Ajker Patrika

ইরান ‍চুক্তি কি সত্যিই স্বস্তি দিতে পারবে

রাজিউল হাসান
আপডেট : ১৮ জুন ২০২৬, ০৮: ০০
ইরান ‍চুক্তি কি সত্যিই স্বস্তি দিতে পারবে
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুক্রবার যে চুক্তিটি স্বাক্ষর হবে, তা মূলত সমঝোতা স্মারক। ছবি: সংগৃহীত

যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে গত রোববার ডিজিটালি চুক্তি হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, কাল শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের তেলবাহী ট্যাংকার মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বাইরের দুনিয়ায় উঁকি দিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম ইরানের কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাইরে এল। শুক্রবার চুক্তি স্বাক্ষরের পর হরমুজ পুরোপুরি খুলে যাবে বলে আশা করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইরানও চুক্তির বিষয়ে বেশ আগ্রহী বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এর পেছনে কারণ অবশ্য রয়েছে। কেউ বলছে, নিষেধাজ্ঞার কারণে পশ্চিমা দুনিয়ায় অবরুদ্ধ হয়ে থাকা ইরানের সম্পদ এই চুক্তির পর মুক্তির পথ খুঁজে পাবে। আবার কেউ বলছে, চুক্তির সূত্র ধরে পুনর্গঠনের জন্য তেহরান ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাবে। মার্কিন প্রশাসন এ ব্যাপারে যা বলছে, তা দ্বিতীয় পক্ষের দাবির সঙ্গে অনেকটা মিলে যায়। তারা তহবিল সরবরাহের কথা বলছে ঠিকই, তবে সেটা সরকারি উদ্যোগে নয়। এই তহবিল জোগাবে ইরানে বিনিয়োগে আগ্রহী কোম্পানিগুলো। তাদের ইরানে বিনিয়োগে আগ্রহী করার দায়িত্ব উপসাগরীয় দেশগুলোর। তবে তহবিল কীভাবে খরচ হবে, কোন খাতে যাবে, তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার থাকবে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের।

এখন প্রশ্ন হলো, এই চুক্তি কি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে স্বস্তির সুবাতাস বইয়ে দিতে পারবে? নাকি হাজার বছর ধরে অশান্ত মধ্যপ্রাচ্য সেই আগের মতোই রয়ে যাবে? প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে পশ্চিমা বিশ্বের চক্ষুশূল হয়ে থাকা ইরান কি বিশ্বমঞ্চে ফিরতে পারবে? নাকি ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি যেভাবে আশার সঞ্চার করে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে, তেমনই ঘটবে এবারও?

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, শুক্রবার যে চুক্তিটি স্বাক্ষর হবে, তা মূলত সমঝোতা স্মারক। এর মেয়াদ ৬০ দিনের। এই সময়সীমার মধ্যে দুই পক্ষকে চূড়ান্ত একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আলোচনা সম্পন্ন করতে হবে। অর্থাৎ শুক্রবারের চুক্তিটি হবে মূলত চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আলোচনার টেবিলে বসার চুক্তি।

চুক্তি স্বাক্ষরের পর দুই পক্ষ যখন আলোচনার টেবিলে বসবে, তখন হাজারো বিষয় থাকবে তাদের সামনে। তবে যে দুটি বিষয় নিয়ে চরম মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে, তার একটি হলো ইরানের কথিত পারমাণবিক কর্মসূচি। পারমাণবিক বোমা বানানোর অভিযোগ কোনোকালেই স্বীকার করেনি ইরান। তবে তাদের কিছু লুকোচুরি এ বিষয়ে পশ্চিমাদের মধ্যে সন্দেহ কাটাতে দেয়নি। বরং দিন দিন সন্দেহ পোক্ত হয়েছে। ইরান অবশ্য এখন বলছে, তাদের পারমাণবিক স্থাপনায় আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের পরিদর্শন করার সুযোগ দিতে রাজি তারা। তবে ট্রাম্প চান, ইরান যে ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করেছে, তা নিয়ে যেতে। আপাতত ইরান এ নিয়ে সুস্পষ্টভাবে কিছু বলছে না।

আলোচনার টেবিলে পারমাণবিক কর্মসূচির মতোই প্রাধান্য পাবে হরমুজ প্রণালি। ইরান এই প্রণালির ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করে, এর ওপর দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ওপর টোল বসাতে চায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চায় অবাধ-মুক্ত হরমুজ প্রণালি। এই প্রণালি যে পারমাণবিক বোমার চেয়ে বড় ‘বোমা’, তা যুদ্ধের এই কদিনে প্রমাণিত হয়ে গেছে। হরমুজ হলো বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল ধমনি। ইরান নিজেও হয়তো জানত না, তার জন্য এই প্রণালি কত বড় ঢাল হয়ে রয়েছে। কিন্তু এবার তারা বুঝেছে। হরমুজ বন্ধ করে দেওয়া মানে পুরো বিশ্বের অর্থনীতি টালমাটাল হয়ে ওঠা। কাজেই এই প্রণালি নিয়ে আলোচনার সময় ইরানের কর্তৃপক্ষ একচুল ছাড় দেবে না। আপাতদৃশ্যে মনে হচ্ছে, ইরান প্রয়োজনে তার কথিত পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করে দিতে পারে, সমৃদ্ধকৃত ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরও করতে পারে, কিন্তু হরমুজ তারা ছাড়বে না।

পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনায় দুই পক্ষ এই বিষয়টি কত দ্রুত সমাধান করতে পারবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ফ্রান্সে জি৭ সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ইরান নিজের কাজে ব্যস্ত হতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রও চায় দ্রুত চুক্তির কাজ সম্পন্ন করতে। কাজেই উভয় পক্ষ দ্রুতই আলোচনার টেবিলে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারবে বলে তিনি আশা করছেন।

এতক্ষণের আলোচনা পড়লে মনে হবে, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ, কথিত পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালিই বুঝি বড় ফ্যাক্টর। এর চেয়ে বড় একটি ফ্যাক্টর আছে—ইসরায়েল। আসলে ইসরায়েল রাষ্ট্রটিকে দায়ী না করে ফ্যাক্টর বলা উচিত দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর কট্টর সরকারকে। ট্রাম্প যে সময় আলোচনার টেবিলে ইরানকে বশে আনার চেষ্টা করছেন, ঠিক সে সময় লেবাননে সমানে বোমার বৃষ্টি ঝরিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এ কারণে ট্রাম্প দুই দফায় নেতানিয়াহুকে ‘ধমক’ দিতে বাধ্য হয়েছেন।

ইরান শুধু যে নিজের অবস্থান দৃঢ় করতে আলোচনার টেবিলে গেছে, তা কিন্তু নয়। তেহরান লেবাননকেও চুক্তির একটি পক্ষ হিসেবে চায়। তেহরানের মাথাব্যথার বিষয় মূলত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠী। ট্রাম্পও চাইছেন, ইসরায়েল আপাতত লেবাননে হামলা বন্ধ রাখুক। কিন্তু কথা শুনতে নারাজ নেতানিয়াহু। আর এ কারণেই কয়েক দিন আগে তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে অনেকটা ‘কড়া সুরে’ দায়িত্বশীল আচরণ করতে বলেছেন। এরপর জি৭ সম্মেলনে গিয়েও প্রসঙ্গটি উঠলে তিনি আবারও বলেছেন, নেতানিয়াহুর আরও দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। যুক্তরাষ্ট্র পাশে না থাকলে ইসরায়েলের অস্তিত্বই থাকবে না বলে সতর্কও করেছেন তিনি। বিশেষত, নেতানিয়াহুকে বশে রাখতে তিনি বলেছেন, ‘আমি পাশে না থাকলে ইসরায়েলের অস্তিত্বই থাকবে না। কারণ, আমি যা করেছি, তা আর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট করতে ইচ্ছুকও ছিল না।’

তবে ট্রাম্পের এসব ‍হুমকি-ধমকিতে নেতানিয়াহু কতটা চুপ থাকবেন, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। এর আগেও আমরা দেখেছি, ইসরায়েল নিজের স্বার্থে ট্রাম্প, তথা যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে যেমন কসুর করে না, একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া উপেক্ষা করতেও তারা দ্বিধা করে না। আর সারা দুনিয়া জানে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে কার মন সবচেয়ে ‘খারাপ’ হবে। ফলে এই চুক্তি ভেস্তে দিতে নেতানিয়াহুর সরকার যে নানা ধরনের তৎপরতা চালাবে না, তা কে বলতে পারে? এর আগেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যখনই শান্তির পথে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, ইসরায়েল কোনো না কোনোভাবে বাদ সেধেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় হওয়া পারমাণবিক চুক্তির ক্ষেত্রেও গোসসা করেছিল ইসরায়েল। এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসামাত্র তাঁকে দিয়ে সেই চুক্তি ছুড়ে ফেলেছে নেতানিয়াহুর সরকার। এ রকম আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। কাজেই শুক্রবার যে চুক্তিটি স্বাক্ষর হবে বা তার পরে যে আলোচনা শুরু হবে, তা ভেস্তে দিতে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো ধরনের উৎপাত যে হবে না, তা নিশ্চিতভাবে খোদ ট্রাম্পও বলতে পারবেন না। আবার মতপার্থক্যের কারণে দুই পক্ষের আলোচনা ভেস্তে যাওয়াও অস্বাভাবিক কিছু হবে না। কাজেই শুক্রবারের চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে সত্যিই স্বস্তি আনতে পারবে কি না, তা দেখার জন্য আমাদের হয়তো আরও অন্তত দুই মাস অপেক্ষা করতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত