Ajker Patrika

দখলদারদের এত সাহস আসে কোত্থেকে?

দখলদারদের এত সাহস আসে কোত্থেকে?
২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার ঘটনা ঘটে। ছবি: সংগৃহীত

একদিন রাতে একটি হাসপাতাল দখল হয়ে গেল। ভাঙচুর হলো, লুটও হলো। এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিওতে গুলি ছুড়তে ছুড়তে ঢুকে গেল সন্ত্রাসীরা। তারপর সব লুটপাট হয়ে গেল। এসব এখন যেন নিত্যদিনের ঘটনা। কোথাও দলবল নিয়ে বাড়ি দখলের চেষ্টা, কোথাও জমি দখল, কোথাও চাঁদাবাজির অভিযোগ। কান ঝালাপালা করা এসব খবর শুনতে হচ্ছে রোজই। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব কি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা, নাকি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গভীরে কোনো বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত? সাম্প্রতিক সময়ে পরপর ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনার পর সে প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়ে উঠছে।

অবশ্য রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে বিব্রত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, তদন্তে যাঁদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাঁদের আইনের আওতায় আনা হবে। ইতিমধ্যে এ ঘটনায় বেশ কিছু লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাড্ডার ঘটনায় মূল অভিযোগ যাঁর বিরুদ্ধে, সেই সংসদ সদস্যকেও পদত্যাগ করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি তাই করেছেন। এর আগে ৩৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক এক বিবৃতিতে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মোহাম্মদপুরের দখলচেষ্টা এবং সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন।

সাম্প্রতিক সময়ে খোদ রাজধানীতেই যা ঘটছে, তাকে শুধু ‘অপরাধ’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সঙ্গে যুক্ত আছে সম্পত্তি দখলের লোভ, পেশিশক্তির ব্যবহার, রাজনৈতিক পরিচয়ের সম্ভাব্য প্রভাব এবং সবচেয়ে বড় কথা—রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের ক্ষমতা নিয়ে মানুষের প্রশ্ন।

এটা মানতেই হবে যে এসব ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন সরকারের অবস্থান ভিন্ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিচার করা যাবে না এবং পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরও অপরাধ দমনে নিয়মিত বৈঠক করছে, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিচ্ছে। সরকারের বক্তব্য, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

সরকারের পক্ষ থেকে যেসব কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাষ্ট্রের সাফল্য শেষ পর্যন্ত বক্তব্যে নয়, মানুষের অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হয়। একজন নাগরিকের বাড়িতে দলবল নিয়ে কেউ হামলা করলে তিনি কত দ্রুত পুলিশের সাহায্য পান, একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে কেউ চাঁদা চাইলে পুলিশ কত দ্রুত ব্যবস্থা নেয়, একটি হাসপাতাল বা স্টুডিওতে হামলা হলে হামলাকারীরা কত দ্রুত গ্রেপ্তার হয়—এসব প্রশ্নের উত্তরই বলে দেবে পরিস্থিতি আসলেই কতটা নিয়ন্ত্রণে আছে।

সবগুলো ঘটনায় দেখা গেছে, পুলিশ এসব স্থানে সময়মতো পৌঁছাতে পারেনি। আবার পৌঁছালেও নিষ্ক্রিয় ছিল তারা। শত শত মানুষ লুটের উৎসব করছে আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বসে বসে সেটা দেখছেন, এ থেকেই বোঝা যায় কী রকম মনোবলের সংকটে রয়েছে পুলিশ বাহিনী।

তবে এটা মানতেই হবে যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে পুলিশ সদস্য ও স্থাপনায় হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার, প্রশাসনিক ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে বাহিনীর একটি অংশ এখনো মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমর্থন পাওয়া যাবে কি না, রাজনৈতিক চাপ আসবে কি না, চাকরির ভবিষ্যৎ কী হবে—এসব প্রশ্নও তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলছে।

একজন পুলিশ সদস্যের আইন প্রয়োগের ক্ষমতা যদি থাকে, কিন্তু সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করার আত্মবিশ্বাস না থাকে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়া কঠিন। আবার পুলিশকে জবাবদিহির বাইরে রাখলেও চলবে না। অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে যাঁরা জড়িত ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অবশ্যই তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে সেটি হতে হবে ব্যক্তির দায় ও প্রমাণের ভিত্তিতে। ঢালাও ব্যবস্থা যেমন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না, তেমনি পুলিশ বাহিনীকেও দুর্বল করবে।

এ ঘটনা যে শুধু কয়েকটি দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তা নয়। দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও তার প্রভাব পড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই—এই ছয় মাসে খুন, নারী ও শিশু নির্যাতন, পুলিশের ওপর হামলা, ডাকাতি ও দস্যুতা, ছিনতাই, অপহরণ ও চুরির সাত শ্রেণিতে ২১ হাজার ৭৫৬টি মামলা হয়েছে। আগের ছয় মাসে হয়েছিল ২১ হাজার ২২৮টি। অর্থাৎ মামলা বেড়েছে ৫২৮টি বা প্রায় আড়াই শতাংশ।

বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো খুন, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পুলিশের ওপর হামলার মামলা বৃদ্ধি। খুনের মামলা বেড়েছে ৯টি, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৭৫টি এবং পুলিশের ওপর হামলার মামলা বেড়েছে ৪২টি। অন্যদিকে ডাকাতি ও দস্যুতা, ছিনতাই, অপহরণ ও চুরির মামলা কমেছে ৫৯৮টি। ফলে সামগ্রিক সংখ্যায় বড় উল্লম্ফন না থাকলেও অপরাধের ধরন এবং তার সামাজিক অভিঘাতকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

আরেকটি বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ। মামলা কমেছে মানেই অপরাধ কমেছে—এমন সরল সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবও সংশ্লিষ্ট সময়ে সংঘটিত সব অপরাধের হিসাব নয়। ভুক্তভোগীর অনীহা, থানায় মামলা না নেওয়া, সাধারণ ডায়েরি বা লিখিত অভিযোগে সীমাবদ্ধ থাকার মতো কারণেও প্রকৃত অপরাধের সংখ্যা আড়ালে থেকে যেতে পারে।

এখানে পুলিশের জন্য একটি কঠিন আত্মসমালোচনার জায়গা আছে। কোনো কোনো থানায় এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো দেখানোর জন্য মামলা নিতে নিরুৎসাহিত করার অভিযোগও কম নয়। অথচ অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত না করা কোনোভাবেই অপরাধ কমানোর পদ্ধতি নয়। বরং এতে অপরাধী উৎসাহিত হয় এবং ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। সাবেক আইজিপি আবদুল কাইয়ুমও বলেছেন, পুলিশের প্রথম কাজ অপরাধ প্রতিরোধ করা; ব্যর্থ

হলে দ্রুত ঘটনা উদ্ঘাটন করা এবং অপরাধের সঠিক নথিভুক্তি নিশ্চিত করা।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো অবৈধ অস্ত্র। ২০২৪ সালের আগস্টে থানা ও পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। বিভিন্ন অপরাধে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের তথ্যও সামনে এসেছে। ফলে প্রকাশ্যে গুলি, হত্যা, চাঁদাবাজি কিংবা দখলের মতো অপরাধের সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তারকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ করার সুযোগ সৃষ্টি করা। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার সঙ্গে কে বা কারা জড়িত—তা তদন্তে পুরোপুরি বেরিয়ে আসুক। কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী জড়িত থাকলে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় যেন তদন্তের পথে বাধা না হয়। আবার অভিযোগ উঠলেই কোনো দল বা ব্যক্তিকে দায়ী না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানেই—অভিযোগ নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া। দখলদার ও সন্ত্রাসীদের কাছে সবচেয়ে বড় বার্তা হলো—রাষ্ট্র তাদের চেয়ে শক্তিশালী কি না? একটি হাসপাতাল দখলের পর যদি দখলদারের ভয় না থাকে, একটি বাড়ি দখলের সময় যদি হামলাকারী জানে পুলিশ দ্রুত আসবে না, একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গুলি চালিয়ে যদি অপরাধী পালিয়ে যেতে পারে, তাহলে আইনের শাসনের ধারণাটিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

মানুষের ভয়ও তখন শুধু ছিনতাই বা চুরির ভয় থাকে না। ভয়টি আরও গভীরের: ‘আমার বাড়ি কি নিরাপদ?’, ‘আমার ব্যবসা কি নিরাপদ?’, ‘আমার প্রতিষ্ঠান কি নিরাপদ?’, ‘আমার বিরুদ্ধে শক্তিশালী কেউ দাঁড়ালে রাষ্ট্র কি আমার পাশে থাকবে?’

এই আস্থাটিই ফিরিয়ে আনা এখন সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। যদিও শোনা যাচ্ছে, খুব শিগগিরই দেশব্যাপী বড় আকারের অপরাধ দমন অভিযানে নামবে সরকার। তবে এটা ঠিক যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য কেবল অভিযান নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনাও দরকার। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে জোর দিতে হবে। দখল, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত অপরাধী চক্রের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভাঙতে হবে। থানায় মামলা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশে পদায়ন ও পদোন্নতিতে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক চাপমুক্ত হয়ে কাজের নিশ্চয়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের অপেশাদার আচরণ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, সরকারকে বুঝতে হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের ধারণা কোনো বক্তব্য বা প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বদলানো যায় না। মানুষের নিরাপত্তাবোধ ফিরবে তখনই, যখন তারা নিজের চোখে দেখবে অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়েছে, চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, হামলাকারী রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে বিচারের মুখোমুখি হয়েছে।

রাড্ডা, আদাবর কিংবা মোহাম্মদপুর, স্থান আলাদা হতে পারে, ঘটনার ধরনও আলাদা হতে পারে। কিন্তু এসব ঘটনার ভেতরে একটি অভিন্ন প্রশ্ন হলো, ‘আইনের চেয়ে পেশিশক্তি কি বড় হয়ে উঠছে?’ এই প্রশ্নের উত্তর সরকারকেই দিতে হবে। কথায় নয়—দৃশ্যমান, দ্রুত ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপের মাধ্যমে। কারণ, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় প্রমাণ অপরাধ না ঘটা নয়; অপরাধ ঘটার পর অপরাধী যে পার পাবে না—এই বিশ্বাসটিই প্রতিষ্ঠা করা।

কামরুল হাসান

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আজকের পত্রিকা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত