পকলার মিলনায়তনটি কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে প্রায় নিয়মিতই বিবাহ, জন্মদিন ইত্যাদি পালনের জন্য ভাড়া দিয়ে দেওয়া হয়। আর এসব ভাড়া তুলে নিচ্ছেন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা।
এ কথা এখন সবাই জানেন, ক্ষমতার পালাবদলে এই দখলদারদের কোনো অসুবিধা হয় না। তারা কোথাও না কোথাও একটা আশ্রয় পেয়ে যায়। প্রশাসন এসব ক্ষেত্রে তেমন কোনো ভূমিকা পালন করতেও প্রস্তুত নয়। কারণ, যারা এসব প্রতিরোধ করতে যাবে তখন তাদের ওপর নির্যাতনের খড়্গ নেমে আসবে।
এখানেই প্রশ্ন আসে, গণতন্ত্রের বিষয়টি। গণতন্ত্র শুধু কি নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ? নাকি রাষ্ট্রের সম্পদকে রক্ষা করার জন্য তারা শপথ নিয়েছে। নাগরিকদের সম্পূর্ণ দূরে রেখে শুধু নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মী এবং প্রশাসনের দুর্বল কিছু লোক এসবের নিষ্ফল পাহারাদার হবেন।
আমাদের মতো দেশগুলোতে নির্বাচন একেবারেই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে দীর্ঘদিনের নির্বাচনের ঐতিহ্য ছিল। কিন্তু সম্প্রতি সেটিও বিতর্কিত হয়েছে। বিরোধী দলগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণ এবং বিচার চাইছে। আমাদের দেশে এসব তো নিত্যদিনের ঘটনা। কিন্তু সবগুলো বিষয়ই ঘটছে অজ্ঞতার কারণে। আমরা যেহেতু নাগরিক অধিকার বলতে যা বুঝি, তা হলো সরকারকে মেনে নেওয়া। কিন্তু নাগরিকদের যে বড় বড় অধিকার আছে এবং সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকে তাহলে অবশ্যই নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় কর্মপরিচালনায় যুক্ত করতে হবে। এটা বহুবার বলেছি, কিন্তু কোথাও কোনো কাজে লাগেনি। বাংলাদেশের সংবিধানে এটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বলা হয়েছে—এই রাষ্ট্রের মালিক হচ্ছে জনগণ। সেই জনগণ সর্বক্ষেত্রে অবহেলিত, প্রতারিত এবং সরকারের দয়া-দাক্ষিণ্যের প্রত্যাশী।
সেই ঔপনিবেশিক শাসনের ধারা আজও অব্যাহত আছে। জনপ্রতিনিধিদের চাইতে রাষ্ট্রের প্রশাসনিকপ্রধানরা অনেক বেশি ক্ষমতা ভোগ করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে রাজনীতিকেরাও যথেষ্ট অজ্ঞ। তারাও জানে না কে বেশি ক্ষমতাবান। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, অনেক অন্যায়কে প্রশাসনিকভাবেই ন্যায়সংগত করা হয়েছে। তাই সর্বাগ্রে নাগরিকদের চেতনার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। না হলে সরকারের কোনো কার্যক্রমই সফল হবে না। আর আমরাও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই দখলের রাজনীতি থেকে মুক্ত হব না।

একি খেলা বিমানবন্দরে! ইমিগ্রেশন পুলিশের মনে হয়েছে একটু দাদাগিরি করবে! বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে নেপালের পথে রওনা হয়েছিলেন তিন নারী। কিন্তু অদ্ভুত এক কারণে তাঁদের যাত্রা বাতিল করতে হয়। আর এ জন্য সম্পূর্ণ দায়ী ইমিগ্রেশন পুলিশ।
১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের তরুণসমাজের স্বপ্ন, প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তার একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখা গেল সম্প্রতি একটি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাত্র ১ হাজার ৪৮৫টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছে ২১ লাখের বেশি তরুণ।
১ ঘণ্টা আগে
বিএডিসিতে ঘটেছে এক অদ্ভুত ঘটনা। সার পরিবহনের দরপত্র জমা দেওয়ার তারিখ থাকলেও কেউ তাতে অংশ নেননি। গত মঙ্গলবার দেশের অভ্যন্তরে ৭৫ হাজার টন এমওপি সার পরিবহনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো ঠিকাদার দরপত্র জমা দেওয়ার কথা ভাবতেই পারেননি। ব্যাপারটা এমন নয় যে ঠিকাদারেরা চান না...
১ দিন আগে
একদিন রাতে একটি হাসপাতাল দখল হয়ে গেল। ভাঙচুর হলো, লুটও হলো। এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিওতে গুলি ছুড়তে ছুড়তে ঢুকে গেল সন্ত্রাসীরা। তারপর সব লুটপাট হয়ে গেল। এসব এখন যেন নিত্যদিনের ঘটনা। কোথাও দলবল নিয়ে বাড়ি দখলের চেষ্টা, কোথাও জমি দখল, কোথাও চাঁদাবাজির অভিযোগ।
১ দিন আগে